আওয়ামী লীগের আসল প্রতিপক্ষ কারা ?

176


প্রভাষ আমিন
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল বিএনপি অংশ না নেওয়ায় আওয়ামী লীগের কোনও শক্ত প্রতিপক্ষ ছিল না। আওয়ামী লীগ আর জাতীয় পার্টি মিলে দুধভাত নির্বাচনে জিতে পাঁচ বছর আরামে দেশ চালিয়েছে। কিন্তু ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর পাল্টে গেছে দৃশ্যপট। মাঠে এখন হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে মহাজোটের সঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের। আসলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির।
বারো বছর ক্ষমতার বাইরে থাকায় বিএনপি অনেকটাই এলোমেলো ছিল। তার ওপর সরকারের ‘নির্যাতন’, মামলা-হামলা, ধরপাকড়ে বিএনপি রাস্তায় নামতেই পারতো না। এছাড়া বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দুর্নীতির দুই মামলায় দ- নিয়ে কারাগারে, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও কারাদ- নিয়ে লন্ডনে পালিয়ে আছেন। সব মিলিয়ে বিএনপি খাদের কিনারে দাঁড়িয়েছিল। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে নির্বাচনকেই তারা বেছে নেয় চূড়ান্ত আন্দোলন হিসেবে। আর এই এক ঘোষণায়ই দেশজুড়ে দারুণ জোয়ার আসে যেন। ৩০০ আসনের জন্য ৪ হাজার ৫৮০ জনের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেই দলের নেতারা বুঝিয়ে দিয়েছেন, নির্বাচনের জন্য তারা কতটা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। নয়াপল্টনের সামনে উজ্জীবিত কর্মীদের ঢলও প্রমাণ করেছে, বিএনপি এখনও ফুরিয়ে যায়নি। বিএনপির আরেকটা বড় শক্তি হলো-ঐক্য। দশ বছর অনেক চেষ্টা করেও সরকার বিএনপিতে ভাঙন ধরাতে পারেনি। বরং নির্বাচনকে সামনে রেখে নিষ্ক্রিয় সংস্কারপন্থীদের ডেকে নিয়েছে বিএনপি। আওয়ামী লীগের আপত্তির পরও লন্ডন থেকে তারেক রহমান মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। তাতে তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে বলেছেন। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া বিএনপিকে অবশ্য অস্তিত্বের স্বার্থেই ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। সব মিলিয়ে বিএনপিকে এখন দারুণ চাঙা দেখাচ্ছে।
এরপরও আমার বিবেচনায় আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি নয়। আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ আসলে আওয়ামী লীগই। ৩০০ আসনের জন্য ৪ হাজার ২৩ জন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। সংখ্যাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিএনপি এরচেয়ে বেশি ফরম বিক্রি করেছে। মনোনয়ন পাবেন না জেনেও কিনেছেন অনেকে। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা হলো-প্রায় প্রতিটি নির্বাচনি এলাকায় সরকারি দলে প্রবল অন্তর্দ্বন্দ্ব আছে। বড় দলে অন্তর্দ্বন্দ্ব থাকবে, নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে; এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আওয়ামী লীগের অন্তর্দ্বন্দ্ব এখন আত্মঘাতী পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এই অন্তর্দ্বন্দ্বের প্রাণঘাতী বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। আগামী নির্বাচনে তা আরও ভয়ঙ্কর হতে পারে। গত ১০ বছর ক্ষমতায় থাকায় আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্যরা এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছেন। তাদের অনেকে জনবিচ্ছিন্ন তো বটেই, দলবিচ্ছিন্নও হয়ে পড়েছেন। নিজেদের একটা বলয় তৈরি করে নিয়েছেন এমপিদের অনেকেই। সেই বলয়ে ঢুকতে পারেন না দলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা। তাই বিএনপি ক্ষমতায় যেতে যতটা মরিয়া, আওয়ামী লীগের বঞ্চিত নেতাকর্মীরা ততটাই মরিয়া এমপির বলয় ভাঙতে। আমি এমন অনেক আওয়ামী লীগ নেতাকে চিনি, যারা শেখ হাসিনা বললে ট্রাকের সামনে ঝাঁপ দেবে, কিন্তু নিজ এলাকার আওয়ামী লীগের এমপিকে হারানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। অনেকের মনোভাব এমন, শেখ হাসিনা আবার প্রধানমন্ত্রী হোক, সম্ভব হলে ২৯৯ আসনে আওয়ামী লীগ জিতুক; কিন্তু তার আসনে নয়। অনেক আসনেই আওয়ামী লীগের এমন আত্মঘাতী নেতা আছেন। সবাই যদি নিজেকে চালাক ভেবে দুধের বদলে পানি নিয়ে আসেন, তাহলে কিন্তু রাজার দুধের পুকুর গড়ার স্বপ্ন পানির পুকুরের দুঃস্বপ্নে বদলে যেতে পারে।
শেখ হাসিনা মনোনয়নপ্রত্যাশীদের ডেকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে বলেছেন। বিদ্রোহ করলে চিরতরে বহিষ্কারের কথা বলেছেন। কিন্তু সেই হুমকিতে খুব একটা ভীত বলে মনে হচ্ছে না আওয়ামী লীগ নেতাদের। তারা জানেন, নির্বাচন এলেই এ ধরনের হুমকি দেওয়া হয়। বিদ্রোহ করে জিতে আসতে পারলে দল ঠিকই জায়গা দেবে। অতীতে এমন অনেক উদাহরণ আছে। কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হেরেছিলেন দলীয় অন্তর্কোদলে। কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনেই ঘটেছে সবকিছু। কিন্তু কারও বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এমপিদের অনেকেই যে জনবিচ্ছিন্ন, দলবিচ্ছিন্ন, কর্মীবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন; তা যে শীর্ষ নেতারা জানেন না, তা নয়। দেশি-বিদেশি নানা সংস্থার জরিপে এমন অন্তত ১০০ এমপিকে চিহ্নিতও করা হয়েছিল। মাস দুয়েক আগে শোনা যাচ্ছিল, ১০০ জনের মধ্যে অন্তত ৩০ জনকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। বাকি ৭০ জন এবার মনোনয়ন পাবেন না। কিন্তু চূড়ান্ত মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় পাল্টে গেছে সবই। তৃণমূলের মত বা জরিপ কিছুই কাজে লাগছে না। শোনা যাচ্ছে, বড় জোর ২৫ জন এমপি মনোনয়নবঞ্চিত হতে পারেন। তাও অসুস্থতা বা খুনের মামলা বা মাদক বিক্রির মতো চূড়ান্ত অভিযোগের কারণে। একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করাকে বা জনবিচ্ছিন্ন থাকাকে কোনও অপরাধ হিসেবেই গণ্য করা হচ্ছে না। মাদক বিক্রির অভিযোগে আবদুর রহমান বদির বদলে মনোনয়ন পাচ্ছেন তার স্ত্রী, খুনের মামলায় কারাগারে থাকা আমানুর রহমান খান রানার আসনে মনোনয়ন পাচ্ছেন তার বাবা। তার মানে, যেই লাউ, সেই কদু।
মনোনয়ন না পেলে প্রত্যাশীরা চারটি কাজ করতে পারেন-স্বতন্ত্র নির্বাচন করা, এলাকায় থেকে দলের প্রার্থীর বিপক্ষে কাজ করা, নিষ্ক্রিয় থাকা এবং দলের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করা। চারটি নম্বর কাজটি কেউই করবেন না, অন্তত মন থেকে। নিষ্ক্রিয় রাখতে পারলেও লাভ। কিন্তু মনোনয়নবঞ্চিতরা কোনোভাবেই মন থেকে দলের প্রার্থীর জয় চাইবেন না। কারণ তিনি জানেন, এবার প্রতিপক্ষের প্রার্থী জিতে গেলে, তার নিজের ভবিষ্যৎও অন্ধকার। বরং তাকে হারাতে পারলে ভবিষ্যতে মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হবে। এই সমস্যা দল কীভাবে সামলাবে তার ওপরই নির্ভর করছে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা। ২০০১ সালের নির্বাচনে দলীয় কোন্দলের কারণে ৩৮ আসনে হেরেছিল আওয়ামী লীগ, যা তাদের ক্ষমতা থেকে ছিটকে ফেলেছিল। সেই ইতিহাস নিশ্চয়ই ভুলে যাননি দলটির শীর্ষ নেতারা।
আওয়ামী লীগের আরেক প্রতিপক্ষ-আত্মতুষ্টি। মাঠে কার্যকর বিরোধী দল না থাকায় এই আত্মতুষ্টি ভর করেছে তাদের মনে। তারা জনগণের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি। ভেবেছেন, শেখ হাসিনা কোনও না কোনোভাবে তাদের জিতিয়ে দেবেন। শেখ হাসিনা যতই বলেন, এবার নির্বাচন কঠিন হবে। জনগণের ভোটেই জিততে হবে। নেতাদের কানে তা ঢুকছে বলে মনে হয় না। বিএনপি নির্বাচনে আসায় কিছুটা নড়েচড়ে বসেছেন বটে, কিন্তু এখনও তাদের পুরোপুরি হুঁশ হয়নি। গত কয়েকদিনে আওয়ামী লীগ-বিএনপির বেশ কয়েকজন মনোনয়নপ্রত্যাশীর সঙ্গে কথা হয়েছে। বিএনপি যতটা মরিয়া, আওয়ামী লীগ ততটাই নির্ভার। তাই বিএনপির সঙ্গে চূড়ান্ত লড়াইয়ে নামার আগে আওয়ামী লীগকে আত্মতুষ্টিতে ভুগতে থাকা নেতাদের বাস্তবতার জমিনে নামিয়ে আনতে হবে, অন্তর্কোন্দল মেটাতে হবে ওয়ান টু ওয়ান ভিত্তিতে। তারপরে হবে মহাজোট বনাম ঐক্যফ্রন্ট, তথা আওয়ামী লীগ-বিএনপির জোর লড়াই।

লেখক : হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

Previous article৬টি আসনের সব কেন্দ্রে ইভিএমে ভোট
Next articleঘূর্ণি বলের উৎসবে বাংলাদেশের হাসি