হিন্দুত্ব আর জাতীয়তাবাদের মতো বিষয়ে ভারতে ভুয়া খবর ছড়াচ্ছে: বিবিসি’র গবেষণা

163

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : কিছুদিন আগে একটা মেসেজ হোয়াটসঅ্যাপে বেশ ঘোরাঘুরি করছিল। বার্তাটা ছিল এরকম: “সব ভারতীয়কে অভিনন্দন! ইউনেস্কো ভারতীয় মুদ্রাকে সর্বশ্রেষ্ঠ কারেন্সি বলে ঘোষণা করেছে। এটা প্রত্যেক ভারতীয়র জন্য গর্বের বিষয়।”
একটু ভাবলেই বোঝা যায় যে এই মেসেজটা ছিল ভুয়া।
কিন্তু তা সত্ত্বেও বহু মানুষ এটাকে বিশ্বাস করে ফরোয়ার্ড করেছেন চেনা পরিচিতদের কাছে।
এদের মধ্যে একটা মানসিকতা কাজ করেছে, যে তারা রাষ্ট্র নির্মানের কাজে বোধহয় সাহায্য করছে এই বার্তা দিকে দিকে ছড়িয়ে দিয়ে।
বিবিসি-র একটি গবেষণায় দেখা গেছে মানুষ রাষ্ট্র নির্মানের ভাবনা নিয়েই জাতীয়তাবাদী নানা ভুয়ো মেসেজ শেয়ার করছেন।
ভারত, কেনিয়া আর নাইজেরিয়ায় এই গবেষণা চালিয়েছে বিবিসি। এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে মানুষ কী ধরণের ভুয়ো খবর ছড়াচ্ছেন, সেটা বোঝার উদ্দেশ্যেই এই গবেষণা। দেখা যাচ্ছে যে ভুয়ো খবর ছড়ানোর পেছনে মানুষের চিন্তাভাবনার একটা বড় ভূমিকা রয়েছে।
‘বিয়ন্ড ফেক নিউজ’ নামে বিবিসির এই গবেষণায় সাহায্য করার জন্য বেশ কিছু মোবাইল ব্যবহারকারী তাদের ফোনের এক্সেস দিয়েছিলেন আমাদের।
বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের অডিয়েন্স রিসার্চ বিভাগের প্রধান ডক্টর শান্তনু চক্রবর্তীর কথায়, “এই গবেষণায় আমরা এটাই বুঝতে চেষ্টা করেছি, যে ব্যক্তি ভুয়ো খবর ছড়িয়ে পড়া নিয়ে চিন্তান্বিত হওয়ার দাবী করছেন, সেই ব্যক্তিই আবার ভুয়ো খবর ছড়িয়েও দিচ্ছেন।”
ভারতের অনেক মানুষই সেই সব মেসেজ শেয়ার করার আগে কয়েকবার চিন্তা করেন, যা থেকে হিংসা ছড়াতে পারে।
কিন্তু সেই মানুষরাই আবার নানা ধরণের জাতীয়তাবাদী মেসেজ না ভেবেই শেয়ার করে দিচ্ছেন।
কেন মানুষ ভুয়া খবর ছড়াচ্ছে?
‘ভারতের অগ্রগতি’, ‘হিন্দু শক্তি’ এবং ‘হিন্দুদের হারিয়ে যাওয়া গুরুত্ব পুন:প্রতিষ্ঠা করা’ র মতো বিষয়গুলো নিয়ে কোনও পোস্ট বা মেসেজ এলে খতিয়ে না দেখেই বিপুল সংখ্যায় শেয়ার করে দেওয়া হচ্ছে।
এরা মনে করছেন, তারা জাতির জন্য একটা ভাল কাজ করছেন।

তবে কেনিয়া আর নাইজেরিয়ায় যত ভুয়ো খবর ছড়ানো হয়, সেখানে বেশীরভাগ মানুষের মনে ‘ব্রেকিং নিউজ’ কে কত তাড়াতাড়ি পরিচিত মানুষদের কাছে পাঠাতে পারে, সেই চিন্তা থাকে।
কোনও ভুয়া খবর কেউ যখন ফরোয়ার্ড করেন, তখন সেই খবরের উৎস সম্বন্ধে খোঁজ খবর নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না, বরং তারা শুধু এটা দেখেন যে ওই মেসেজ কে পাঠিয়েছে।
যদি সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত কোনও ব্যক্তি ওই মেসেজ পাঠিয়ে থাকে, তাহলে নিশ্চিন্ত মনে নিজের কর্তব্য মনে করে সেটাই ফরোয়ার্ড করে দিচ্ছেন মানুষ।
ভুয়া খবর খতিয়ে না দেখেই হাজার হাজার মানুষ শেয়ার করে দিচ্ছেন এবং তারা এটা মনেও করেন না যে কোনও খারাপ কিছু করছেন। তারা ভাবছেন না যে নিজের মতামত প্রতিষ্ঠা করার জন্য সত্যের নয়, মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছেন।
ভুয়া খবর ছড়ানোর পেছনে মূলধারা গণমাধ্যমের দায়িত্বের বিষয়টিও গবেষণায় উঠে এসেছে।
দেখা গেছে যে ভুয়া খবর যাতে না ছড়ায়, তার জন্য গণমাধ্যম খুব একটা কার্যকরী ভূমিকা এই জন্য নিতে পারছে না, যে তাদের নিজেদের অবস্থানটাই বেশ নড়বড়ে। অনেক মানুষ মনে করেন যে রাজনৈতিক আর ব্যবসায়িক স্বার্থের কাছে মূলধারার অনেক গণমাধ্যমই ‘বিক্রি’ হয়ে গেছে। তাই তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন আছে সেই সব মানুষের মনে।
টুইটারে কীভাবে ভুয়ো খবর ছড়ানো হচ্ছে, তা বুঝতে বিবিসি ১৬ হাজার টুইটার অ্যাকাউন্ট খতিয়ে দেখেছে। এটা দেখা গেছে যে নরেন্দ্র মোদীর সমর্থকদের নিজেদের মধ্যে একটা স্পষ্ট যোগাযোগ রয়েছে এবং তারা রীতিমতো একটা সংগঠিত ভাবে কাজ করে থাকেন।
‘হিন্দুত্ব’, ‘জাতীয়তাবাদ’, ‘মোদী’, ‘সেনাবাহিনী’, ‘দেশভক্তি’, ‘পাকিস্তান বিরোধিতা’ এবং ‘সংখ্যালঘুদের দোষী সাব্যস্ত’ করার মতো বার্তা ছড়ায়ে যে সব টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে, তারা নিজেদের মধ্যে একটা নেটওয়ার্ক তৈরি করে রেখেছে।
অন্যদিকে, বহুধা বিভক্ত সমাজে এদের যারা বিরোধী মতের অনুসারী, তারা কিছুটা বিচ্ছিন্ন। তবে মি. মোদী বা হিন্দুত্বের রাজনীতিই এদের এক সূত্রে গেঁথে রাখে অনেক সময়ে।
টুইটার থেকে যে ফলাফল পাওয়া গেছে, মোটামুটিভাবে হোয়াটসঅ্যাপের ক্ষেত্রেও সেটা একইরকম।
জাতীয়তাবাদকে পুঁজি করে বিদ্বেষ কারা ছড়াচ্ছে?
হিন্দু জাতীয়তাবাদের কথা ছড়িয়ে দেন যারা, তাদের মোটামুটি তিনটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে।
প্রথমেই বলতে হয় প্রাচীনপন্থী হিন্দুদের কথা, যারা কোনও ধরণের সামাজিক পরিবর্তনেরই বিপক্ষে।
দ্বিতীয় ভাগে পড়েন সেইসব প্রগতিশীল হিন্দু, যারা অন্ধভক্ত নয়, কিন্তু নিজের ধর্ম নিয়ে গর্বিত এবং ধর্মের ধ্বজা উঁচু রাখার ব্যাপারে চিন্তিত।
এই দুটি ভাগই কিন্তু মি. মোদীকে নিজেদের নেতা বলে মেনে থাকেন।
আর তৃতীয় ভাগটিকে কট্টরপন্থী বলা যেতে পারে, যারা সংখ্যালঘুদের বিষয়ে উগ্র এবং হিংসাত্মক ভাবনাচিন্তা নিয়ে চলেন।
অন্যদিকে মোদি বিরোধীদের চার ভাগে ভাগ করা যেতে পারে।
নোট বাতিল, জি এস টির মতো নীতিগত বিষয়গুলির বিরোধিতা করেন একটা ভাগ। অন্য একটা ভাগে যেসব মানুষ আছেন, তারা মূলত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। তৃতীয় অংশটি সেই সব মানুষের, যারা মি. মোদীকে ভোট দিয়েছিলেন, কিন্তু এখন হতাশ। আর চতুর্থ ভাগটি কংগ্রেস এবং অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির সরাসরি সমর্থকদের।
মোদি-বিরোধীরা সামাজিক মাধ্যমে বেশ অগোছালো অবস্থায় আছেন, যেরকমটা দেশের রাজনীতিতেও তারা কিছুটা অগোছালো।
কিন্তু টুইটার বিশ্লেষণ করে বিবিসির রিসার্চ টিম দেখছে যে মোদী সমর্থক এবং ভুয়ো খবর ছড়ানো হয় যেসব অ্যাকাউন্ট থেকে, এই দুই অংশের মধ্যে একটা যোগসূত্র রয়েছে।
মোদী-বিরোধীরাও ভুয়া খবর ছড়িয়ে থাকেন, কিন্তু তারা খুব একটা সক্রিয় নন।
গবেষণায় এটাও দেখা গেছে যে প্রধানমন্ত্রীর টুইটার অ্যাকাউন্ট ফলো করেন এমন বেশ কিছু ব্যক্তি, যাদের অ্যাকাউন্ট থেকে ভুয়া খবর ছড়ানো হয়।
মি. মোদীর টুইটার হ্যান্ডেল যারা ফলো করেন, তাদের মধ্যে ৫৬.২ % অ্যাকাউন্ট ভেরিফায়েড নয়। অর্থাৎ যেসব অ্যাকাউন্টের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে টুইটারের সন্দেহ রয়েছে।
ভেরিফায়েড নয়, এমন অ্যাকাউন্টগুলির ৬১% বিজেপির হয়ে প্রচার করে।
বিজেপি দাবী করে থাকে যে প্রধানমন্ত্রী টুইটারে ওইসব অ্যকাউন্ট গুলোকে ফলো করার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করে থাকেন। কিন্তু এইসব আন-ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টগুলিকে মোট ২৫৩৭০ জন ফলো করে থাকেন এবং ওই অ্যাকাউন্টগুলি থেকে ৪৮৩৮৮ টি টুইট করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী এইসব অ্যাকাউন্টগুলিকে ফলো করে তাদের একরকম মান্যতা দিয়ে দিচ্ছেন।
আন-ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টগুলির ধারকদের বেশীরভাগই নিজেদের পরিচয়ে লিখে থাকেন যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী তাদের অ্যাকাউন্টের ফলোয়ার।
উল্টে দিকে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীর ফলোয়ারদের মধ্যে ১১% আনভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট।

Previous articleমুশফিক ঝলকে দিনটা টাইগারদের
Next articleইবির ভর্তি পরীক্ষা ভুল-অনিয়মের দায় কার?