জনপ্রিয় নেতা বনাম যোগ্য নেতা

413

চিররঞ্জন সরকার
আমাদের দেশে বিভিন্ন এলাকায় অনেক ‘জনপ্রিয়’ নেতা আছেন। এই ‘জনপ্রিয়তা’র নানা কারণ আছে। কেউ কেউ আছেন, চুরি-চামারি করলেও এলাকাবাসীর সঙ্গে থাকেন। নিয়মিত দেখা-সাক্ষাৎ করেন। কেউ বা আবার এলাকার টাউট-বাটপার-গু-া-বদমাশগুলোকে হাতে রাখেন। নিয়মিত খরচা করেন। এলাকার মানুষ এটা জানেন বলে তার প্রতি এক ধরনের সমর্থন ব্যক্ত করেন। প্রশংসা না করলে যদি তার লোকেরা ঠ্যাঙানি দেয়! আবার এমন কিছু নেতা আছেন যারা (লোক দেখানো হলেও) গরিবের কিছু উপকার করেন। গু-া-বদমাশগুলোকে প্রকাশ্যে ধমক-ধামক দেন। মালপানি কামালেও একটু রেখেঢেকে তা করেন। কর্মীদের মনোরঞ্জন করে চলার চেষ্টা করেন। এতেও তিনি জনপ্রিয় তকমা পান। কিন্তু এলাকার একজন জনপ্রিয় নেতা যে সত্যিকার অর্থেই সৎ এবং ভালো মানুষ, জনকল্যাণে কাজ করেন, টাকার লোভ নেই-এমনটা আমাদের দেশে একেবারেই বিরল।
এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কেমন নেতা চাই? তিনি কি জনবান্ধব হবেন, কর্মীবান্ধব, নাকি দলবান্ধব হবেন? কর্মীবান্ধব নেতা বলতে মানুষ বুঝে থাকে, যে নেতা-কর্মীর তদ্বিরে সাড়া দেন, তার আপদে-বিপদে যিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন। এতে নিয়ম-নীতি ভাঙল কি মচকালো তাতে কিছু যায় আসে না। তর্কের খাতিরে ‘তদ্বির’কে আমরা যদি ইতিবাচক অর্থেও ধরে নিই তাহলে আমাদের জানা দরকার দেশের বড় দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে কর্মীর সংখ্যা কতো হতে পারে?
আমরা যদি আওয়ামী লীগকেই ‘স্যাম্পল’ হিসেবে নিই, তাহলে দেখব, সারা দেশে চার হাজার ৫৫৪টি ইউনিয়ন আছে। প্রত্যেক ইউনিয়নে আবার ৯টি ওয়ার্ড। আওয়ামী লীগের নেতারা দাবি করেন, তাদের দলের ওয়ার্ড কমিটিও সক্রিয় আছে। আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে বলা হয়েছে, ওয়ার্ড কমিটি হবে ৫৫ সদস্যবিশিষ্ট। এখন প্রত্যেক ইউনিয়নে যদি কম করে হলেও আওয়ামী লীগের ১০০ জন সক্রিয় কর্মী আছে বলে ধরে নিই, তাহলে একজন জেলা নেতার পক্ষে কি কয়েক হাজার কর্মীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখা সম্ভব? তার মানে একজন নেতা চাইলেই কর্মীবান্ধব হতে পারেন না।
জনবান্ধব হওয়া তো আরও কঠিন। তারা যেটা পারেন এবং করেন সেটা হলো দলবান্ধব হওয়া। এতে খুব বেশি কষ্ট নেই। কর্মীদের দেন দলের দোহাই, আর দলকে দেন কর্মীদের দোহাই। এভাবে উভয় স্থান থেকে বিচ্যুত হয়ে সে কেবল নিজের আখের নিয়েই ব্যস্ত থাকতে পারেন। কিন্তু এমন নেতা দিয়ে কি আমাদের সমাজকে এগিয়ে নেয়া যাবে? রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ভেঙ্গে ফেলা সম্ভব হবে?
মনে রাখা দরকার যে, রাজনীতির সঙ্গে ‘নীতি’ কথাটা যুক্ত আছে। নীতি হলো কিছু আদর্শ নিয়ম-কানুন। অতীতে আমরা দেখেছি যারা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন, তারা নীতি-নৈতিকতার চর্চা করেছেন। রাজনীতিবিদদের মানুষ শ্রদ্ধা করত। তাদের কথায় জীবন উৎসর্গ করতেও দ্বিধা বোধ করত না। রাজনীতি ছিল এক সময় দেশ ও মানুষের সেবা করার সবচেয়ে উত্তম পন্থা। যারা রাজনীতির খাতায় নাম লেখাতেন তারা আত্মস্বার্থ কখনো বিবেচনায় রাখতেন না। দেশ-জাতি, মানুষের কল্যাণই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। তারা জাতির কল্যাণ সাধনায় ব্রতী হয়ে নিজেদের দিকে তাকানোর সময় পেতেন না। জনগণের স্বার্থকে সবার উপরে স্থান দিয়ে সত্য ও ন্যায়ের পথে এগিয়ে চলতেন সব ধরনের ভয়-ভীতি, লোভ-লালসাকে উপেক্ষা করে। আর এখন?
দেশ-জাতি এসব শব্দ আজকের রাজনৈতিক নেতাদের ক’জনের মস্তিষ্কে বাসা বাঁধতে পেরেছে তা গবেষণার বিষয় হতে পারে। উপর থেকে শুরু করে নিচ পর্যন্ত-সবখানে একই ধারা চলছে বছরের পর বছর ধরে। দলগুলো ব্যস্ত রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে রাখতে, কিংবা দখল করতে। আর নিচু পর্যায়ে ‘নেতারা’ ব্যস্ত হাতের কাছে যা পাওয়া যায় তার সবটা উদরস্থ করে ফুলে-ফেঁপে পাটখড়ি থেকে হাতি হতে। আর যারা রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে, তারা অপেক্ষায় থাকে কবে সে সোনার হরিণ ধরা দেবে, যা তাদের ভাগ্য খুলে দেবে। এ জন্য তাদের ছল-বল-কৌশল প্রয়োগের কোনো শেষ নেই।
রাজনীতির সঙ্গে নেতা ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। নেতা ছাড়া রাজনীতি কল্পনাই করা যায় নায়। যাদের হাত ধরে নীতি প্রণয়ন হয়, প্রতিষ্ঠিত হয়, নীতির প্রচার-ও প্রসার হয়, তাদের মধ্যেই আজ নীতি-নৈতিকতা নির্বাসিত-প্রায়। আজকে রাজনীতির মাঠে নীতিহীন নেতার সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।
ম্যাকিয়াভেলি তার ‘প্রিন্স’গ্রন্থে বলেছিলেন, রাজাকে মিথ্যা বলতেই হবে, তাকে অভিনয় করে হলেও দেখাতে হবে যে তিনি প্রজাবৎসল। প্রজাদের শোকে তিনি মুহ্যমান, এই ধারণা রাজাকে জনপ্রিয় করবে। অর্থাৎ রাজাকে জনপ্রিয় হতে হবে। রাজা বা রাজনীতিক-এর এই জনপ্রিয় হওয়ার ধারা এখনও চলছে। যদিও ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপটে চাণক্য রাজনীতি সম্পর্কে ভিন্ন কথা বলেছিলেন। তিনি নৈতিকতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন অনেক বেশি। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, রাজাকে সৎ হতে হবে। অসত্য অন্যায়ের মাধ্যমে রাজধর্ম পালন হবে না। রাজা শক্তিশালী হবে না।
কিন্তু আমরা বর্তমানে যে সব নেতা দেখছি, তাদের অনেকেই জনপ্রিয় নেতা হচ্ছেন বটে, কিন্তু সেই অর্থে ভালো বা যোগ্য নেতা হচ্ছেন কি? সততা, বুদ্ধি, প্রকাশের ক্ষমতা, বিচারক্ষমতা, প্রশ্ন করার মন, মতামত বা নানান মতামত সংগ্রহের ইচ্ছা, তথ্য সংগ্রহের ক্ষমতা, ভালো স্মৃতিশক্তি, সাহস, দূরদর্শিতা, সীমাহীন উৎসাহ এবং চিন্তাভাবনায় কট্টর না হয়েও আধুনিক ও নমনীয় হওয়া— এ সবই কি ভালো নেতা হওয়ার গুণ নয়? আজকাল বার বার মনে হয়, দক্ষ, সৎ, শক্তিশালী ও সুযোগ্য নেতা সম্পর্কে আমাদের মনে যে ধারণা তৈরি হয়েছে যা বাস্তব থেকে অনেকটাই দূরে।
আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তাবিদগণ বলছেন, নেতার গ্ল্যামার, ক্যারিসমা, জনপ্রিয় জনমোহিনী শক্তি, যাই হোক না কেন আসলে নেতৃত্ব শক্তিশালী হতে পারে একমাত্র যৌথ নেতৃত্বের মাধ্যমেই। অন্যের মতো ধারণ করা, সকলের কল্যাণে ভূমিকা পালন করা। আমরা তেমন নেতাকে নির্বাচন করছি কি?
নির্বাচনে বিপুল ভাবে জিতলেই এক জন নেতা বা নেত্রী মনে করেন যে, তিনি যোগ্য, সফল এবং শক্তিশালী নেতা। কিন্তু সেটা এক মস্ত বড় ভুল। জয়লাভ করা মানেই কিন্তু ভালো নেতা হওয়া নয়। হিটলারও তার জাতীয়তাবাদী সমাজতন্ত্রী দলের পক্ষে পেয়েছিলেন এক বিপুল জনসমর্থন। জনপ্রিয় হওয়া আর যোগ্য হওয়া তাই এক কথা নয় মোটেই।
জনপ্রিয় হওয়ার মোহে ধর্মান্ধদের আস্ফালনেও আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব অনেক সময় বোবা-কালা হয়ে থাকেন। তাদের সঙ্গে সন্ধি-আঁতাতের পথ খোঁজেন। সমাজ থেকে প্রগতিশীলতা হারিয়ে যাচ্ছে, ধর্মমত সেখানে বড় হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতিতেও আমাদের শিক্ষিত নেতাদের অনেকেই চুপ। যেন কিছুই ঘটেনি। কিছুই ঘটছে না। কারণ তারা ভয় পান। ভোট হারানোর ভয়। ভাবে, ধর্মীয় গুরুদের আলখাল্লায় বাঁধা আছে লাখো লাখো ভোট মেনে নাও, অতএব, তাদের সব আবদার, গুন্ডামি, হুমকি এবং খবরদারি।
আর সুশীল সমাজ? অধুনা যাদের ডাকা হচ্ছে বিদ্বজ্জন বলে! তারাও কি ‘পলিটিকালি কারেক্ট’ থাকার সুগভীর মৌনতার নীতিতে রয়েছেন আত্মগোপনে, নির্বাসনে? চরাচর জুড়ে কেন এত শিল্পিত শীতলতা? স্পষ্টবাকের কেন এত ভয়? কীসের-ই বা এই ভয়? ওদের তো আর ভোটের ভয় থাকার কথা নয়, তা হলে? তাদের ভয়, ক্ষমতার রোষে পড়ার, পুরস্কৃত না হওয়ার, কালো তালিকাভুক্ত হয়ে প্রসাদ থেকে বঞ্চিত হওয়ার। ভয়, দলীয় পৃষ্ঠপোষকতাহীন একঘরে হয়ে যাওয়ার। জোর গলায় নির্ভয়ে ন্যায্য কথা বলতে পারার মতো সর্বজনমান্য মানুষের আজ বেজায় অভাব। তথাকথিত বিদ্বজ্জনদেরও ক্রমাগত পাদপ্রদীপে থেকে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন দলীয় মদত বা বড় কোনও মিডিয়া-হাউজের আশীর্বাদ। রাষ্ট্র কী বলবে, দল কী ভাববে, গণমাধ্যম কী ভাবে নেবে, জনগণমনোমত হবে কি না— এত সব প্রখর চাতুর্যের সঙ্গে বিচার-বিবেচনা করে তবে মুখ খুলবেন তারা। আর যদি হাওয়ার গতি ঠিকঠাক বোঝা না যায়, নেহাতই মূক।
একমাত্র গণজাগরণ মঞ্চের উদাহরণ বাদ দিলে নতুন প্রজন্মকেও বড় বেশি আলোকিত বা সোচ্চার মনে হয় না। তারাও যেন বড়ই উদাসীন। জগৎ-সংসারের কিছুতেই কিছু এসে যায় না। নিছক ব্যক্তিগত উচ্চাকাক্সক্ষা পূরণলক্ষ্যে মগ্ন, পাশের বাড়ির অগ্নিকা-েও প্রবল নিস্পৃহ। কেন? বিশ্বায়নের রঙিন লোভ, না কি রাজনৈতিক হয়ে পড়ার ভয়? সর্বময় এক বিশ্বাসহীনতা, না কি দীর্ঘ রাজনীতি-শাসনের নিষ্ক্রিয়তার বদভ্যাসজনিত সুপ্রোথিত উদ্যমহীনতা? না কি এই সব কিছুই একসঙ্গে খেলা করে যায়, এই দেশের নতুন প্রজন্মের রক্তের ভেতরে?
রাজনীতির কারবারিরা ভোট গোছাতে ব্যস্ত, বিদ্বজ্জন গুছিয়ে যান আখের। এ সব দেখেশুনে তবে আঠারো-পঁচিশ-পঁয়ত্রিশও তাদেরই অনুকরণ করবে? এই সুবিধাবাদিতার বিরুদ্ধে নবীন যৌবন কি আরও এক বার, উনিশ শ একাত্তরের মতো, বোতাম ছেঁড়া শার্ট গায়ে গর্জে উঠবে না?
লেখক : কলামিস্ট।

Previous articleবুড়িগঙ্গায় মনোনয়নপ্রার্থীর লাশ # দোষারোপের খেলা নয়, খুনের বিচার
Next articleআলোচনার শীর্ষে থেকেও মনোনয়নে পিছিয়ে তারকারা