চুয়াডাঙ্গা আসন: ১ ও ২ আওয়ামী লীগে কোন্দল, বিএনপিতে বিভাজন

0
193


চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি : আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে বেশি তৎপর আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। অনেকটা আগেভাগেই নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছেন তারা। অন্যদিকে বিএনপি জেলা শহর থেকে শুরু করে তৃণমূলে হামলা মামলার কারণে আগাম প্রচারণায় নামছেন না।
চুয়াডাঙ্গা সদর ও আলমডাঙ্গা উপজেলা নিয়ে চুয়াডাঙ্গা-১ আসন। এই আসনে মোট ইউনিয়ন রয়েছে ২০টি। পৌরসভা রয়েছে ২টি। এই আসনে মোটর ভোটার ৪ লাখ ৩৭ হাজার ৭শ’ ৩০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ১৭ হাজার ২শ’৮৬ এবং নারী ভোটার ২ লাখ ২০ হাজার ৪শ’ ৪৪ জন।
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৬৯৩ ভোট পেয়ে প্রথমবারের মত নির্বাচিত হন মহাজোট প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী চারদলীয় জোট প্রার্থী অহিদুল ইসলাম বিশ্বাস পেয়েছিলেন ১ লাখ ৩৬ হাজার ৮৮৯ ভোট।
আসনটিতে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশিদের তালিকায় আওয়ামী লীগসহ মহাজোটের প্রার্থী আছেন ৭ জন। এরমধ্যে- চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন, জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আসাদুল হক বিশ্বাস, কেন্দ্রীয় যুব লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও জেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান শামসুল আবেদীন খোকন, জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক প্রফেসর ডা. মাহবুব হোসেন মেহেদী।
এছাড়াও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন তুলেছেন চুয়াডাঙ্গার মেয়ে (গাজীপুর ৩০৯) এর মহিলা এমপি শিরিন নাঈম পুনম এবং ব্যবসায়ি নেতা এফবিসিসিআই পরিচালক ও বাংলাদেশ জুয়েলারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ডায়মন্ড ওর্য়াল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
বিএনপি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশির তালিকায় আছেন ৫জন। এরা হলেন- কেন্দ্রীয় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, জেলা বিএনপির আহবায়ক ও কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য অহিদুল ইসলাম বিশ্বাস, মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের সাবেক যুগ্ম সচিব ড. আব্দুস সবুর, বাংলাদেশ উয়ুথ ফোরামের উপদেষ্টা বিডিআর বিদ্রোহে বেঁচে যাওয়া সাবেক সেনা কর্মকর্তা লেঃ কর্ণেল (অবঃ) সৈয়দ কামরুজ্জামান, জেলা বিএনপি নেতা শরিফুজ্জামান শরিফ।
চুয়াডাঙ্গা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার এর সাথে সাবেক যুব লীগের আহবায়ক ওবায়দুর রহমান চৌধুরী জিপু সাথে দীর্ঘ দিনের সম্পর্কের অবনতির কারণে সক্রিয় জিপুর গ্রুপ। তারা এতটাই প্রভাব বিস্তার করছে যে, বিগত পৌর নির্বাচনে নৌকা প্রার্থী হুইপ সেলুন জোয়ার্দ্দারের সহোদর রিয়াজুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার ওবায়দুর রহমান চৌধুরী জিপুর নিকট বিপুল ভোটে পরাজিত হন। সেই থেকে চুয়াডাঙ্গাতে আওয়ামী লীগের বিরোধ তুঙ্গে।
বর্তমানে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে একদিকে নেতৃত্ব দিছে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জাতীয় সংসদের হুইপ সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন ও অপর দিকে নেতৃত্ব দিচ্ছে চুয়াডাঙ্গা পৌর মেয়র যুবলীগের সাবেক আহবায়ক ওবায়দুর রহমান চৌধুরী জিপু।
চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য জাতীয় সংসদের হুইপ সোলাইমান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন। দীর্ঘতিন যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি আওয়ামী লীগকে এক সুতোয় গেঁথে রাখলেও বর্তমান সময়ে এসে সেই পরিস্থিতিতে অনেকটা ভাটা পড়েছে। সেই হিসেবে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থীর দাবিদার এবার থাকছেন না এমনটাই বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
তবে বর্তমান সংসদ সদস্য জাতীয় সংসদের হুইপ সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন বলেন, আমার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ার এবং বিগত দুটি সংসদ নির্বাচনে চুয়াডাঙ্গা-১ আসন থেকে বিজয়ী হওয়ার পর চুয়াডাঙ্গাতে যে উন্নয়ন হয়েছে তা বিগত দিনে হয়নি।
আওয়ামী লীগের একটি মহল আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে তারা আওয়ামী তথা জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছে বলে আমি মনে করি। আমার রাজনৈতক ক্যারিয়ার ও চুয়াডাঙ্গার উন্নয়নের কথা বিবেচনা করে দলীয় সভানেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে পুনরাই এই আসনে মনোনয়ন দেবেন বলে আমি আশাবাদী।
এদিকে জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আসাদুল হক বিশ্বাস নতুন করে একাদশ সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন নিশ্চিত করতে ব্যাপক প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
তিনি দলীয় কোন্দলের কথা স্বীকার করে বলেন, আমি কোন গ্রুপে নই, কৃষক শ্রমিক জনতার জনপ্রিয়তা এবং আমি দীর্ঘ ১৯ বছর চুয়াডাঙ্গা-মেহেরপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সভাপতি ছিলাম। এরপর আমি বিগত দুটি উপজেলা নির্বাচনে
জনপ্রিয়তার কারণে ব্যাপক ভোটে জয়লাভ করেছি। এছাড়া বর্তমান সময়ে চুয়াডাঙ্গা আওয়ামী লীগের যে অবস্থান বা কোন্দল দানা বেঁধেছে তাতে কে মনোনয়ন পানে তা বলা অনিশ্চিত।
তাছাড়া আওয়ামী কেন্দ্রীয় ফোরাম থেকে আমাকে মাঠে কাজ করার জন্য বলেছেন, এলাকার জনগণও আমাকে চাচ্ছেন বলে আমি মনে করি সেই হিসেবে আমি কোন গ্রুপে নয় আমি আওয়ামী লীগ তথা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একজন হয়ে মনোনয়ন প্রত্যাশি এবং আশা করি দল আমাকেই মনোনয়ন দেবেন।
চুয়াডাঙ্গা জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও কেন্দ্রীয় যুব লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সামসুল আবেদীন খোকন বলেন, আমি গত নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছি এবারও চাইবো।
জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক প্রফেসর ডা. মাহবুব হোসেন মেহেদীও সকলের মত চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশি। তিনি তাঁর পেশাগত দক্ষতা দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন নির্বাচনী প্রচারণা। মাঝে মধ্যে তিনি চুয়াডাঙ্গা-১ আসন ভূক্ত যে কোন জায়গায় ফ্রী মেডিকেল ক্যাম্প করে অসহায় দরিদ্রদেরকে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবাসহ ওষুধও বিতরণ করছেন।
অপরদিকে জোর গুঞ্জন আছে হেবিওয়েট প্রার্থী হয়ে আসছে ব্যবসায়ী নেতা এফবিসিসিআই পরিচালক, বাংলাদেশ জুয়েলারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
জেলা আওয়ামী লীগের কোন্দলের সুযোগেই বর্তমান সংসদ সদস্যের পাশাপাশি মাঠে নেমেছেন সরকারি দলের প্রায় আধা ডজন নেতা। তবে সরকারি দলের প্রভাবশালী সংসদ সদস্য আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণায় না নামলেও তার পক্ষে বিগত দিনের নানা উন্নয়নের ফিরিস্তি তুলে ধরছেন তার কর্মী-সমর্থকরা।
অপরদিকে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা তৃণমূলে উন্নয়নসহ নানা ফিরিস্তি তুলে ধরে সাধারণ ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে নিজ দলের নেতাকর্মীদের নিজের পক্ষে ভেড়াতে চালিয়ে যাচ্ছেন নানা কার্যক্রম। বিশ্লেষকদের ধারণা আওয়ামী লীগের কোন্দল মেটাতে না পারলে দীর্ঘদিন বিএনপির দখলে থাকা আসনটি পূনরায় তাদের ঘরে চলে যাবে।
ওদিকে ভিন্ন চিত্র বিএনপির ক্ষেত্রে। অনেকটা হ-য-ব-র-ল ভাবে চলছে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম। নিজেদের মধ্যে কোন্দল উপদল ও গ্রুপিং-এর কারণে বিপর্যস্ত তারা। দলের কোন্দল মেটানোই তাদের জন্য অনেকটা বড় চ্যালেঞ্জ। বিগত ৮ বছরে বিএনপির সাংগঠনিক কোনো কার্যক্রম ঠিকমতো পরিচালিত না হওয়ারও অভিযোগ সাধারণ নেতাকর্মীদের। আর এ নিয়ে সাধারণ নেতাকর্মীদের ক্ষোভেরও অন্ত নেই।
৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরই চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির রাজনীতি চারটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। কেন্দ্রীয় নেতাদের কয়েক দফা উদ্যোগের পরও ৮ বছরে এর থেকে উত্তরণ ঘটেনি বৃহত এই দলটির। এর পাশাপাশি সরকারি দলের হামলা মামলা তো আছেই। আর এ কারণে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও এক সময়ের বিএনপির দুর্গ খ্যাত চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে বিএনপির কোনো প্রার্থীর মাঠ পর্যায়ে তেমন নির্বাচনী তৎপরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। তবে তাদের পক্ষে নির্বাচনী ব্যানার-ফেষ্টুন নির্বাচনী এলাকায় শোভা পাচ্ছে।
বিএনপিতে হঠাৎ নেতা হিসেবে আখ্যায়িত মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের সাবেক সচিব একাদশ নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশি ড. আব্দুস সবুর বলেন, আমি সাবেক প্রেসিডেন্ট শহীদ জিয়ার আদর্শকে বুকে লালায়িত করে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশি হিসেবে কর্মী সমর্থকদের মন জয় করার চেষ্টা করে যাচ্ছি।
এ ছাড়া তিনি বলেন, যদি মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচিত হতে পারি তাহলে নির্বাচনী এলাকার শিক্ষার গুনগত মান বৃদ্ধিসহ রাস্তাঘাট, অবকাঠামো নির্মাণ ও জেলাতে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করব।
জেলা বিএনপির আহবায়ক অহিদুল ইসলাম বিশ্বাস বিএনপির বিভাজন ও মনোনয়ন প্রত্যাশি হিসেবে বলেন, আমি চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপিকে এক কাতারে আনার চেষ্টা করেছি কিন্তু কেন্দ্রীয় বিএনপির বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু’র কারণে তা করতে পারে নি। তিনি আরো বলেন, তৃণমুল বিএনপি আমার সাথে আছে আর বিএনপির দুর্গ খ্যাত চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে আমার জনপ্রিয়তা সম্পর্কে দলীয় চেয়ারপার্সন অবগত আছেন, বিধায় তিনি আমাকেই মনোনয়ন দিবেন বলে আমি আশাবাদী।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদুর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তবে তার ভাই জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক এ্যাড. ওয়াহেদুজ্জামান বুলা বলেন, জেলা বিএনপি বলেন আর কেন্দ্রীয় বিএনপি বলেন আমার মতে যোগ্যনেতা বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু। আর চুয়াডাঙ্গা-১ আসন থেকে তিনিই মনোনয়ন পাবেন। তিনি বিগত দুটি নির্বাচনে এ আসন থেকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন।
বিএনপির অপর আহবায়ক যুগ্ম আহবায়ক মজিবুল হক মজু বলেন দলীয় যে বিভাজন দীর্ঘদিন ধরে বিরাজ করছে তা মেটাতে না পারলে ধানের শীষ প্রতীকের পরাজয় নিশ্চিত। তিনি আরো বলেন, দলের বিভাজন জেলা পর্যায় থেকে মেটানো কোন ভাবেই সম্ভব নয়, যত গ্রুপে সম্ভব কেন্দ্র থেকে তা মেটানো প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।
চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে জাতীয় পার্টির এ্যাড. সোহরাব হোসেন, জাসদের এম সবেদ আলী মনোনয়ন তুলেছেন।
চুয়াডাঙ্গা-২
আওয়ামী লীগে সাত, বিএনপিতে দুই
বড় নির্বাচনের ক্ষেত্রে আগেভাগেই মাঠ গরম হয়। চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের ক্ষেত্রে উত্তাপ একটু বেশিই মনে হচ্ছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা একটু বেশিই নড়াচড়া করছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রতিনিয়ত ছুটছেন। এক্ষেত্রে এগিয়ে আছেন আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা।
নির্বাচনের পেছনের হিসেব অনুযায়ী আসনটি বেশিরভাগ সময় বিএনপি কিংবা বিএনপি জামায়াত জোটের হাতে থেকেছে। বড় সব নির্বাচনে এই আসনে জামায়াতকে ফ্যাক্টর হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াত এই তিনটি দলই তাদের দলীয় প্রার্থীকে জিতিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে গণসংযোগে ব্যস্ত। এই আসনে অতীত নির্বাচনগুলোতে জাতীয় পার্টির অবস্থান থেকেছে চতুর্থ নম্বরে।
জীবননগর ও দামুড়হুদা উপজেলা এবং চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার তিতুদহ, গড়াইটুপি ও বেগমপুর ইউনিয়ন নিয়ে চুয়াডাঙ্গা-২ আসন। জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গা-০২ নির্বাচতী এলাকায় ভোটার চার লাখ পাঁচ হাজার ৬৫৩। এর মধ্যে পুরুষ দুই লাখ তিন হাজার ৫৪৩ ও মহিলা দুই লাখ দুই হাজার ১১০।
এই আসন থেকে অতীতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থী জয়লাভ করার রেকর্ড আছে। ফলে, এই আসন থেকে কোন দলের প্রার্থী নির্বাচিত হবেন তা আগেভাগে বলে দেওয়া খুব সহজ কাজ নয়। বোধহয় এ জন্যই সব দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা আশায় বুধ বেধে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। মনোনয়ন পাওয়ার আগেই সম্ভাব্য প্রার্থীরা যেভাবে তৎপর তাতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হচ্ছে যে, এই আসনের ভোটযুদ্ধ হবে দেখার মতো।
এই আসনে আওয়ামী লীগের ৭ জন ও বিএনপির ২ জন প্রার্থী মাঠে তৎপর। জামায়াতের প্রার্থীর নাম ঘোষণা হয়ে গেছে আগেই। তিনি হলেন, জেলা জামায়াতের সেক্রেটারী রুহুল আমিন। পরপর দুইবার আওয়ামী লীগের হাতে থাকা জাতীয় সংসদের ৮০ নম্বর আসনটি আগামি নির্বাচনের মাধ্যমে তৃতীয় বারের মতো আওয়ামী লীগ নিজের হাতে রাখতে চাচ্ছে। আসনটি একসময় বিএনপির হাতে ছিল। সঙ্গত কারণেই তারাও স্বপ্ন দেখছে আসনটিকে তাদের দখলে নেবার। জামায়াতের দাবি, এই আসনটি আসলে তাদের। একসময় তাদের দলীয় নেতা এই আসনে জয়লাভ করেছেন। আবারও তারা জিতে আসবে বলে স্বপ্ন দেখছে।
আওয়ামী লীগ: আওয়ামী লীগ থেকে সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় আছেন জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও এই আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য হাজী আলী আজগার টগর, জেলা আ. লীগের সাধারণ সম্পাদক আজাদুল ইসলাম আজাদ, কেন্দ্রীয় যুবলীগের সহ-সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক আমার সংবাদ পত্রিকার সম্পাদক হাশেম রেজা, দামুড়হুদা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান মঞ্জু, চুয়াডাঙ্গা জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি নজরুল মল্লিক, দর্শনা পৌরসভার বর্তমান মেয়র ও দর্শনা পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মতিয়ার রহমান, বঙ্গবন্ধু শিশু-কিশোর মঞ্চের কেন্দ্রীয় নেতা সাদেকুর রহমান বকুল।
আলী আজগার টগর ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচিত হন। জাতীয় নির্বাচনে প্রথম ভোটযুদ্ধে এসেই তিনি বিজয়ের মুকুট পড়েন। ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি বিজয়ী হন। আসন্ন নির্বাচনে তিনি দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী। মনোনয়ন পেলে বিজয়ী হওয়ারও আশাবাদী তিনি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বড় দলে একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশি থাকবেন এটাই স্বাভাবিক। দলীয় কোন্দলের কারণে মনোনয়ন প্রত্যাশির সংখ্যা বেশি তা ঠিক নয়।
জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজাদুল ইসলাম আজাদ চুয়াডাঙ্গা-২ আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন পেতে আগ্রহী। তিনি হাইকমান্ডের কাছে নিজের জন্য মনোনয়ন চাইবেন। তবে, তিনি এখনো জোরেসোরে প্রচারণা শুরু করেননি।
তিনি বলেন, অনেকেই আমাকে ফোন করে, দেখা করে ভালভাবে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর জন্য বলছেন। আমার টাকা-পয়সা নেই। আস্তে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছি। দল মনোনয়ন দিলে দলীয় নেতাকর্মিদের সাথে নিয়ে জোরেসেরে প্রচারণায় নামব।
জেলা আওয়ামীলীগের সেক্রেটারি আজাদুল ইসলাম বলেন, আমি মনোনয়ন পত্র তুলেছি। দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয় তাহলে সবাই আমার সাথে থাকবে আশা করি।
কেন্দ্রীয় যুবলীগের সহ সম্পাদক হাশেম রেজা ব্যবসায়ী ও সাংবাদিক। তিনি দৈনিক আমার সংবাদ পত্রিকার সম্পাদক-প্রকাশক। চুয়াডাঙ্গা জেলার দুটি আসনে তিনিই একমাত্র সাংবাদিক যিনি মনোনয়নের জন্য মাঠে তৎপর।
তিনি বলেন, আমার রাজনীতি করার মূল উদ্দেশ্য হল মানুষের সেবা করা। মানুষের সেবা করতে না পারলে আমার রাজনীতি করার দরকার নেই। আমি আমার সাধ্যমত মানুষকে সহযোগিতা করছি। এলাকার ও এলাকার মানুষের উন্নয়নের চিন্তা-ভাবনা মনে ধারণ করে আমি সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হতে চেয়েছি। আমি চাই, দেশের উন্নয়নের স্বার্থে আবারও জননেত্রী শেখ হাসিনার নৌকা প্রতীকে ভোট দেবেন দেশের জনগণ। তিনি বলেন, দলীয় মনোনয়ন পেলে ইনশাল্লাহ ভোটাররা আমাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবেন। দামুড়হুদা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান মঞ্জু গণসংযোগ করছেন নিয়মিত। তিনি আওয়ামী লীগের হাই কমান্ডের কাছে নিজের জন্য দলীয় মনোনয়ন চাইবেন। মাহফুজুর রহমান মঞ্জুর অনুসারিরা মনে করেন, টানা ২ বছর জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান থাকাকালে তিনি মানুষের কাছাকাছি থেকেছেন। উন্নয়নমূলক কাজও হয়েছে জেলা পরিষদ থেকে। এছাড়াও তিনি বরাবরই সেবামূলক ও উন্নয়নমূলক কাজের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন। পেছনের এইসব ভাল পদক্ষেপ বিফলে যাবে না বলে মনে করেন তার অনুসারিরা।
তিনি জানান, মানুষের ভালবাসা পাচ্ছি, ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি, মনের জোর বেড়ে গেছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে তিনি শতভাগ আশাবাদী। একজন সংসদ সদস্য অনেক কাজ করতে পারেন। সেই সুযোগ আমি কাজে লাগাতে চাই। জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি নজরুল মল্লিক গণসংযোগ করছেন। তিনি দলের হাইকমান্ডের কাছে মনোনয়ন চাইছেন। দর্শনা পৌরসভার বর্তমান মেয়র মতিয়ার রহমান মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী। মতিয়ার রহমান জানান, সংসদীয় এলাকার মানুষ আমার পাশে আছেন।
বিএনপি: ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত চুয়াডাঙ্গা-২ নির্বাচনী এলাকায় শক্ত হাতে হাল ধরে রেখেছিলেন জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি হাজি মোজাম্মেল হক। এমপি নির্বাচিতও হয়েছিলেন তিনবার। গত ৪ সেপ্টেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। ফলে, চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে নতুন মুখ ছাড়া বিএনপির কোনো উপায় নেই। এই আসনে এখনো পর্যন্ত মাত্র দুইজন সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন তুলেছেন।
বিএনপির যে দুজন সম্ভাব্য প্রার্থী গণসংযোগে আছেন তারা হলেন, কেন্দ্রীয় বিএনপির উপ-কোষাধ্যক্ষ ও জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক মাহমুদ হাসান খান বাবু ও জেলা বিএনপির সদস্য মখলেছুর রহমান তরফদার টিপু। এই দু নেতার মধ্যে দলের সিংহভাগ নেতাকর্মি আছেন মাহমুদ হাসান খান বাবুর পক্ষে। আরেক সম্ভাব্য প্রার্থী মখলেছুর রহমান তরফদার টিপু বলেন, আমি মনোনয়ন চেয়েছি।
দীর্ঘদিন দলের জন্য এবং এলাকার জন্য কাজ করছি। দর্শনার সন্তান হিসেবে আমি আমার নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন চাই। এই উন্নয়নে আমি ভূমিকা রাখতে চাই। দলীয় মনোনয়ন পাবো বলে আমি আশাবাদী। বিএনপির ধানের শীষে ভোট দেওয়ার জন্য সাধারণ শান্তিপ্রিয় ভোটাররা অপেক্ষায় আছেন। দলীয় মনোনয়ন পেলে বিজয়ের ব্যাপারেও আমি আশাবাদী।
জামায়াত: জামায়াতের প্রয়াত নেতা মাওলানা হাবিবুর রহমান এই আসনে ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেন। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। ওইসময় তিনি জামায়াতের নেতা হলেও রাজনীতির চেয়ে ধর্মীয় সভা-সমাবেশে তাকে বেশি বক্তব্য দিতে দেখা গেছে। ধর্মীয় সভায় বক্তব্য দিতে দিতে মানুষের কাছে তিনি সুবক্তা হিসেবে জনপ্রিয়তা পান। সেই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি জামায়াতের প্রার্থী হন এবং জয়লাভ করেন। এখনকার জামায়াত নেতাদের দাবি, সেই উত্তাপ আজো আছে। আজো বিপুল সংখ্যক মানুষ জামায়াতের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার অপেক্ষায় আছে। এই আসনে জামায়াত ইতোমধ্যেই তাদের প্রার্থী চুড়ান্ত করেছে। জেলা জামায়াতের সেক্রেটারী রুহুল আমিন এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী।
চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে আওয়ামী লীগে রয়েছে তীব্র কোন্দল। বিএনপিতেও কোন্দল আছে। আওয়ামী লীগ থেকে ৭ জন প্রার্থী ইতিমধ্যেই মনোনয়ন তুলেছেন। মনোনয়নের জন্য লবিংও করছেন। বিএনপির মাত্র দুজন আর জামায়াতের একজন করে প্রার্থী নির্বাচনী এলাকায় তৎপর। এ ছাড়াও স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন ১ জন।