চোখ হারিয়েছেন ২০ জন : ছানি অপারেশনে ব্যবহৃত ওষুধ দূষিত ছিল

189

 

কল্যাণ ডেস্ক : ছানি অপারেশনে ব্যবহৃত ওষুধ দূষিত হওয়ায় চোখ হারাতে হয়েছে চুয়াডাঙ্গার ২০ জন রোগীকে। চুয়াডাঙ্গার ‘ইম্প্যাক্ট মাসুদুল হক হাসপাতাল’ এ চোখের ছানি অপারেশনের পর ইনফেকশন দেখা দিলে তাদের ঢাকায় পাঠানো হয়। সেখানে দ্বিতীয় দফা অপারেশন করে একটি করে চোখ অপসারণ করা হয়। বর্তমানে তারা সবাই বাড়িতে ফিরে গেছেন।
পরীক্ষা-নিরীক্ষায় জানা গেছে, অপারেশনে ব্যবহার করা ওষুধ দূষিত ছিল। এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. খায়রুল আলম বলেন, ‘আমি নিজেও এটি তদন্ত করে দেখে এসেছি। ক্যাটারাক্ট অপারেশন করার সময় যে অরোব্লো সলিউশন ব্যবহার করেছে, সেটিতে গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি ছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটি একটি ব্যবটেরিয়া, যা গ্রাম পজিটিভ ও গ্রাম নেগেটিভ হিসেবে থাকে। এখানে গ্রাম নেগেটিভ এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। তারা আগামী ২ এপ্রিল রিপোর্ট দেবে।’
ডা.খায়রুল আলম বলেন, ‘যে সল্যুশন ব্যবহার করা হয়েছে সেটি পরে আইসিডিডিআর,বি ও ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালের ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়েছে। যেহেতু অপারেশনের সময় এটা চোখে দেওয়া হয়েছে, তাতে সরাসরি ইনফেকশন হয়ে গেছে চোখে। চুয়াডাঙ্গায় যারা ছানি অপরারেশন করেছিলেন তারা বলেছেন, তারা ২০০২ সাল থেকে এ কার্যক্রম চালাচ্ছেন। এ ধরনের ঘটনা আগে ঘটেনি। কিন্তু দেখা গেছে, যে ব্যাচের ওষুধ ব্যবহার করেছে সেটা আসলে দূষিত ছিল। ওষুধটি ভারতের ওরোল্যাব কোম্পানির কাছ থেকে তারা কেনে। আমি ওষুধের স্যাম্পল নিয়ে এসেছি।’
গত ৫ মার্চ চুয়াডাঙ্গার ইম্প্যাক্ট মাসুদুল হক হাসপাতালে ২৪ জন নারী-পুরুষের চোখে অপারেশন করা হয়। এর একদিন পর তাদের ছাড়পত্র দেওয়া হয়। কিন্তু এরমধ্যে ২০ জনের চোখে প্রচ- যন্ত্রণা শুরু হয়। প্রাথমিক পরীক্ষায় তাদের চোখে ইনফেকশন ধরা পড়ে। একপর্যায়ে ইমপ্যাক্ট কর্তৃপক্ষ তাদের নিজ খরচে ঢাকার ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট ও ভিশন আই হাসপাতালে পাঠিয়ে চিকিৎসা করায়। সেখানে চিকিৎসা দিয়েও রোগীদের একটি চোখ ভালো করা সম্ভব হয়নি।
সিভিল সার্জন ডা. খায়রুল আলম বলেন, ‘গত ৪ মার্চ প্রথমদিন ওরা অপারেশন করে ৩৪ জনের, তাদের কারও সমস্যা হয়নি। পরদিন করা হয় ২৪ জনের, এরমধ্যে ২০ জনেরই ইনফেকশন হয়। তবে চারজন ভালো আছেন। ৬ তারিখ অপারেশন করা হয় দুজনের। এ দুজনেরও কোনও সমস্যা হয়নি। ইনফেকশন হওয়া ওই ২০ জনকে পরে ঢাকায় পাঠানো হয়। পুরো চোখের মধ্যে ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়ায় বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একটি করে চোখ উঠিয়ে ফেলা হয়। যদি ওই চোখ উঠিয়ে ফেলা না হতো তাহলে অন্য ভালো চোখটিও নষ্ট হয়ে যেত। ইনফেক্টেড চোখগুলো উঠিয়ে ফেলা হয়েছে।’
আলমডাঙ্গা স্টেশনপাড়ার কুটিলা খাতুন নিজের চোখ হারানোর ব্যথা নিয়ে বলেন, ‘আমি তো চোখ ভালো করতে গেছিলাম। এখন চোখ হারিয়েছি। আমি এই অপরাধের শাস্তি চাই।’ আরেক ভুক্তভোগী কুটি পাইকপাড়ার ঊষারাণী বলেন, ‘আমাদের এত বড় সর্বনাশ হলো! এর ক্ষতিপূরণ অবশ্যই দিতে হবে।’
চোখ হারানো ২০ জন হলেন, চুয়াডাঙ্গার সোনাপট্টির আবণী দত্ত, সদর উপজেলার গাইদঘাট গ্রামের গোলজার হোসেন, আলোকদিয়া গ্রামের ওলি মোহাম্মদ, আলমডাঙ্গা উপজেলার এনায়েতপুর গ্রামের খোন্দকার ইয়াকুব আলী, একই উপজেলার খাসকররা গ্রামের লাল মোহাম্মদ, মোড়ভাঙ্গা গ্রামের আহমেদ আলী, হারদী গ্রামের হাওয়াতন, নতিডাঙ্গা গ্রামের ফাতেমা খাতুন, খাস-বগুন্দা গ্রামের খবিরুন নেছা, রংপুর গ্রামের ইখলাস, আলমডাঙ্গা স্টেশনপাড়ার কুটিলা খাতুন, কুটি পাইকপাড়ার ঊষা রানী, দামুড়হুদা উপজেলার লক্ষীপুর গ্রামের তৈয়ব আলী, মদনা গ্রামের মধু হালদার, চিৎলা গ্রামের নবিছ উদ্দিন, মজলিশপুর গ্রামের সাফিকুল ইসলাম, কার্পাসডাঙ্গার গোলজান, সদাবরি গ্রামের হানিফা, বড় বলদিয়া গ্রামের আয়েশা খাতুন ও জীবননগর উপজেলার সিংনগর গ্রামের আজিজুল হক।
তদন্ত প্রতিবেদন ২ এপ্রিল
এ বিষয়ে ২৯ মার্চ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। কমিটির সভাপতি হচ্ছেন জুনিয়র চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. শফিউজ্জামান সুমন, কলেরা হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট (সার্জারি) ডা. ওয়ালিউর রহমান নয়ন ও চুয়াডাঙ্গার কনসালটেন্ট মেডিসিন আবুল হোসেন, ডিএসআই উমর ফারুক। আগামী ২ তারিখের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন দেওয়ার কথা। ততদিন ওই হাসপাতালের চক্ষু বিষয়ক কার্যক্রম ও চিকিৎসা সাময়িক বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রোগীদের ক্ষতিপূরণের বিষয়ে সিভিল সার্জন বলেন, ‘রোগীদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টি আইনানুগ ব্যাপার। ওরা রোগীদের নিজ খরচে ঢাকায় পাঠিয়েছে, হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছে; ওরা আগামী মাসেও ফলোআপে যাবে, সেই খরচও তারা বহন করবে বলে জানিয়েছে।’
বাংলাদেশ জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান সমিতির সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমরা তদন্ত কমিটি করব এবং সরকারকেও এ ব্যাপারে তদন্ত করতে বলব। ওই ঘটনার পেছনে কয়েকটি জিনিস কাজ করতে পারে বলে মনে হয়, সার্জারি করার সময় পূর্বপ্রস্তুতি না নেওয়া তার একটি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটা কারও ইচ্ছাকৃত কিছু নয়। তারপরও এতে বিরাট লস হলো। এ ব্যাপারে তাদের কোনও সহযোগিতা করা যায় কিনা, এটা জানতে পারলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া যাবে। যদি কোনও চিকিৎসকের গাফলতি পাওয়া যায় সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের অধীনে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। এ ব্যাপারে চিকিৎসকের ব্যাপারে বিএমডিসির যে নিয়ম সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Previous articleলুসি হল্টকে আপন করে নিল বাংলাদেশ
Next articleএইচএসসিতে প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে ১০ শিক্ষা বোর্ডের যত প্রস্তুতি