আইনের যথাযথ প্রয়োগ চাই ঋণখেলাপিদের প্রার্থিতা

158

১৯৭২ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) ঋণখেলাপি ও বিলখেলাপিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা ছিল, তা সেই সময়ে যতটা না প্রয়োজনীয় ছিল, এখন তার চেয়ে অনেক বেশি জরুরি। এ কারণে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-এর অনেক কিছু সংশোধন করা হলেও সংশ্লিষ্ট ধারা কেউ বাতিল করতে পারেনি। কিন্তু ঋণখেলাপি ও বিলখেলাপিরা নানা কারসাজি করে আইনটি পুরোপুরি অকেজো করতে পদে পদে বাধা সৃষ্টি করে চলেছেন।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর এই মহলটি ফের তৎপর হয়ে উঠেছে। আইনানুযায়ী কেউ নির্বাচনে প্রার্থী হতে চাইলে তাঁকে ব্যাংকঋণ নিয়মিতকরণ করতে হবে, যার শর্ত হলো মোট ঋণের অন্তত ১০ শতাংশ শোধ করা। ১৯৭২ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে বলা হয়েছিল, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার অন্তত সাত দিন আগে ঋণ পুনঃ তফসিল করতে হবে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন সেটি সংশোধন করে ঋণখেলাপিদের কিছুটা ছাড় দিয়েছে। প্রার্থীর ব্যক্তিগত ঋণ ও বিলের ক্ষেত্রে সাত দিনের সময়সীমা ঠিক রাখলেও প্রতিষ্ঠানের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার আগের দিন পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়েছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে রাঘববোয়াল ঋণখেলাপিদের প্রায় সবাই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিয়েছেন।
আইনগত এই ছাড় সত্ত্বেও খেলাপি ঋণগ্রহীতারা ঋণ পরিশোধ না করে ঋণ আদালতে মামলা ঠুকে নির্বাচনী বৈতরণি পার হয়ে যান। অন্য সময় এ নিয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের সুযোগ থাকলেও তফসিল ঘোষণার পর সেটি থাকে না। ঋণপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অসহায়। যে উদ্দেশ্যে এই আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, তা-ই ভেস্তে যায়। পত্রিকার খবর থেকে জানা যায়, তফসিল ঘোষণার পর অনেক ঋণখেলাপি মনোনয়ন পাওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ ও বিএনপি অফিসে ধরনা দিচ্ছেন, অনেকে মনোনয়ন ফরম কিনেছেন ও জমা দিয়েছেন। এরপরই নিশ্চয় তাঁরা নিজ নিজ পছন্দের দল থেকে মনোনয়ন বাগিয়ে নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইবেন।
বাংলাদেশের যেকোনো নাগরিকের অধিকার আছে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার। কিন্তু সেটি কোনোভাবেই ১৯৭২ সালের আরপিওকে অগ্রাহ্য করে নয়। নির্বাচন কমিশন গণপ্রতিনিধিত্ব আইন সংশোধন না করলে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার আগেই হয়তো ঋণখেলাপিরা ঋণ পুনঃ তফসিল করতেন। এরপর তাঁরা মনোনয়ন না পেলেও ঋণের একাংশ শোধ হতো। এখন ওই ঋণখেলাপিরা শেষ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। একটা কথা বলা হয়, রাজনীতি এখন ব্যবসায়ীরা নিয়ন্ত্রণ করছেন। আইনের সংশোধনী দেখে এ কথা মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে তাঁদের হাত নির্বাচন কমিশন পর্যন্ত পৌঁছেছে।
আমাদের উদ্বেগের কারণ হলো তফসিল ঘোষণার পর যাঁরা বিভিন্ন দলের মনোনয়ন পাওয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপ করছেন, তাঁদের মধ্যে হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণগ্রহীতা থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদে প্রকাশিত শীর্ষ ১০০ খেলাপির তালিকারও কেউ কেউ আছেন। তাঁরা পুনঃ তফসিলের নামে খেলাপি ঋণের একুদশমাংশ জমা দিলেও পরবর্তীকালে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে যে ব্যাংকগুলো থেকে আরও অনেক বেশি ঋণ হাতিয়ে নেবেন, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
দুর্ভাগ্য, নির্বাচনী ইশতেহারে সব দলই আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার গালভরা বুলি আওড়ালেও নির্বাচিত হওয়ার পর রাজনৈতিক দল সেটি বেমালুম ভুলে যায়। এই ভুলে যাওয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতি যত দিন থাকবে, ঋণখেলাপিদের হাতে দেশের অর্থনীতি ও জনগণ তত দিন জিম্মি থাকবে।
এসব হতাশা ও তিক্ত অভিজ্ঞতার পরও আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, কোনো খেলাপি ঋণগ্রহীতা যাতে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে প্রার্থী হতে না পারেন, সে বিষয়ে কমিশন সজাগ দৃষ্টি রাখবে। বিলখেলাপিদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

Previous articleফের ভাইরাল শাহরুখ-কন্যা সুহানার ছবি
Next articleডিজিটাল বাংলাদেশে অ্যানালগ রাজনীতি!