মনোনয়ন নেবেন, মনোনয়ন?

227

আহসান কবির

আহসান কবিরএক লোক ফুচকা-চটপটি বিক্রি করে। টয়লেট থেকে বেরিয়ে সে দেখলো, তার দোকানে দুই নারী ক্রেতা এসেছে। তাদের মধ্যে কথোপকথন।

চটপটিওয়ালা : আপারা চটপটি খাইবেন?

প্রথম মহিলা : খাবো। কিন্তু তার আগে একটা কথা জানতে চাই। আপনি কি টয়লেট থেকে বেরিয়ে সাবান দিয়ে ঠিকমতো হাতটাত ধুয়ে তারপর চটপটি বানান?

চটপটিওয়ালা : কী যে বলেন আপা! আমার যেইটা প্রয়োজন, আমি সেইটা করি। আমি ঠিকমতো সাবান দিয়ে হাতটাত ধুয়ে তারপর টয়লেটে যাই! ‘মরিচ-ঝাল’ নিয়ে কারবার করি তো! টয়লেট থেকে বাইর হইয়া সাবান নষ্ট করার কী দরকার?

চটপটিওয়ালার মতো যার যেটা প্রয়োজন, সে সেটা করবে। বাংলাদেশে ২০১৮-এর নভেম্বরে কারও কারও হয়তো সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল মনোনয়ন কেনার। যাদের প্রয়োজন, তারা কিনেছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন। মনোনয়ন কেনা একটা উৎসব বা গর্ব করার মতো ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা বলে মনোনয়নের গুরুত্বটা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মনোনয়ন একটা স্ট্যাটাস সিম্বল হয়েই দাঁড়ালো কিনা!

বিচারপতি সাত্তার ও এরশাদের আমলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে মজার ঘটনা ঘটেছিল। তখন কয়েকজন প্রার্থী বাড়ির সাইনবোর্ডে লিখে রাখতেন, ‘রাষ্ট্রপতি পদ প্রার্থী’! মজা করার জন্য পাড়ার ছেলেরা কোনও কোনও প্রার্থীর বাসায় টেলিফোন করতো। ফোন রিসিভ করার পর ওই প্রার্থী বলতেন, ‘রাষ্ট্রপতি পদ প্রার্থী অমুক বলছি।’ নির্বাচন হয়ে যাওয়ার কয়েক বছর পর পর্যন্ত ওই ভদ্রলোক এই পরিচয়টা দিতেন। কয়েকজন রাষ্ট্রপতি পদ প্রার্থীকে জনপ্রিয় টেলিভিশন উপস্থাপক ফজলে লোহানী এক অনুষ্ঠানে (সম্ভবত ‘যদি কিছু মনে না করেন’) আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। একজনকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, দুর্নীতি দমন করবেন কীভাবে? ‘পদ প্রার্থী ভদ্রলোক’ উত্তর দিয়েছিলেন, বাঘকে ব্যবহার করে। দুর্নীতিবাজদের গ্রেফতার করার পর রয়েল বেঙ্গল টাইগারদের দিয়ে খাওয়াবো। যদি সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার সব দুর্নীতিবাজকে খেয়ে শেষ না করতে পারে, তাহলে আফ্রিকা থেকে সিংহ আমদানি করবো!

সম্ভবত, ওই সময়ে যারা নির্বাচনে প্রার্থী হতেন, তারা প্রচারণার জন্য বিনে পয়সায় ট্রেনে চড়তে পারতেন। তখনকার টেলিভিশনে (একমাত্র বিটিভি) তাদের বক্তব্য দেখানো হতো। এসব পাওয়ার জন্য কেউ কেউ নির্বাচনে দাঁড়াতেন। এবার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার জন্যও নাকি কেউ কেউ মনোনয়ন কিনেছেন।

টাইগার জলিল নামে বাংলাদেশে একজন কুস্তিগির ছিলেন। তিনি অবশ্য কখনও নির্বাচনে প্রার্থী হননি। এদেশে ক্রিকেট খেলোয়াড়দের এখন টাইগার নামে ডাকা হয়। ২০১৮-এর ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য সংসদ নির্বাচনে জনি প্রয় দুই ‘টাইগার’-এর মনোনয়ন কেনার কথা ছিল। একজন মাশরাফি বিন মর্তুজা, অন্যজন সাকিব আল হাসান। শেষমেষ মাশরাফি কিনেছেন, সাকিব আল হাসানের কেনা হয়নি। নড়াইল-২ আসন থেকে লড়বেন মাশরাফি। তার জন্য এই নির্বাচনে অংশ নেওয়াটা ‘স্বম্ভবত খুব তাড়াতাড়ি’ হয়ে গেলো। সরকারি চাকরিজীবীরা চাকরি ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচন করতে পারেন না। কিছুদিন অপেক্ষা করতে হয়। আগামী ডিসেম্বরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে বাংলাদেশের খেলা। তারপর বিশ্বকাপ তো রয়েই গেলো।

এবারের নির্বাচনে রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী ছাড়াও মনোনয়ন কিনেছেন সঙ্গীতশিল্পী (যেমন, মনির খান, বেবি নাজনীন, কনকচাপা), অভিনেত্রী (কবরী, শমী কায়সার, রোকেয়া প্রাচী, জ্যোতিকা জ্যোতি), অভিনেতা ( নায়ক ফারুক, শাকিল খান, ডিপজল, সোহেল রানার কথাও শোনা যাচ্ছে), খেলোয়াড় (জাতীয় দলের সাবেক গোলরক্ষক আমিনুল, দুর্জয়, দেওয়ান সফিউল আরেফিন টুটুল, মাশরাফি, সালাম মুর্শেদী, খুরশিদ আলম বাবুল, আরিফ খান জয়), সাবেক আইজিপি নুর মোহাম্মাদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফরাসউদ্দীন, ওয়ান ইলেভেনে আলোচিত লে. জেনারেল (অব) মাসুদ উদ্দীন চৌধুরীসহ অনেকে।

শুধু কবি-কথাসাহিত্যিকদের কেউ এখন পর্যন্ত মনোনয়ন কেনেননি। বহু বছর আগে একবার নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। তিনি তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশে বলেছিলেন, আমার ২৯৯টা নৌকার সঙ্গে কোনও বিরোধ বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা নাই। আমি শুধু আমার এলাকার নৌকার বিপক্ষে। নির্মলেন্দু গুণের প্রতীক ছিল কুমির। তাঁর নির্বাচন নিয়ে লিখেছিলেন জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক হ‌ুমায়ূন আহমেদ। লিখেছিলেন-ঢাকা থেকে কুমির আঁকানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। নেত্রকোনা নিয়ে সেই কুমিরের ছবি টানানো হলো। এলাকাবাসী বলতে শুরু করলো, ঢাকার কুমির নেত্রকোনা আসতে আসতে টিকটিকি হয়ে গেছে।

এবারে নমিনেশন কিনেছেন হিরো আলম। বগুড়ার একটি আসনের জন্য তিনি জাতীয় পার্টি থেকে নমিনেশন কিনেছেন। তার ধারণা তার আর এরশাদের মিলিত জনপ্রিয়তায় তিনি জিতে আসতে পারবেন। এর আগেও হিরো আলম ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন করেছিলেন। দুবারই পরাজিত হয়েছেন। কিন্তু পরাজয়ে ডরে নাকো ‘হিরো’। তিনি এমপি হিসেবে জিতে আসার ব্যাপারে আশাবাদী। তিনি এমপি হলেও ‘হিরোগিরি’ ছাড়বেন না বলে জানিয়েছেন। একটি বেসরকারি চ্যানেলের লাইভে হিরো আলমকে অতিথি বানানো হয়েছিল বলেই এত কিছু জানা গেছে।

খেলোয়াড় কিংবা অভিনেতা-অভিনেত্রীদের রাজনীতিতে আগমন নতুন কিছু নয়। কমান্ডো খ্যাত অভিনেতা আরনোলড সোয়ার্জিনেগার আমেরিকার একটি রাজ্যের মেয়র হয়েছিলেন। অমিতাভ বচ্চন, জয়া বচ্চন, রাজ বাব্বর, শত্রুঘন সিনহা, তাপস পাল, দেবসবাই রাজনীতিতে যোগ দিয়ে এমপি হয়েছিলেন। জর্জ উইয়াহ, ইমরান খান, আজহারউদ্দীন, বাংলাদেশের মেজর হাফিজ প্রমুখ খেলোয়াড় রাজনীতিতে সফল হয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মুখ হিসেবে যারা মনোনয়ন কিনেছেন, তাদের স্বাগত জানাই। প্রায় দশ বছর পরে রাজনীতির আঙিনায় আগমন ঘটুক কিছু নতুন মুখের।

লেখক: রম্যলেখক

Previous articleরোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন # সমাধান খুঁজতে হবে মিয়ানমারেই
Next articleবাংলাদেশের চাই ‘৮ উইকেট’, জিম্বাবুয়ের ৩৬৭ রান