শুকুর আলী যেভাবে হলেন মুক্তিযোদ্ধা আবদুল খালেক!

271

 

বিশেষ প্রদিনিধি : মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেননি শুকুর আলী। যুদ্ধের পর আবদুল খালেকের কাগজপত্র ও পরিচয় ব্যবহার করে রক্ষী বাহিনীতে যোগদান করে। সেই সুবাদে সেনাবাহিনীতেও চাকরি করেছেন দীর্ঘদিন। মুক্তিযোদ্ধা তালিকা, সেনাবাহিনীর চাকরিতে আবদুল খালেক নাম থাকলেও ভোটার তালিকা, জমির পড়চা, বিদ্যুৎ বিলের কপিতে তার নাম এখনও শুকুর আলী রয়েছে।
স্ত্রী সন্তানদের কাগজপত্রেও তিনি শুকুর আলী নামে লিপিবদ্ধ রয়েছেন। বছরের পর বছর জালিয়াতির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সনদ নিয়ে সরকারি সুযোগ সুবিধা নিলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন শুকুর আলী।
গত ১৫ জুলাই মাগুরা সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা ও ২৬ আগস্ট প্রেসক্লাব যশোরে সংবাদ সম্মেলন করেছেন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা দাবিদার মাগুরার শালিখা উপজেলার গোবরা গ্রামের মুনছুর মোল্লার ছেলে আবদুল খালেক। মামলায় শুকুর আলীকে আসামি করা হয়েছে।
আদালত শালিখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে তদন্ত করে এ ব্যাপারে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছে। দুই পক্ষকে ডেকে ইতোমধ্যে শুনানীও হয়েছে। ৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।
তবে জানতে চাইলে আবদুল খালেক ওরফে শুকুর আলী বলেন, ‘আবদুল খালেকের অভিযোগ সঠিক নয়। আমিই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। আমার ডাক নাম শুকুর আলী। আর ভাল নাম আব্দুল খালেক। আমার সঠিক কাগজপত্র আছে। চাকরিও করেছি।’
যেভাবে শুকুর আলী হলেন মুক্তিযোদ্ধা আবদুল খালেক :
প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা দাবিদার আবদুল খালেক বলেন, ‘৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। যুদ্ধ শেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহবানে অস্ত্র জমা দিই। তখন বলা হয় যারা চাকরি করবে তাদের সার্টিফিকেট দরকার নেই। আর যারা চাকরি করবে না তাদের সার্টিফিকেট দেওয়া হবে। এরপর আমি চাকরি করবো বলে বাড়ি চলে আসি। বাড়িতে এসে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হই। এই ফাঁকে চাচাতো ভাই ওহাব ভান্ডারি একই গ্রামের শুকুর আলীকে বুঝিয়ে আবদুল খালেক সাজিয়ে রক্ষী বাহিনীর চাকরিতে যোগদান করাতে নিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে শুকুর আলীকে দেখিয়ে বলে এই হলো আব্দুল খালেক। এরপর আমার সব কাগজপত্র ব্যবহার করে শুকুর আলী রক্ষীবাহিনীতে যোগদান করে। সেই সুবাদে সেনাবাহিনীতে চাকরি পায়। এরপর শুকুর আলীর জালিয়াতির বিষয়টি সংশোধনের জন্য বহু জায়গায় ঘুরেছি। কিন্তু আমার কথা কেউ শোনেনি।’
আবদুল খালেকের অভিযোগ, একই গ্রামের রহিম সরদারের ছেলে শুকুর আলী জালিয়াতির মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা আবদুল খালেক নাম পরিচয় ব্যবহার করে মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্ত হয়েছেন। সেনাবাহিনীতে চাকরিও করেছেন। বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধার ভাতাও পাচ্ছে। এজন্য প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হলেও আবদুল খালেক তালিকাভুক্ত হতে পারেননি। অবশেষে শুকুর আলীর জালিয়াতির বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে ১৫ জুলাই মাগুরা আদালতে মামলা করেছেন।‘
খোঁজ নিয়ে জানাযায়, মুক্তিযোদ্ধার তালিকা ও সেনাবাহিনীর চাকরি বইতে আবদুল খালেক নাম থাকলেও ২০১৬ সালের ৩১ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন প্রকাশিত ভোটার তালিকায় শুকুর আলী লিপিবদ্ধ আছে। ভোটর তালিকায় দেখা যায়, মাগুরার শালিখা উপজেলার শতখালি ইউনিয়নের গোবরা গ্রামের রহিম ও মজু বিবির ছেলে মো. শুকুর আলী। যার ভোটার নম্বর ৫৫০৫৮৭৫০৯২৮৭। শুকুর আলীর স্ত্রী রেখা (যার ভোটার নম্বর ৫৫০৫৮৭৫০৯২১২) উল্লেখ রয়েছে। মাগুরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আগস্ট ২০১৭ সালের বিদ্যুৎ বিলে মো. শুকুর আলী, পিতা. রহিম সর্দ্দার উল্লেখ রয়েছে। এছাড়াও মাগুরা শালিখা উপজেলার গোবরা মৌজার জে এল নং ৫০ এর ১১৭৪ দাগের জমির খতিয়ানে রহিম সরদারে তিন ছেলে বাবর আলী সরদার, শুকুর আলী সরদার ও টুকু মিয়া উল্লেখ আছে।
প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা দাবিদার আবদুল খালেক বলেন, আমার পিতার নাম মুনছুর মোল্লা। আর শুকুর আলীর পিতার নাম রহিম সরদার। শুকুর আলী মুক্তিযুদ্ধের তালিকা ও চাকরিতে নাম আব্দুল খালেক। আর পিতার নামের স্থলে রহিম সরদারের পরিবর্তে রহিম মোল্লা করেছে। আমার নাম ব্যবহার করে জালিয়াতির বিষয়টি অনেক আগেই জেনেছি। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছি। কিন্তু কোন কাজ হয়নি। সবাই আমার সঙ্গে তালবাহানা করেছে। সর্বশেষ মামলা করেছি। আমি তাঁর শাস্তি চাই।
অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে আবদুল খালেক ওরফে শুকুর আলী বলেন, আবদুল খালেকের অভিযোগ সঠিক নয়। আমি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধা কোটায় সেনাবাহিনীর চাকরি করেছি। আমার ডাক নাম শুকুর আলী। আর ভাল নাম আব্দুল খালেক। কাগজপত্রে আবদুল খালেক আছে। গ্রামের দলাদলির (রাজনীতির) কারণে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করছে খালেক। আমার সঠিক কাগজপত্র আছে।
জানতে চাইলে মাগুরা শালিখা উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুমি মজুমদার বলেন, আদালতের নির্দেশে তদন্ত চলছে। যতদ্রুত সম্ভব এ বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দিবো।

Previous articleযশোরে গৃহবধূ খুন, স্বামী আটক
Next articleত্যাগের মহিমায় ঈদুল আজহা উদযাপিত