ছাত্রদল নেতা পলাশ হত্যা মামলার রায়ে ৯ জনের যাবজ্জীবন, ২ জন খালাস

253

 

কল্যাণ রিপোর্ট : যশোরে জেলা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি কবির হোসেন পলাশ হত্যা মামলার রায়ে ৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক বছরের কারাদণ্ডদেশ দিয়েছেন। খুলনা বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক এম এ রব হাওলাদার মঙ্গলবার দুপুরে এ রায় ঘোষণা করেন। এ মামলায় দুইজনকে খালাস দিয়েছেন আদালত।

‘মামলার বাদী ফারহানা ইয়াসমিন রুমা বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী মাসুদ খালাস পেয়েছে, যা সন্তোষজনক নয়। এ মামলা নিয়ে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে।’

 

যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তরা হলেন যশোর শহরের ষষ্টিতলাপাড়ার মৃত শফি মিয়ার ছেলে তরিকুল ইসলাম, চাঁচড়া রায়পাড়ার মৃত বেলায়েত হোসেনের ছেলে প্রিন্স ওরফে বিহারি প্রিন্স (পলাতক), গাড়িখানা রোডের মসলেম উদ্দিন ড্রাইভারের ছেলে জাহিদুল ইসলাম ওরফে কালা মানিক (পলাতক), ঘোপ বৌ-বাজার এলাকার মজিবর শেখের ছেলে রবিউল শেখ (পলাতক), ঘোপ নওয়াপাড়া রোডের গাজী জাহিদুর রহমানের ছেলে সজল, সিদ্দিকুর রহমানের ছেলে টুটুল গাজী, বেজপাড়ার টিবি ক্লিনিক এলাকার ফিরোজ আলীর ছেলে ফয়সাল গাজী, রেলগেট পশ্চিমপাড়ার বিল্লাল খানের ছেলে শহিদুল ইসলাম খান ওরফে সাইদুল (পলাতক), বাঘারপাড়া উপজেলার বহরমপুর গ্রামের আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে শহরের ষষ্টিতলাপাড়ার ভাড়াটিয়া শহিদুল ইসলাম (পলাতক)।
খালাসপ্রাপ্তরা হলেন আশা এন্টারপ্রাইজের মালিক ও যশোর শহরের চাঁচড়া রায়পাড়া এলাকার নজরুল ইসলামের ছেলে আল মাসুদ রানা ওরফে মাসুদ ও পূর্ব বারান্দিপাড়া কবরস্থান রোডের আব্দুল করিম ফকিরের ছেলে রাজ্জাক ফকির।
দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের উচ্চমান বেঞ্চ সহকারী ফকির মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘মামলাটির শুনানির সময় ৪৩ জন সাক্ষীর মধ্যে ২৯ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার এ মামলার যুক্তিতর্ক ও শুনানি শেষ হয়। মঙ্গলবার বিচারক এ মামলার রায় ঘোষণা করেন।
খুলনার বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের পিপি অ্যাডভোকেট এনামুল হক বলেন, ‘রায়ে মামলার প্রধান আসামি ও হত্যাকা-ের পরিকল্পনাকারী খালাস পেয়েছেন। তারপরও রায়ে আমরা সন্তুষ্ট।’
মামলার বাদী ফারহানা ইয়াসমিন রুমা বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী মাসুদ খালাস পেয়েছে, যা সন্তোষজনক নয়। এ মামলা নিয়ে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে।’
রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন বিশেষ পিপি শেখ এনামুল হক ও বেগম সাকেরিন সুলতানা। আসামি পক্ষে ছিলেন আব্দুল মালেক, এম এম মুজিবুর রহমান, রজব আলী, গাজী রাজু আহমেদ, নিরঞ্জন কুমার ঘোষ, শেখ মোহাম্মদ আলী প্রমুখ।
মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণে জানা যায়, ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে শহরের ঈদগাহ মোড়ে চায়ের দোকানে বন্ধুদের সঙ্গে বসে ছিলেন কবির হোসেন পলাশ। এ সময় দুটি মোটরসাইকেলে সন্ত্রাসীরা এসে পলাশকে গুলি করে ও বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যায়। স্থানীয়রা উদ্ধার করে যশোর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় নিহতের বোন ফারহানা ইয়াসমিন ১৩ ডিসেম্বর হত্যা মামলা দায়ের করেন।
তদন্ত শেষে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের এসআই আবুল খায়ের মোল্লা ২০১৪ সালের ৯ এপ্রিল ১০ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন। তবে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে আসা হত্যার পরিকল্পনাকারী ব্যবসায়ী মাসুদ ও সন্দেহভাজন হিসেবে আটক শফিকুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের অব্যাহতির আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। হত্যা পরিকল্পনাকারীকে অব্যাহতির সুপারিশ করায় মামলার বাদী ফারহানা ইয়াসমিন রুমা আদালতে দাখিল করা দুটি চার্জশিটের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালের ১৩ জুলাই নারাজি পিটিশন দাখিল করেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে বিচারক মামলাটি পুনঃতদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) যশোরকে নির্দেশ দেন। তদন্ত শেষে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই যশোরের ওসি একেএম ফারুক হোসেন হত্যার পরিকল্পনাকারী মাসুদসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে হত্যা ও বিস্ফোরণের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পান। এরপর তিনি এ চার্জশিট দাখিল করেন। একই সঙ্গে তদন্তকালে আটক শফিকুল ইসলাম শফিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়।
চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়, যশোর বিভাগীয় কাস্টমসে ২০১৩ সালের ২৯ আগস্ট অপচনশীল পণ্যের ৮টি লটের নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। ওই নিলামে কবির হোসেন পলাশ ও তার ব্যবসার পার্টনার এনামুল হকসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। নিলামে ৮ লটের মালামালের মধ্যে পলাশ এন্টারপ্রাইজের প্রোপাইটর ভিকটিম পলাশ ৩টি লট এবং তার পার্টনার এনামুল হক ২টি লটসহ মোট ৫টি লটের মালামাল পায়। অপরদিকে পলাশের প্রতিপক্ষ আশা এন্টারপ্রাইজের মালিকের ছেলে আল মাসুদ রানা ওরফে মাসুদের ব্যবসার পার্টনার কামরুজ্জামান চঞ্চল একটি লটের নিলাম পায়। এছাড়া মেসার্স এএম ট্রেডার্স যশোর ও ইসলাম ট্রেডার্স যশোর নামে দুটি প্রতিষ্ঠান দুটি লটের মালামাল নিলামে ক্রয় করে। এতে পলাশের প্রতিপক্ষ মাসুদ রানা ওরফে মাসুদ ক্ষুব্ধ হয়। ২০১৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বেলা সাড়ে ১০টার সময় কবির হোসেন পলাশ ও তার ব্যবসার পার্টনার নিলামে পাওয়া লটের মালামাল নেওয়ার সময় আশা এন্টারপ্রাইজের মালিকের ছেলে মো. আল মাসুদ রানা ওরফে মাসুদ ঘটনাস্থলে আসে। মাসুদ দুটি মোটরসাইকেলে করে সন্ত্রাসী প্রিন্স ওরফে বিহারি প্রিন্স, তরিকুল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম, মো. জাহিদুল ইসলাম ওরফে কালা মানিক, শহিদুল ইসলাম খান ওরফে সাইদুলকে নিয়ে কাস্টমস গোডাউন চত্বরে ঢুকে গোডাউন অফিসার শম্ভুনাথকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি ও হুমকি দেয়। পরে মাসুদ ও তার সহযোগীরা পলাশের মালামাল নিতে বাধা দেয় এবং তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়।
চার্জশিটে আরও উল্লেখ করা হয়, মাসুদ ও তার সহযোগীরা সর্বদা প্রভাব খাটিয়ে কাস্টমসের নিলাম সামগ্রী একচেটিয়া ক্রয় করতো। পলাশ প্রকাশ্যে টেন্ডারে অংশ নেওয়ায় তাদের ব্যবসায় বাধা সৃষ্টি হয়। এ কারণে আসামিদের সঙ্গে পলাশের বিরোধ সৃষ্টি হয়। ফলশ্রুতিতে পলাশকে হত্যার পরিকল্পনা করে বলে তদন্তে জানা যায়। ওই বছরের ১০ ডিসেম্বর কাস্টমস গোডাউনে আরও একটি বড় ধরনের নিলামের দিন ধার্য ছিল। পলাশ যাতে ওই নিলামে অংশ নিতে না পারে সেজন্য আগের দিন ৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় পলাশকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়।

Previous articleযশোরে চাঞ্চল্যকর ছাত্রদলের সহসভাপতি পলাশ হত্যা মামলার রায় আগামীকাল
Next articleসংলাপের উদ্যোগ রাজনীতির জন্য সুবাতাস