সংলাপের পথ ধরে নির্বাচন

115

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা

‘অনেকেই হয়তো বলবেন, সরকারের ভেতর একটি অজানা শংকা কাজ করছে। তবে, এই শংকা একেবারে অমূলক নয় এই কারণে যে, অতীতে এমনটা ঘটেছে এই দেশে।’

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ড. কামাল হোসেনের ঐক্যফ্রন্টের সাথে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের দ্বিতীয় দফা সংলাপ শেষ হলো গত বুধবার। গণমাধ্যমে দুপক্ষের আলোচনার বিস্তারিত আসছে নানাভাবে। তবে, এর মধ্যেই ঐক্যফ্রন্টের রাজশাহী লংমার্চ স্থগিতের পরপরই দেখা গেল প্রধানমন্ত্রী তার নির্ধারিত সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করেছেন। দুটোই হওয়ার কথা ছিল বৃহস্পতিবার। তবে বৃহস্পতিবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার জাতির উদ্দেশ্যে তার নির্ধারিত ভাষণ দিয়েছেন এবং নির্বাচনের তফসিলও জানিয়ে দিয়েছেন।
নির্বাচন হচ্ছে এবং দেখার বিষয় কিভাবে তা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের মূল ভাবনা হচ্ছে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করা। বর্তমান সংসদে প্রতিনিধিত্ব রয়েছে ৪১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৭টি দলের। আওয়ামী লীগ চাইবে এই সংখ্যা বাড়ুক।
নির্বাচন শেখ হাসিনার সরকারে অধীনেই হবে এবং একটি ভাল নির্বাচন হবে এটাই প্রত্যাশা। সংলাপে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যে সব দাবি করেছে প্রায় সবগুলোই যুক্তির কাছে পরাভূত হয়েছে। যেমন সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে নির্বাচন করতে হবে, এমন দাবি যিনি করছেন সেই কামাল হোসেন ৭২ এর সংবিধানের প্রণেতাদের একজন, অথচ ৭২-এর সংবিধানে সংসদ ভেঙ্গে নির্বাচনের বিধান নেই। সংলাপে শেখ হাসিনা একথাটি কেবল মনে করিয়ে দিয়েছেন তাকে।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে দ্বিতীয় দাবি ছিল, নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার। সংবিধানের ১২৩ (খ) প্রয়োগ করে, সংসদ ভাঙার ৯০ দিন পর নির্বাচনের দাবি উত্থাপন করা হয়। প্রশ্ন হলো সংসদের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। সংসদ এখন নিষ্ক্রিয়। এখন কোন সাংবিধানিক বিধানে সংসদ ভাঙা যায়? ড. কামালের এই দাবিও আসলে কোন যুক্তিগ্রাহ্য অনুমোদন পায়নি।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আরেক দাবি ছিল প্রধানমন্ত্রী থাকবে। কিন্তু ১০ সদস্যের একটি উপদেষ্টাম-লী দেশ চালাবে। সংবিধানে এরকম উপদেষ্টাদের দিয়ে দেশ চালানোর বিধান না থাকায় এটিও গৃহীত হয়নি।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে দাবি তোলা হয়, বেগম জিয়াকে যেন নির্বাচনের আগে জামিন দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন এটি আদালতের বিষয় এবং রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ একজনকে আটক ব্যক্তিকে জামিন দিতে পারেনা। এটা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে নয়।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন এবং সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দেওয়ার দাবি জানানো হয়। প্রশ্ন হলো সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি দেওয়া সংবিধানের পরিপন্থী এবং দুনিয়ার কোথাও এই নজির নেই।
বহুল আলোচিত এই সংলাপ নিয়ে রাজনীতির মাঠে এখন এবং ভবিষ্যতে আলোচনা হয়তো চলতে থাকবে। তবে মূল জায়গায় শেখ হাসিনার যুক্তির কাছে অসাংবিধানিক কোন যুক্তি ধোপে টিকেনি। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে, সরকারের দিক থেকে এই আশ্বাসের উপরই সবাইকে নির্ভর করতে হচ্ছে।
প্রধান উপদেষ্টা ও ১০ জন উপদেষ্টার প্রস্তাব সংবিধানসম্মত নয়, এটা সরকারের বক্তব্য এবং এর সপক্ষে ঐক্যফ্রন্ট নেতারা পাল্টা কোন শক্ত যুক্তি দিতে পারেননি। আর সংসদ ভেঙে দেয়ার এখন আর কোন সুযোগ নেই এবং যদি তা করাও হয় তাহলে তৃতীয় পক্ষ সুযোগ নিতে পারে।
অনেকেই হয়তো বলবেন, সরকারের ভেতর একটি অজানা শংকা কাজ করছে। তবে, এই শংকা একেবারে অমূলক নয় এই কারণে যে, অতীতে এমনটা ঘটেছে এই দেশে।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন ড. কামাল হোসেনের ঐক্যফ্রন্টের প্রস্তাবগুলো নতুন কিছু নয়, এগুলো অনেক দিন ধরেই আলোচনায় আছে এবং প্রত্যাখ্যাত হয়ে চলেছে এই কারণে এগুলো সংবিধান সম্মত নয়। সরকার তবুও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাথে শুধু নয়, আরও অনেক দলের সাথে আলোচনা করেছে। এত বোঝা যায় সরকার সংলাপের পরিধি বড় করে একটি অংশগ্রহণমূলক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করেই নির্বাচন করতে চায়।
সংলাপের সাফল্য এই যে, বিরোধী দলের সভাসমাবেশ হচ্ছে, তাদের গ্রেফতার ভীতি কমেছে। অন্যদিকে সরকার এটুকু ধারণা অভ্যন্তরীণভাবে এবং আন্তর্জাতিকভাবে দিতে পারছে যে, নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে।
এর আগে ২০১৩ সালে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া আলোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর টেলিফোনে সাড়া দেননি। ফলে শেখ হাসিনা আসলে আর কোন সংলাপ চাচ্ছেন না। তবুও তিনি এবার সংলাপ করেছেন এবং হয়তো আরো করবেন। এটি একটি বড় অগ্রগতি।
ড. কামালরা বলছেন, দেশে একটি ‘অস্বাভাবিক পরিস্থিতি’ তৈরি হয়েছে, যার ফলে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকারকে হটাবার জন্য তারা বিএনপি’র সাথে জামায়াত আছে জেনেও তার প্রতি কৌশলগত ‘নমনীয়তা’ দেখাচ্ছেন তারা।
আবার অন্যদিকে সরকারকে আমরা দেখছি হেফাজতের মতো একটি গোড়া ধর্মীয় গোষ্ঠীর সাথে পথ চলছে। নির্বাচনে আগে আগে এমনসব পথ চলা ঠিক আদর্শিক নয়, এটা সবাই বোঝে। এমনসব সমঝোতা আর বিরোধিতার পথ ধরে আমাদের জন্য কি অপেক্ষা করছে তা কেবল সময়ই বলবে।
লেখক : প্রধান সম্পাদক, জিটিভি।

Previous articleএকটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ শিক্ষকদের জীবনমানের উন্নতি হবে
Next article‘আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার মতো অবস্থা’