খুলনার ভোটে জাতীয় নির্বাচনের আবহ

176

কল্যাণ ডেস্ক : সিটি করপোরেশনের নির্বাচনকে সামনে রেখে খুলনায় এখন বিরাজ করছে জাতীয় নির্বাচনের আবহ; ভোটের পরিবেশ নিয়ে নৌকা-ধানের শীষের প্রার্থীর পাল্টাপাল্টি বক্তব্য উত্তাপ ছড়াচ্ছে রাজনীতিতে।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে বছরের এই সিটি নির্বাচনের দিকে এখন সবার নজর। নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও ভোটার-সবার কাছে এ নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। আরও চার সিটি করপোরেশন ও জাতীয় নির্বাচনে ভোট কেমন হবে এখান থেকেই তার আভাস মিলবে।
১৫ মে দলীয় প্রতীকে খুলনা সিটি করপোরেশনের ভোট হবে। তাতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, সিপিবি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মেয়রপ্রার্থী রয়েছে।
কে এম নূরুল হুদা নেতৃত্বাধীন কমিশন যোগ দেওয়ার পর গেল বছর কুমিল্লা ও রংপুর ভোট করে সব মহলের প্রশংসা কুড়ায়। তার ধারাবাহিকতায় বর্তমান কমিশনের অধীনে আরও ভালো নির্বাচনের আশা রাখেন নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর মোর্চা ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের (ইডব্লিউজি) পরিচালক আব্দুল আলীম।
তিনি বলেন, কুমিল্লা ও রংপুর সিটির ভোটের চেয়ে খুলনা সিটি নির্বাচনের গুরুত্ব এখন অনেক। গাজীপুরের ভোট বিলম্বিত হওয়ায় খুলনা নিয়ে দুই দলের চাপেই থাকতে হচ্ছে কমিশনকে। আওয়ামী লীগ-বিএনপি পরস্পরবিরোধী অভিযোগ করার পাশাপাশি ইসির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
“এখন আরও চারটি সিটি ভোট বাকি; তারপর সংসদ নির্বাচন। সিটি ভোটেই এখন জাতীয় নির্বাচনের আবহ। দলীয় প্রতীকে হওয়ায় খুলনার ভোট দেখেই মানুষের কাছে মেসেজ যাবে পরের ভোট কেমন হবে। কমিশনের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ এটি”।
সংসদ নির্বাচনের আগে সবার নজর নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু ভোট আয়োজনে সঠিক পথে এগোনোর পাশাপাশি সঠিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কিনা-উল্লেখ করেন ইডব্লিউজি পরিচালক।
আব্দুল আলীম বলেন, “প্রতিদ্বন্দ্বিপূর্ণ নির্বাচন হবে আশা করি। অনিয়ম থাকলে বা সুষ্ঠু ভোট না হলে এর নেতিবাচক প্রভাব থাকবে সবমহলে। স্থানীয় সরকারে দলীয় প্রতীকে ভোট হলেও শুধু খুলনার জয়-পরাজয়কে নিয়ে সংসদ নির্বাচনের আভাস দেওয়া সঠিক হবে না। তবে আস্থা ও পরিবেশ তৈরির পথে আরও একধাপ অগ্রগতি হবে।
বেসরকারি নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ফেমার প্রেসিডেন্ট মুনিরা খান জানান, ভালো ও যোগ্য প্রার্থী থাকায় খুলনায় নির্বাচনী পরিবেশ এখন পর্যন্ত সন্তোষজনক। নির্বাচন কমিশনের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ এ নির্বাচনটি ভালোভাবে সম্পন্ন করার।
তিনি বলেন, “সামনে জাতীয় নির্বাচন রয়েছে। ইসির সদিচ্ছা ও ক্ষমতার প্রয়োগ মানুষ দেখতে চায়। ভোটের পরিবেশ ভালো রাখতে পারলে সামনে ভোটার, দল ও প্রার্থীর কাছে ইসির পজিটিভ ইমেজ আরও বাড়বে।
“এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, ইসির খুব সিরিয়াসলি দেখা উচিত।”
এদিকে খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সমান সুযোগ না পাওয়ার কথা জানিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-দুদলই কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন।
ক্ষমতাসীন দলটি বলেছে, নৌকার প্রার্থীর পক্ষে এমপি-মন্ত্রীরা প্রচারে নামতে না পারলেও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা মাঠে চষে বেড়াচ্ছে। রিটার্নিং কর্মকর্তা বিএনপি-জামায়াতের ক্যাডার হওয়ায় নির্বাচনে তার প্রভাব পড়বে বলে তাদের শঙ্কা।
অন্যদিকে বিএনপি বলছে, খুলনার পুলিশ কমিশনার তাদের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার ও ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। রিটার্নিং অফিসারকে প্রভাবিত করতেই ইসির যুগ্মসচিবকে সেখানে পাঠানো হয়েছে।
এবিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, “দলগুলো পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করতে পারে। কিন্তু কমিশন ভালো নির্বাচন করার বিষয়ে বদ্ধপরিকর। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
যে কোনো ধরনের অভিযোগ পেলে তা খতিয়ে দেখে পরিস্থিতি বুঝে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে আশ্বস্ত করেন তিনি।
হেলালুদ্দীন বলেন, “এখন সবার নজর খুলনায়। এনিয়ে সবার আগ্রহ, ভোটের পরিবেশ নিয়ে দল, প্রার্থী, ভোটার ও গণমাধ্যম তা পর্যবেক্ষণ করছে।
সেনা মোতায়েনের পক্ষে-বিপক্ষে দলগুলো বক্তব্য দিলেও কমিশন শুরুতেই বলে দিয়েছে, স্থানীয় সরকারে নির্বাচনে সেনা মোতায়েন হবে না। প্রয়োজনে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা হবে।
বহিরাগতদের নিষেধাজ্ঞা শনিবার, প্রচারের শেষ

খুলনা সিটি করপোরেশনে মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোট চলবে। আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের প্রার্থী অংশ নিচ্ছেন দলীয় প্রতীকের এ নির্বাচনে। তাদের পক্ষে কেন্দ্রীয় নেতারা প্রচারণায় রয়েছেন।
ইসির নির্বাচন ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয় শাখার উপ সচিব ফরহাদ হোসেন জানান, ১২ মে শনিবার রাত ১২টার মধ্যে বহিরাগতদের এলাকা ছাড়তে হবে। সংশ্লিষ্ট সিটির ভোটার নন এমন ব্যক্তিদের ওপর নির্ধারিত সময়ের পরে নিষেধাজ্ঞা থাকবে।
ভোটের ৩২ ঘণ্টা আগে প্রার্থীদের সব ধরনের প্রচারণা শেষ করতে হবে। সেক্ষেত্রে রোববার রাত ১২টা থেকে প্রচারণা বন্ধ করতে হবে। আজ সোমবার প্রথম প্রহর থেকে ভোটের পরে আরও ৪৮ ঘণ্টা সব ধরনের মিছিল, শোডাউন, আনন্দ মিছিল বন্ধ থাকবে আচরণবিধি অনুযায়ী।
চার দিন নিরাপত্তার চাদরে খুলনা
খুলনা সিটি করপোরেশনে ভোটের আগে দুই দিন, ভোটের দিন ও পরের দিন মিলিয়ে ১৩ থেকে ১৬ মে পর্যন্ত পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব, আনসার-ভিডিপি, ব্যাটালিয়ন আনসারসহ নিয়মিত বাহিনীর সদস্যরা আইন শৃঙ্খলায় নিয়োজিত থাকবেন।
ভোটের আগের দিন আজ সোমবার কেন্দ্রে কেন্দ্রে মালামাল পৌঁছানো ও ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তায় নিয়োজিত সদস্যরা থাকবেন। প্রতিটি কেন্দ্রে সাধারণ ও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ২২-২৪ জন আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য নিয়োজিত থাকবেন।
তফসিল ঘোষণার পর থেকে খুলনা সিটিতে তিন ধাপে নির্বাহী হাকিম দায়িত্ব পালন করছেন। ভোটের আগে-পরে চার দিন বিচারিক হাকিম রয়েছে মাঠে। খুলনায় ভোটের দিন নির্বাহী হাকিম থাকবেন ৪৯ জন ও বিচারিক হাকিম ১০ জন।
পুলিশ-এপিবিএন-আনসার ব্যাটালিয়ান নিয়ে মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স ১০টি টিম; র‌্যাবের ৩১টি টিম; বিজিবি থাকবে ১৬ প্লাটুন। রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে ৩-৪ প্লাটুন অতিরিক্ত বিজিবি মোতায়েন রাখা হবে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের প্রতিটি প্লাটুন গঠন করা হয় ২০ থেকে ৩০ জন সদস্য নিয়ে। ভোটের মাঠে প্রতি প্লাটুনে কতজন থাকবেন তা এলাকা অনুযায়ী ঠিক করা হবে।
ইসির নিজস্ব পর্যবেক্ষক থাকবেন ১০ নির্বাচন কর্মকর্তা।
ইভিএমে ভোট হবে দুই কেন্দ্রে। ১০টি ভোটকক্ষের প্রতিটিতে একটি করে ইভিএম থাকবে। তাতে মেয়র পদে প্রার্থীদের নাম ও প্রতীক এবং সাধারণ কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে প্রার্থীদের প্রতীকে বোতাম চেপে ভোট দেবেন ভোটাররা।
২৪ নম্বর ওয়ার্ডের ২০৬ নম্বর কেন্দ্র ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের ২৩৯ নম্বর কেন্দ্রে ১০টি ইভিএম থাকবে।
শেরেবাংলা রোডের সোনাপোতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের ১০৯৯ জন ভোটারের জন্য ৪টি ভোটকক্ষে ও খানজাহান আলী রোডের পিটিআই জসিম উদ্দীন হোস্টেলের নিচতলার কেন্দ্রে ১৮৭২ ভোটারের জন্য ৬টি ভোটকক্ষ রয়েছে।
২০১৩ সালে পাঁচ সিটিতেই বিএনপিসমর্থিত প্রার্থীরা জয়ী হন। ৫ বছর আগে নির্দলীয় প্রতীকে ভোট হলেও এবার মেয়র পদে দলীয়ভাবে ভোট হবে।
চলতি বছরের নভেম্বর-জানুয়ারির মধ্যে হবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এজন্যে আগামী জুলাইয়ের মধ্যে পাঁচ সিটির ভোট শেষ করার কথা ইতোমধ্যে জানিয়েছেন সিইসি নূরুল হুদা।

Previous articleস্যাটেলাইট উৎক্ষেপণে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা
Next articleসরকার ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ করছে, লড়াই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে : মঞ্জু