নিজস্ব প্রতিবেদক
যশোর-১, যশোর-২ ও যশোর-৪ আসনে ধানের শীষের পরাজয়ের পর শুরু হয়েছে তীব্র দোষারোপের রাজনীতি। প্রার্থীরা মনোনয়ন বঞ্চিত ও দায়িত্বশীল নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছেন, আবার দলীয় নেতাদের কেউ কেউ প্রার্থীদের ব্যর্থতাকেই দায়ী করছেন। এসব বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় অস্বস্তিতে পড়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
যশোর-১: প্রার্থী পরিবর্তনের রেশ
যশোর-১ (শার্শা) আসনে বিএনপির প্রার্থী নুরুজ্জামান লিটন পরাজয়ের দুদিন পর বিভিন্ন ইউনিয়নে নেতাকর্মীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি পরাজয়ের পেছনে বিএনপির সাবেক কেন্দ্রীয় দফতর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তি ও শার্শা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হাসান জহিরসহ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে ‘বেইমানি’র অভিযোগ তোলেন।
এর প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন করেন আবুল হাসান জহির। তিনি বলেন, প্রার্থী নিজ বাসস্থান বেনাপোল পৌরসভা ও বেনাপোল ইউনিয়নেও বিজয়ী হতে পারেননি। “তাহলে কী তিনি নিজের সঙ্গেই বেইমানি করেছেন?”—প্রশ্ন তোলেন তিনি।
উল্লেখ্য, এ আসনে প্রথমে ধানের শীষের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছিল মফিকুল হাসান তৃপ্তিকে। পরে প্রায় দেড় মাস পর প্রার্থী পরিবর্তন করে নুরুজ্জামান লিটনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এতে দলীয় বিভক্তি আরও প্রকট হয় বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
যশোর-২: ‘একলা চলো’ নীতির অভিযোগ
যশোর-২ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সাবিরা সুলতানা মুন্নি প্রায় সাড়ে ৩৪ হাজার ভোটে পরাজিত হন। তিনি অভিযোগ করেন, মনোনয়ন বঞ্চিত জহরুল ইসলাম, মিজানুর রহমান খান, অ্যাডভোকেট ইসাহক ও ইমরান হাসান সামাদ নিপুন ভোটের মাঠে ধানের শীষের পক্ষে সক্রিয়ভাবে কাজ করেননি।
অন্যদিকে দলীয় নেতাদের একটি অংশের দাবি, ‘একলা চলো’ নীতি অনুসরণ করায় এ আসনে ভরাডুবি হয়েছে। চৌগাছা উপজেলা বিএনপির এক সভায় সাংগঠনিক সম্পাদক আলীবুদ্দিন খান প্রার্থীর সমালোচনা করে বক্তব্য দেন। সেই বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, প্রার্থী নিজ কেন্দ্রেই ফেল করেছেন এবং তার সঙ্গে মাঠে কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন না।
যশোর-৪: মতবিনিময় সভায় তীব্র বাকযুদ্ধ
যশোর-৪ আসনের বাঘারপাড়ায় নির্বাচনোত্তর মতবিনিময় সভা রূপ নেয় তীব্র বাকযুদ্ধ ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগে। উপজেলা সদরের চৌরাস্তায় দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সভায় পরাজয়ের কারণ নিয়ে নেতারা একে অপরের মুখোমুখি হন।
ধানের শীষের প্রার্থী মতিয়ার রহমান ফারাজী অভিযোগ করেন, অভ্যন্তরীণ অসহযোগিতা ও সমন্বয়হীনতার কারণেই বিপর্যয় ঘটেছে। তিনি কৃষক দলের কেন্দ্রীয় নেতা ইঞ্জিনিয়ার টিএস আইয়ুবের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ বলে দাবি করেন। ফারাজীর অভিযোগ, আর্থিক সহায়তা দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা মেলেনি।
সভায় সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান অভিযোগ করেন, টিএস আইয়ুব বিএনপি ও জামায়াত উভয় পক্ষ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে পরোক্ষভাবে অন্য প্রতীকের পক্ষে কাজ করেছেন। উপস্থিত নেতাদের কেউ কেউ তার পদ-পদবি বাতিলের দাবিও জানান।
অন্যদিকে ব্র্যাকমোড়ে পাল্টা সভায় ইঞ্জিনিয়ার টিএস আইয়ুব এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, প্রার্থীর দেওয়া অর্থ নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ওয়ার্ডে বণ্টন করা হয়েছে এবং আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ভিত্তিহীন। জামায়াতের পক্ষে কাজের অভিযোগ প্রমাণ করতে পারলে রাজনীতি ছাড়বেন বলেও ঘোষণা দেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
নির্বাচনোত্তর এই বিরোধে বাঘারপাড়া বিএনপির রাজনীতি এখন চরম উত্তপ্ত অবস্থায় রয়েছে। দলীয় বিশ্লেষকদের মতে, অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও সমন্বয়হীনতাই যশোরের একাধিক আসনে ধানের শীষের ভরাডুবির বড় কারণ হয়ে উঠেছে।
