- শক্ত ঘাঁটিতে বাড়ছে ভোট বিভাজনের শঙ্কা
- বাগেরহাট ও কুষ্টিয়ায় বিদ্রোহ স্পষ্ট, তৃণমূল বিভক্ত
- তৃপ্তি বাদ পড়ায় ক্ষুব্ধ কর্মীরা, প্রচারে অনীহা
- মনিরামপুরে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সক্রিয়তায় দুর্বল হচ্ছে জোট প্রচারণা
- যশোর-৪ আসনে তিন পক্ষ, প্রকাশ্য ‘ফেসবুক যুদ্ধ’
- যশোর-৬ আসনে মনোনয়ন দ্বন্দ্বের রেশ এখনো কাটেনি
নিজস্ব প্রতিবেদক
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে খুলনা বিভাগে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এক জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। দীর্ঘদিন পর ক্ষমতার পালাবদলের সম্ভাবনা তৈরি হলেও দলের ভেতরের বিদ্রোহী প্রার্থীরা ক্রমেই বিএনপির নির্বাচনী কৌশলের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খুলনা বিভাগের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আসনে এই বিদ্রোহ ভোটের হিসাব পুরোপুরি পাল্টে দিতে পারে।
খুলনা বিভাগকে ঐতিহ্যগতভাবে বিএনপির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভোটব্যাংক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু এবারের নির্বাচনে এই অঞ্চলেই দলটির অভ্যন্তরীণ কোন্দল সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
বাগেরহাট ও কুষ্টিয়ায় বিদ্রোহ স্পষ্ট : দলীয় সূত্র ও নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বাগেরহাট-১ ও বাগেরহাট-২ আসনে একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী মাঠে থাকার ইঙ্গিত দিয়েছেন। স্থানীয় পর্যায়ে এসব নেতার শক্ত সাংগঠনিক ভিত্তি থাকায় তৃণমূল কর্মীরা বিভক্ত হয়ে পড়ছেন। এতে বিএনপির ঐক্যবদ্ধ ভোটব্যাংক দুই বা ততোধিক ভাগে বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
একই চিত্র কুষ্টিয়া-৪ আসনেও। এখানে বিএনপির দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে একাধিক নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আসনগুলোতে বিদ্রোহী প্রার্থীরা শেষ পর্যন্ত বিএনপির জন্য ‘গলার কাঁটা’ হয়ে উঠতে পারেন।
যশোরে শঙ্কা বাড়ছে : খুলনা বিভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেলা যশোরেও বিদ্রোহী প্রার্থীদের তৎপরতা চোখে পড়ার মতো। যশোরের মনিরামপুরে স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট শহীদ ইকবালের সক্রিয়তা জোটের প্রচারণাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। সেখানে বিএনপি জোটসঙ্গী জমিয়াতে উলামায়ে ইসলামে মুফতি রশিদ বিন ওয়াক্কাসকে প্রার্থী করে। কিন্তু স্বতন্ত্র প্রার্থী শহীদ ইকবাল ও তার অনুসারীরা এখন পর্যন্ত তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছেন। স্থানীয় নেতারা বলছেন, কেন্দ্র থেকে স্পষ্ট নির্দেশনা না এলে এই বিভক্তি আরও গভীর হতে পারে। আর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোর-১ (শার্শা-বেনাপোল) আসনে বিএনপির মনোনয়ন পরিবর্তন ঘিরে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন মাঠে সক্রিয় থাকা নেতা মফিকুল হাসান তৃপ্তির মনোনয়ন বাতিল করে শেষ মুহূর্তে নুরুজ্জামান লিটনকে প্রার্থী করায় স্থানীয় বিএনপিতে ‘লেজেগোবরে’ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
দলীয় সূত্র জানায়, মফিকুল হাসান তৃপ্তি শুরু থেকেই নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় ছিলেন। কর্মীসভা, উঠান বৈঠক ও গণসংযোগে এগিয়ে ছিলেন তিনি। হঠাৎ করে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে তাঁর মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় তৃপ্তির সমর্থকরা ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছেন। অনেক নেতাকর্মী প্রকাশ্যেই এই সিদ্ধান্তকে ‘অন্যায্য’ বলে মন্তব্য করছেন।
স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “যিনি দীর্ঘদিন মাঠে ছিলেন, তাকে বাদ দিয়ে নতুন কাউকে মনোনয়ন দিলে কর্মীদের মনোবল ভেঙে যায়। এখন অনেকেই প্রচারে অনীহা দেখাচ্ছেন।”
অন্যদিকে নতুন প্রার্থী নুরুজ্জামান লিটন মনোনয়ন পাওয়ার পর ঐক্যের ডাক দিলেও বাস্তবে দলীয় বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তৃপ্তিপন্থী অনেক নেতা-কর্মী নির্বাচনী কার্যক্রম থেকে দূরে থাকছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যশোর-১ আসনটি বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও মনোনয়ন নিয়ে এমন দ্বন্দ্ব দলের নির্বাচনী কৌশলকে দুর্বল করে দিতে পারে। দ্রুত এই সংকট নিরসন না হলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে ভোটের মাঠে।
এ বিষয়ে জেলা বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য না করলেও অভ্যন্তরীণভাবে বিষয়টি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে।
যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনে বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন পাওয়া কাজী রওনোকুল ইসলাম শ্রাবণের সমর্থকদের মন ভাঙাতে পারেননি চূড়ান্ত মনোনয়ন পাওয়া আবুল হোসেন আজাদ। মনোনয়ন পরিবর্তনের পরও দুই পক্ষের দূরত্ব কমেনি। স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়ে গেছে, যা নির্বাচনী কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-বসুন্দিয়া-অভয়নগর) আসনে বিভক্তি আরও স্পষ্ট। সেখানে টিএস আইয়ুবকে কেন্দ্র করে বিএনপির অন্তত তিনটি পক্ষ সক্রিয় রয়েছে। এসব পক্ষের মধ্যে বিরোধ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে। একে অপরের বিরুদ্ধে বক্তব্য ও পাল্টা অভিযোগে রীতিমতো ‘ফেসবুক যুদ্ধ’ চলছে, যা দলীয় শৃঙ্খলা ও নির্বাচনী পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
জোট রাজনীতিতে বাড়ছে চাপ : খুলনা বিভাগে বিএনপি জোটসঙ্গীদের জন্য যেসব আসন ছেড়ে দিয়েছে, সেসব জায়গায়ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের উপস্থিতি জোট রাজনীতিকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। জোটের শরিক দলগুলোর নেতারা অভিযোগ করছেন, যেখানে বিএনপির নেতাকর্মীদের সহযোগিতার কথা ছিল, সেখানে উল্টো বিএনপির বিদ্রোহীরাই তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়াচ্ছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, খুলনা বিভাগের মতো এলাকায় যদি জোটের ঐক্য প্রশ্নের মুখে পড়ে, তাহলে তার সরাসরি লাভ নিতে পারে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মিত্র দলগুলো।
কঠোর অবস্থানে বিএনপি হাইকমান্ড :
বিদ্রোহীদের লাগাম টানতে বিএনপি এবার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছে। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে যারা ভোটের মাঠে থাকবেন, তাদের বিরুদ্ধে আজীবন বহিষ্কারসহ কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২০ জানুয়ারির মধ্যে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার না করলে বিদ্রোহীদের জন্য আর কোনো ছাড় থাকবে না।
তবে খুলনা বিভাগের স্থানীয় নেতাদের অনেকেই মনে করছেন, শেষ মুহূর্তে কঠোর শাস্তির আশঙ্কা থাকলেও কিছু প্রভাবশালী বিদ্রোহী প্রার্থী সরে দাঁড়াবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
ভোটের সমীকরণ বদলে যাওয়ার আশঙ্কা :
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী মাঠে অনুপস্থিতির কারণে এবারের নির্বাচনে খুলনা বিভাগে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন বিএনপি ও ইসলামি ধারার দলগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ যদি নিয়ন্ত্রণে না আসে, তাহলে দলটির ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংক ভেঙে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, খুলনা বিভাগের একাধিক আসনে বিএনপির মূল প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যে ভোট ভাগাভাগির সুযোগে জোটসঙ্গী বা প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো একচেটিয়া সুবিধা পেতে পারে। এতে শুধু আসন হারানোর ঝুঁকিই নয়, বরং ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
খুলনা বিভাগে বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সময়মতো বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে আনা। ২০ জানুয়ারির আগেই যদি দল ঐক্য ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়, তাহলে এই অঞ্চলের বহু আসনেই বিএনপির জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠতে পারে। রাজনৈতিক মহলে এখন একটাই প্রশ্নÑখুলনা বিভাগে বিএনপি কি এই ‘বিদ্রোহী সংকট’ সামাল দিতে পারবে, নাকি এই বিদ্রোহই হয়ে উঠবে তাদের নির্বাচনী পথের সবচেয়ে বড় অন্তরায় ?
