বদলে যাওয়া পৃথিবী, আমাদের প্রস্তুতি এবং কিছু প্রাসঙ্গিক ভাবনা

178


সাজ্জাদুল হাসান

বদলে যাচ্ছে পৃথিবী এবং তা ভীষণ দ্রুত গতিতে। এত দ্রুত গতিতে পরিবর্তন হচ্ছে যা অনেক ক্ষেত্রেই বিশেষজ্ঞদের কল্পনাকেও হার মানাচ্ছে। বিশ্বের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ এমআইটি’র মুখ্য বিজ্ঞান গবেষক অ্যাড্রিউ মক্যাফি ২০১৪ সালে প্রকাশিত তাঁর জনপ্রিয় গ্রন্থ ‘দ্য সেকেন্ড মেশিন এইজ’ এ এই পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে আলোচনা করেছেন।
২০১৭ সালে মাত্র তিন বছরের মাথায় তিনি মন্তব্য করেন, প্রযুক্তির কারণে যে গতিতে পরিবর্তন হচ্ছে তা তাঁরা ২০১৪ সালে সাংঘাতিকভাবে অবমূল্যায়ন করেছিলেন! অনেকেই এই পরিবর্তনকে আখ্যা দিচ্ছেন “চতুর্থ শিল্প বিপ্লব” হিসেবে; কেও বা আবার বলছেন ‘সংহতিনাশক প্রযুক্তি’র (ফরংৎঁঢ়ঃরাব ঃবপযহড়ষড়মু) বিকাশকাল হিসেবে।
আদিম মানবের সভ্যতার পথে যাত্রা শুরু ‘আগুন’ আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে। জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইনের মতে, মানব সভ্যতার ইতিহাসে ‘আগুন’ হচ্ছে ‘ভাষার’ পরে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। এর মধ্যে দিয়ে মানুষ রান্না করতে শেখে যা তার প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগানের ক্ষেত্রে রাখে অসামান্য অবদান। শারীরিকভাবে মানুষ হয়ে উঠে আরো বেশি সক্ষম। ধীরে ধীরে প্রকৃতির উপর তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হয় মানুষ । কৃষির আবিষ্কার সভ্যতার অগ্রযাত্রায় আরেকটি যুগান্তকারী অধ্যায়। খাদ্য উৎপাদনের কৌশল আয়ত্তে আসার পর থেকে শিকারী মানুষ কোনো একটি নির্দিষ্টস্থানে স্থায়ী ভাবে বসবাস করতে শুরু করে।
বসবাসের জন্য ঘর, চাষাবাদের জন্য পশু পালন, সেচের জন্যে পানির সংস্থান ইত্যাদি নানামুখি কর্মযজ্ঞের সূচনা হয়। অতিরিক্ত খাদ্য বিনিময়ের মাধ্যমে শুরু হয় বাণিজ্য। নগর সভ্যতার গোড়াপত্তন হয় তখন থেকে।
বিভিন্ন চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে এগোতে থাকে মানুষ। কৃষিভিত্তিক সমাজ ধীরে ধীরে ধাবিত হয় শিল্প উৎপাদনের দিকে। ‘বাষ্পীয় ইঞ্জিনের’ আবিষ্কার ইতিহাসের আর এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এর মাধ্যমে উৎপাদন ব্যবস্থায় আসে আমূল পরিবর্তন। প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে বৃহৎ সব কল-কারখানা। অনেকেই ইতিহাসের এই পর্যায়কে আখ্যা দিয়েছেন ‘প্রথম শিল্প বিপ্লব’ হিসেবে। এ সময়ে বস্ত্র, কয়লা ও লৌহভিত্তিক শিল্পের ব্যাপক বিকাশ সাধিত হয়। রেল পথের সম্প্রসারণের ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থায় যোগ হয় নতুন মাত্রার।

বিদ্যুতের আবিষ্কার এবং তার বহুমুখী ব্যবহার উন্মোচন করে সম্পূর্ণ নতুন এক সম্ভাবনার। ইস্পাত ও পেট্রোলিয়ামভিত্তিক শিল্পের সম্প্রসারণ ঘটে এই সময়ে। বৈদ্যুতিক বাতি, টেলিফোন ইত্যাদি নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন মানুষের জীবন মানকে নিয়ে যায় নতুন এক উচ্চতায়। শুরু হয় যন্ত্রচালিত গাড়ি এবং উড়োজাহাজের যাত্রা। সভ্যতার এ কালকে বিবেচনা করা হয় ‘দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লব’ হিসেবে ।
ডিজিটাল প্রযুক্তি মানুষ কর্তৃক উদ্ভাবিত আর এক বিস্ময়। বিশেষ করে কম্পিউটার এবং ইন্টারনেটের কল্যাণে সর্বক্ষেত্রে লক্ষণীয় পরিবর্তন সাধন হয়েছে। যে কোন কাজ এখন সম্পাদিত হচ্ছে অনেক দ্রুত গতিতে এবং প্রায় নির্ভুলভাবে। যোগাযোগের ক্ষেত্রে ঘটেছে অসাধ্য সাধন-দূরত্ব এখন আর কোনো বাঁধা নয়। তথ্য প্রযুক্তির উৎকর্ষতার এই সময়কে ‘তৃতীয় শিল্প বিপ্লব’ হিসেবে অভিহিত করছেন অনেকে।
এক অমিত সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করেছে এই ডিজিটাল প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তির উপর ভর করে হচ্ছে বহুমাত্রিক গবেষণা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, ইন্টারনেট অব থিংস, ন্যানোপ্রযুক্তি, জৈবপ্রযুক্তি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ইত্যাদি নানামুখী অভিনব উদ্ভাবন আমাদের সামগ্রিক জীবনাচরণ, কর্মপদ্ধতি, উৎপাদন প্রক্রিয়া, ব্যবস্থাপনা এমনকি মানুষে মানুষে আন্তঃসম্পর্কের ক্ষেত্রেও নজিরবিহীন প্রভাব বিস্তার করছে। সব ক্ষেত্রেই পরিলক্ষিত হচ্ছে অভাবনীয় পরিবর্তন এবং তা ঘটছে অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী প্রধান ক্লাউস শোয়াব প্রযুক্তির এই অভূতপূর্ব পরিবর্তনকালীন সময়কে ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লব’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ।
সম্ভাবনার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত এই উল্লম্ফন বেশ কিছু ঝুঁকিরও কারণ হবে। আপাতঃদৃষ্টিতে শ্রম বাজার সঙ্কুচিত হয়ে যাওয়াটা হবে প্রধানতম ঝুঁকি। ২০১৭ সালে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত বৃহৎ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান নির্বাহীদের (সিইও) সম্মেলনে হিউলেট প্যাকার্ড এন্টারপ্রাইজের প্রধান মেগ হুইটম্যান বলেন, “অনেকেই চাকরি হারাবে, কাজের ধরন পাল্টাবে; এই পরিবর্তন হবে অন্তহীন এবং সকল শ্রেণীর মানুষের উপর এর ব্যাপক প্রভাব পরবে।”
২০১৭ সালে ম্যাকেনজি কর্তৃক প্রকাশিত এক রিপোর্ট অনুযায়ী ইতিমধ্যে আবিষ্কৃত প্রযুক্তি দ্বারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫ থেকে ৪৭ শতাংশ কাজ স্বয়ংক্রিয় (ধঁঃড়সধঃরড়হ) ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব। ২০১৩ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কারণে চীনের প্রায় ৭৭ শতাংশ কাজ সঙ্কুচিত হওয়ার ঝুঁকির সম্মুখীন, ওইসিডি (ঙঊঈউ) ভুক্ত ৩৫টি দেশে এই হার প্রায় ৫৭ শতাংশ! অতি সম্প্রতি বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ (বিসিজি) এর এক সমীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ৪৪ শতাংশ মার্কিন উৎপাদক তাদের উৎপাদন ব্যবস্থায় রোবটসহ অন্যান্য স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি স্থাপন করবেন; জার্মানিতে এ সংখ্যা হবে ৬৬ শতাংশ।
ফররেস্টার রিসার্চের (ঋড়ৎৎবংঃবৎ জবংবধৎপয) ভবিষৎবাণী অনুযায়ী ২০১৯ সালের মধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশ কাজ রোবোটিক্স অথবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর প্রযুক্তি দ্বারা সম্পন্ন হবে। মার্কিন প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ (ঘধঃরড়হধষ ইঁৎবধঁ ড়ভ ঊপড়হড়সরপ জবংবধৎপয) এর এক গবেষণা বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে অদ্যাবধি স্থাপিত এক একটি রোবট গড়ে ৬ দশমিক ২ জন কর্মীর কাজ করতে সক্ষম। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার সাথে সাথে এই হার ভবিষ্যতে নিঃসন্দেহে আরো বৃদ্ধি পাবে।
অনেকেই মনে করেন, প্রযুক্তির ক্রমাগত উন্নতির ফলে গোপনীয়তা রক্ষা এবং আর্থসামাজিক সমতা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে বেশ খানিকটা ঝুঁকির অবকাশ থেকে যাবে। নতুন আবিষ্কৃত সেবা বা পণ্যের অর্থনৈতিক মূল্য যদি সাধারণের ক্রয় ক্ষমতার নাগালের মধ্যে না থাকে, সেক্ষেত্রে অবধারিতভাবে বৈষম্যের উদ্রেক ঘটবে, যা নিঃসন্দেহে উদ্বেগের কারণ হবে।
পরিবর্তিত পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্যে ইতিমধ্যে অনেকেই নানামুখী কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম সম্প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রস্তুতির অগ্রগতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রস্তুতির ক্ষেত্রে রাষ্ট্র সমূহের তুলনামূলক অবস্থান নির্ণয় করতে যেয়ে যে সমস্ত বিষয়গুলোর উপর জোর দেয়া হয়েছে সেগুলো হলো-প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবন, মানব সম্পদ, বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, টেকসই সম্পদ এবং বাজার ব্যবস্থাপনা।
তালিকার ক্রম অনুসারে বাংলাদেশের অবস্থান একদম নিচের দিকে। ১০০টি দেশের মধ্যে আমাদের অবস্থান ৮০। আমাদের প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতের অবস্থান ৩০। জাপান রয়েছে তালিকার শীর্ষ অবস্থানে।
আমাদেরকে সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্যে প্রস্তুতির গতিকে বহুলাংশে বাড়াতে হবে। এজন্য সর্বাগ্রে নজর দিতে হবে দক্ষ জনশক্তি তৈরির দিকে। প্রয়োজন যুগোপযোগী শিক্ষা এবং যথাযথ প্রশিক্ষণ। আমাদের পাঠ্যক্রমকে সম্পূর্ণভাবে ঢেলে সাজাতে হবে। ডিজিটাল প্রযুক্তি নির্ভর মানসম্পন্ন কারিগরি এবং প্রায়োগিক শিক্ষার উপর দিতে হবে অগ্রাধিকার।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, জৈব-প্রযুক্তি ইত্যাদি বিষয়সমূহ নিশ্চিতভাবে পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শিক্ষার পাশাপাশি এ সংক্রান্ত গবেষণায় করতে হবে ব্যাপক বিনিয়োগ। আমাদের জনসংখ্যার বিপুল অংশ তরুণ-তরুণী যা আমাদের জন্য এক আশীর্বাদ। এ বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে সঠিক প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার মাধ্যমে যদি আমরা প্রস্তুত করতে পারি তাহলে নিশ্চয়ই বাংলাদেশ চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সুফল ঘরে তুলতে সক্ষম হবে।
লেখক : চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বিএএসএফ বাংলাদেশ লিমিটেড

Previous articleগণহত্যার নতুন হিসাব : ইতিহাস বিকৃতি রোধে আইনও জরুরি
Next articleনারী ফুটবলে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ