খালেদা জিয়াকে গোপনে বিদেশে পাঠাতে চেয়েছিল সরকার, সন্দেহ বিএনপির

143

 

কল্যাণ ডেস্ক : খালেদা জিয়াকে গোপনে বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল সরকারের, এমন সন্দেহ প্রকাশ করেছে বিএনপি। এ কারণেই নিজেদের চেয়ারপারসনের অসুস্থতার বিষয়টিকে সামনে এনে সুচিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর দাবি তোলে দলটি। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তা মেনেও নিয়েছেন। এ কারণেই তাদের সন্দেহ আরও বেশি পোক্ত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সকালে বিএনপির সংবাদ সম্মেলনের পর একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপকালে বিষয়টি উঠে আসে।
বিএনপির জ্যেষ্ঠ একাধিক নেতা এও জানান, খালেদা জিয়া অসুস্থ হলেও বিদেশ যাওয়া নির্ভর করছে পুরোপুরি তার নিজের ওপর। তিনি না চাইলে বিদেশে পাঠানো সম্ভব নয়। তার চাওয়া-না চাওয়ার বিষয়টিই এখানে মুখ্য।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার শুক্রবার দুপুরে বলেন, ‘চিকিৎসকরা যদি চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তাকে বিদেশে পাঠানোর পরামর্শ দেন, তাহলে তো আমাদের আপত্তি নেই। তবে এটি নির্ভর করছে বেগম জিয়ার ইচ্ছার ওপর। তার কথাই এখানে মুখ্য।’
জমির উদ্দিন সরকার এও মনে করেন, কঠিন চিকিৎসার দরকার না হলে বেগম জিয়া দেশের বাইরে যাবেন না। তার ভাষ্য, ‘মঈন-ফখরুদ্দিনের সময় আর এরশাদের সময়ও এমন চেষ্টা ছিল, কিন্তু সফল হয়নি। ফলে জোর করে চাইলেই তাকে বিদেশে পাঠানো সম্ভব নয়।’
বিএনপির মহাসচিবের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র শুক্রবার দুপুরে জানায়, তাদের কাছে কয়েকদিন আগেই পরিষ্কার হয় যে, খালেদা জিয়াকে বিদেশ পাঠানোর একটি তৎপরতা আছে সরকারের। ওই সূত্রের দাবি, ইতোমধ্যে বিএনপির একাধিক নেতার কাছে গোপনে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করে আসার প্রস্তাব গেছে। যদিও এটাকে তেমন একটা পাত্তা দেননি নেতারা।
বিশেষ করে বৃহস্পতিবার খালেদা জিয়ার সঙ্গে মির্জা ফখরুলের সাক্ষাতের কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা বাতিল হওয়ার পর তাকে ঘিরে রহস্যের গন্ধ পায় বিএনপি। শুক্রবার সাংবাদিকদের কাছে মির্জা ফখরুল তা পরিষ্কার করেছেন এভাবে, ‘গতকাল দেড়টার দিকে যখন রওনা হবো, সেই সময় চেয়ারপারসনের একান্ত সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার জানান-আজ আপনার সাক্ষাৎকার স্থগিত করা হয়েছে। কারণ খালেদা জিয়া অত্যন্ত অসুস্থ। সিভিল সার্জন একটি দল নিয়ে চেয়ারপারসনকে পরীক্ষা করতে যাচ্ছেন। আমাদের সাক্ষাৎ হলো না। তার অসুস্থতাটা কী, কারা তাকে পরীক্ষা করছেন, কীভাবে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে-এসব ব্যাপারে আমরা এখন পর্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে সুনির্দিষ্ট কোনও খবরই পাইনি।’
যদিও চিকিৎসকরা বলছেন, খালেদা জিয়া সুস্থ আছেন।
বিএনপির চেয়ারপারসন কার্যালয়ের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, বিএনপির কাছে এই রহস্যের সূচনা হয় ২৮ মার্চ। ওইদিনই মির্জা ফখরুলের সঙ্গে খালেদা জিয়ার প্রথমে সাক্ষাতের কথা ছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী অনুমতিও নেওয়া হয়। যদিও ওইদিন খালেদা জিয়ার তরফে তার অসুস্থতার কথা জানানো হয়েছে। জেল কর্তৃপক্ষও আদালতকে অসুস্থ জানিয়ে তাকে হাজির করেনি।
দলটির পক্ষ থেকে ধারণা করা হচ্ছে, ‘এই অসুস্থতা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে বেগম জিয়ার সঙ্গে ন্যূনতম বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে কারা কর্তৃপক্ষের। অন্যথায় বিএনপির চেয়ারপারসনকে বুঝিয়ে সাক্ষাৎ থেকে বিরত রাখতে সমর্থ হয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ।’
বৃহস্পতিবার ফের মির্জা ফখরুল সাক্ষাতের জন্য প্রস্তুতি নিলেও কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, ‘খালেদা জিয়া অসুস্থ।’ পরপর দুই দিন অসুস্থতাজনিত কারণে সাক্ষাতকে বাধাগ্রস্থ করায় বিএনপি তাঁবুতে রহস্যের গন্ধ ছড়ায়।
বিএনপির একজন নেতা জানান, তিনটি বৈঠকে সম্মিলিত সিদ্ধান্তে খালেদা জিয়ার সঙ্গে মির্জা ফখরুলের সাক্ষাতের পরিকল্পনা করা হয়েছে। তার ভাষ্য, ‘কয়েকটি বিষয়ে দলের চেয়ারপারসনের সম্মতিগ্রহণে এটি প্রয়োজন ছিল। এজন্য সাক্ষাতের উৎস সম্পর্কে ধারণা পেয়েই যে কোনও উপায়ে খালেদা-ফখরুল বৈঠক থামানো হয়েছে।’
তবে সম্ভাব্য বৈঠকের ব্যাপারে বিএনপির কোনও নেতার তরফে বা গোয়েন্দা মারফতে সরকার টের পেয়েছে কিনা, এমন কোনও সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি ওই নেতা। তার দাবি, সহসা খালেদা জিয়ার সঙ্গে মির্জা ফখরুলের সাক্ষাতের কোনও সম্ভাবনা নেই।
বিএনপির দায়িত্বশীল এই নেতার দাবি, ‘সরকারের বিভিন্ন প্রস্তাব থাকলেও গোপনে কোনও কিছুই করবে না বিএনপি নেতারা। বিশেষ করে খালেদা জিয়া জেলে ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিদেশে; এই অবস্থায় গোপনে বৈঠক করার মানেই হচ্ছে সরকারের কোনও ফাঁদে পা দেওয়া। বর্তমান স্থায়ী কমিটির সদস্যরা ঐক্যবদ্ধভাবেই এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করছেন।’
বিএনপির রাজনীতির পর্যবেক্ষক ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘তিনি (খালেদা জিয়া) বিদেশ চলে গেলে আওয়ামী লীগ খুশি হবে। নির্বাচন পর্যন্ত তিনি দেশে না ফিরলে আওয়ামী লীগ নিশ্চয়ই খুশি হবে। কিন্তু আওয়ামী লীগের এমন আশা পূরণ হবে না।’
জাফরুল্লাহ চৌধুরী এও মনে করেন, ‘সরকারের উচিৎ হবে খালেদা জিয়াকে বিদেশ না পাঠিয়ে তাকে জামিন দেওয়া। তার শারীরিক পরিস্থিতি খুব একটা ভালো নয়। তাকে মুক্তি দেওয়াই যুক্তিসঙ্গত।’
জাতীয়তাবাদী ঘরানার বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘সরকার চায় না খালেদা জিয়া রাজনীতিতে ফিরে আসুন বা রাজনীতি করুন। কারণ তার জনপ্রিয়তা ক্ষমতাসীন দলকে ধসিয়ে দেবে। প্রতিনিয়ত তারা অনুভব করে এটা।’
এই অধ্যাপকের ভাষ্য, ‘বেগম জিয়াকে চিকিৎসার ব্যাপারে বাইরে পাঠানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে তো একজন চিকিৎসক বললে হবে না, বোর্ড গঠন করে বিষয়টি বুঝতে হবে।’
খালেদা জিয়ার একজন আইনজীবী শুক্রবার সন্ধ্যায় বলেন, “সরকার চায় বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচন না করুক ও তিনি দেশে না থাকুক। শুক্রবার সকালে মির্জা ফখরুল যে কথা বলেছেন, তা ‘স্লিপ অব টাং’ মাত্র। তবে শেষ দিকে তিনি পুরো বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন।”
দলের নির্ভরযোগ্য এই নেতার ভাষ্য, ‘কোনও অবস্থাতেই বেগম জিয়া দেশের বাইরে যাবেন না। এ পর্যন্ত আত্মীয়স্বজন, আইনজীবী, নেতা— যাদের সঙ্গেই তার কথা ও দেখা হয়েছে, প্রত্যেককেই তিনি এ কথা জানিয়ে দিয়েছেন।’
শুক্রবার সকালে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আমাদের সুস্পষ্ট প্রস্তাব রয়েছে। সেগুলো হলো-খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের অবিলম্বে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য যেতে দেওয়া ও তাদের সুপারিশ অনুযায়ী পরবর্তী চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। এজন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা হচ্ছে, অবিলম্বে তার প্রাপ্য জামিনে মুক্তি দিয়ে চিকিৎসার জন্য তাকে বাইরে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে।’
যদিও সংবাদ সম্মেলনের শেষ দিকে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আমি পরিষ্কারভাবেই বলেছি-তাকে মুক্তি দিতে হবে। চিকিৎসার ব্যবস্থা তিনি ভেবে দেখবেন-দেশেও করতে পারেন, দেশের বাইরেও করতে পারেন।’
তবে শুক্রবার দুপুরে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘বিএনপি মহাসচিব জোর গলায় খালেদা জিয়ার অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে চিকিৎসার দাবি জানিয়েছেন। তিনি (খালেদা জিয়া) যদি সত্যিই অসুস্থ হয়ে থাকেন, তাহলে তার সুচিকিৎসার প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দেশে তার সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে তো কথাই নেই। আর যদি মেডিক্যাল বোর্ড মনে করে তাকে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করানো দরকার, প্রয়োজনে সেই ব্যবস্থাও করা হবে।’