হাসিনার অভিব্যক্তিতে ‘ভেসে উঠল আটপৌরে মায়ের মুখ’

317

কল্যাণ ডেস্ক : ‘লেটস টক’-এর সৌজন্যে সিলেট থেকে ঢাকা এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন ফয়সাল খলিলুর রহমান; কাছ থেকে দেখা এবং শৈশব থেকে জীবনের প্রতিটি বাঁকের গল্প তার মুখ থেকে শোনার পর এই তরুণের মনে হয়েছে, রাজনীতিতে সফলতার স্বাক্ষর রাখা এই নারীর জীবন ও বোধ বিস্ময় জাগানিয়া।
গত শুক্রবার ওই সাক্ষাতের পর ফয়সাল ফেইসবুকে এক পোস্টে পুরো অনুষ্ঠানের বয়ান ও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন; যেখানে বঙ্গবন্ধুকন্যার শৈশব, কৈশোর, পাকিস্তানি শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর তারুণ্য, মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বন্দি দশা, পঁচাত্তরে বিদেশ যাওয়া, বাবা-মাসহ পরিবারের সবাইকে হারানো, নির্বাসিত জীবন, রাজনীতিতে আসা এবং তার পরের সংগ্রাম ও দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়গুলো উঠে এসেছে।
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক ফয়সালের মুগ্ধতা প্রকাশিত হয়েছে অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার আগমনের বিবরণেই।
তিনি লিখেছেন, “হল রুমটাকে আরো আলোকিত করে ভোরের নরম আলোর মতো প্রশান্তির হাসি হেসে আসলেন শেখ হাসিনা। তার কাঁচা পাকা চুলের সাথে ম্যাচিং করেই যেন শাড়িটার রঙ। ঝলমল করে উঠলো পুরো সেট।”

রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি খালাকে সেটে বসিয়ে নিজে সবার পেছনে চলে যান জানিয়ে ফয়সাল লিখেছেন, “শেখ হাসিনা চোখ উঠিয়ে কেমন যেন আহলাদি হয়ে উঠলেন। নুজহাত আপা যখন জিজ্ঞেস করলেন, কেমন আছেন? এতো মায়া নিয়ে তিনি উত্তরটা দিলেন, ‘আর কেমন থাকি বলো, বৃদ্ধ বয়সে আমার উপর এতো অত্যাচার!’
“আমার আটপৌরে অভিমানী মায়ের মুখটা ভেসে উঠলো। বাংলার সব মায়েরা এভাবেই কথা বলে।”
এরপর উপস্থিত তরুণ-তরুণীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে তিনি লিখেছেন, “তোমরা আমার নাতি-নাতনির মতো। তোমরা হইলা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ।”
অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ডা. নুজহাত চৌধুরীর সঙ্গে ফয়সাল খলিলুর রহমান অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ডা. নুজহাত চৌধুরীর সঙ্গে ফয়সাল খলিলুর রহমান কেমন ছিলেন কিশোরী শেখ হাসিনা-দর্শক সারি থেকে এই প্রশ্ন পেয়ে তিনি যেন খুকিদের মতোই খিল খিল করে হেসে ওঠেন বলে জানিয়েছেন ফয়সাল।
“ছোট বেলায় তিনি নাকি জাল দিয়ে মাছ ধরতেন, খালে ঝাঁপ দিয়ে গোসল করতেন। কি থ্রিলিং শৈশব! বাবা জেলে থাকতেন। তাই দাদা-দাদি খুব আদর করতেন খুকিটাকে। তারপর ’৫৪ সালে তারা টুঙ্গিপাড়া থেকে ঢাকা চলে আসেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠান বা সভা থাকলে তিনি স্কুল পালাতেন। গাধা পিটিয়ে মানুষ বানানো কড়া হেড স্যার তাকে খুব আদর করতেন।
“একবার ক্লাস সেভেনে ঢাকার বটতলায় কোন একটি প্রোগ্রামে যেতে হবে। তো শেখ হাসিনা ও তার বন্ধুরা মিলে স্কুল পালানোর প্ল্যান করলেন। একজনকে ঠিক করলেন হেডস্যারের পাশের রুমে রাখা ঘণ্টাটা চুরি করতে। যেইনা ঘণ্টায় টিং টিং আওয়াজ হলো ছুটির আগেই হাসিনাসহ স্কুলের সবাই দৌঁড়ে পালালো।”
এরপর প্রধানমন্ত্রীর কণ্ঠে শোনা তার তারুণ্যের কথাও নিজের ভাষায় বর্ণনা করেছেন তরুণ ফয়সাল।
“রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম তার, সুতরাং ঘর থেকেই রাজনীতি শিখে শিখে বড় হচ্ছিলেন। পাকিস্তানিরা বাংলার উপর উর্দু চাপিয়ে দিয়েছিল। এক সময় নাকি আরবি হরফে বাংলা, পরে রোমান হরফে বাংলা লেখার প্রেশার দেওয়া হচ্ছিল। বাঙালি ছাত্রসমাজ কখনোই তা মেনে নেয়নি। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের পর ’৭১-এর আগ পর্যন্ত পুরো দেশ সংগ্রাম চেতনায় গরম থাকত। আজ এই মিটিং তো কাল ঐ মিছিল। শেখ হাসিনা তখন থেকেই ছাত্রলীগ করতেন।
“…তিনি তখন ইডেন ইন্টার মিডিয়েট কলেজে পড়তেন। পলাশীর মোড় হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে রাজনীতি করতেন। একবার গ-গোল বেঁধে গেল। মুড়ির টিনের মতো বাসগুলোতে করে পুলিশ শেখ হাসিনাকে ধাওয়া করল এবং ধরে ফেলল, ‘এই মেয়ে সাহস তো কম না? মিছিল মিটিং করো, জেলে ঢুকিয়ে দেবো কিন্তু।’ শেখ হাসিনাও কম যান না, ‘আরে দিননা, জেলের ভয় দেখাবেন না। জেলে গিয়ে আমাদের অভ্যাস আছে।’”
১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ছয় দফা দেওয়ার পর কলেজ সংসদের প্রতিনিধি নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন শেখ হাসিনা। তবে তাতে বাধ সাধছিলেন মা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব।


“তিনি হাসিনাকে শক্ত করে বললেন, ‘নির্বাচন থেকে সরে আয়। তোর আব্বা ৬ দফা দিয়েছে। হেরে গেলে মনে করবে মানুষ বোধ হয় ৬ দফা চায় না।’ এদিকে হাসিনার বান্ধবীরা খুব করে ধরেছে, এ নির্বাচন থেকে সরে আসা যাবে না। আবার শাষক দল শেখ হাসিনাকে সামান্য কলেজের নির্বাচনে দাঁড়াতে দিচ্ছে না। তারাও মনে করছে, শেখ মুজিবরের মেয়ে জিতে যাওয়া মানে ৬ দফার প্রতি মানুষের সমর্থন। একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং কিন্তু মা ফজিলাতুন্নেসা ধমক দিলেন, ‘চুপ করে বাসায় বসে থাক। পলিটিক্স করার দরকার নেই।’”
মায়ের কথার প্রতিবাদ করার সাহস ছিল না তরুণী শেখ হাসিনার। তিনি খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেন। এ সময় গোপালগঞ্জ থেকে দাদা আসেন ঢাকায়।
“দাদার কাছে ভেউ ভেউ করে কেঁদে হাসিনা বাইরে যাবার আবদার করলেন। শ্বশুরকে বেশ সম্মান করতেন বেগম মুজিব। শ্বশুরের কথায় তিনি মেয়েকে ছাড়লেন, ‘কি আর করবি, যা ইলেকশন করে আয়।’ এ রকম প্রচন্ড প্রেশারের মধ্যে শেখ হাসিনা নির্বাচনে দাঁড়ালেন। উনার প্রতিদ্বন্দী দুই প্রার্থীর মোট ভোটের চেয়ে বেশি ভোট পেয়ে যোগ্য বাবার যোগ্য সন্তান পাশ করলেন।”
এক প্রশ্নের জবাবে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস ধানম-ির বাসায় মা ও ভাই-বোনদের সঙ্গে বন্দি দশার বিবরণও দিয়েছেন শেখ হাসিনা।
“আমি তখন প্রেগন্যান্ট। আমার পেটে আমার প্রথম সন্তান জয়। আব্বাকে পাকিস্তানে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় আর আমাদের একতলা একটা বাড়িতে বন্দী করে রাখে। আমার ভাই কামাল এক পাকিস্তানিকে বোকা বানিয়ে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। তখন আমাদের উপর অত্যাচার আরও বেড়ে যায়। মা ডালে চালে খিঁচুড়ি বানিয়ে রাখতেন। কিন্তু পেট ভরে কোনোদিন খেতে পারিনি। যার ক্ষিধা লাগত শুধু সে অল্প পরিমাণ খেতে পারত। জয়ের জন্মের সময় তাকে এক টুকরো নতুন কাপড় দিতে পারিনি। আমার এক বান্ধবীর বাচ্চার কাপড় ধার এনে তাকে পরিয়ে রাখতাম। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলেও আমাদের মুক্তি দেওয়া হয় ১৭ ডিসেম্বর। আমি আর মা বাসার ভেতর থেকে জয় বাংলা শ্লোগান দিতাম। কি যে কষ্টে দিনগুলো কাটিয়েছি!,” তাকে উদ্ধৃত করে লিখেছেন ফয়সাল।
এরপর ১৯৭৫ সালে স্বামী ওয়াজেদ মিয়ার জোরাজুরিতে পরিবার ছেড়ে তার জার্মানি যাওয়ার কাহিনীও শুনিয়েছেন শেখ হাসিনা। সেখানে বোন শেখ রেহানা নিয়ে অবস্থানের মধ্যেই ঢাকায় ঘটে যায় সেই ভয়াবহ ঘটনা। বাবা-মা, ভাই-বোনসহ পরিবারের সবাইকে হারান হাসিনা ও রেহানা।
এরপর এক তরুণী কাঁদো কাঁদো গলায় জিজ্ঞেস করেন, “তারপর কী হলো? দেশে আসলেন, দলের হাল ধরলেন কীভাবে? এতো শক্তি কোথায় পেলেন আপা? আপনার কি ভয় লাগে না?
“শেখ হাসিনার টলমল চোখ আবার জ্বলজ্বল করে উঠল। তার পরিবারের নারকীয় হত্যার পর দুই বোনকে আশ্রয় দেন সিলেটের কৃতি সন্তান ও বিখ্যাত রাজনীতিবিদ হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী। তারপর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সহযোগিতায় দিল্লিতে আশ্রয় নেন। পরিবারে আদুরে ও আলসে বড় মেয়ে, যে কখনো ঘরে কাজ করত না, তাকে তখন সংসারের হাল ধরতে হয়। তখনি প্রথম ঝাড়ু দেয়া শিখলেন তিনি। ১৯৮০ সালে তিনি গেলেন ইংল্যান্ড। বিদেশে ঘুরে ঘুরে নেতা কর্মী যোগাড় করলেন। অগোছালো আওয়ামী লীগকে শক্ত হাতে ধরলেন। ’৮১ সালে তিনি বাংলাদেশ ফিরলেন। ফেরার আগেই হুমকি পেলেন, দেশে আসলে গুলি করে মেরে ফেলব। বিমানবন্দরে আমরা ছুরি নিয়ে বসে আছি। এতো শক্তি কোথায় পেলেন হাসিনা? উনার কি ভয় লাগে না?,” বর্ণনায় নিজেও প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন ফয়সাল।

এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, “আমার তো হারানোর কিছু নাই। তবে মরার আগে আমি মরতে চাই না। আমি কখনো নিজেকে নেতা ভাবতাম না। এখনো আমি নিজেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একজন কর্মী ভাবি।”
প্রধানমন্ত্রী না হলে কী হতেন-এ প্রশ্নের উত্তরও শেখ হাসিনা দিয়েছেন জানিয়ে ফয়সাল লিখেছেন, “তিনি এবার হেসে দিলেন, অঙ্কে অতো ভালো ছিলাম না। খুব ইচ্ছা ছিলো ডাক্তার হব। পরে ভাবলাম আবার শিক্ষক হব। প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার। সারা দিন বাচ্চাদের নিয়ে পড়ে থাকতাম।”
প্রধানমন্ত্রী অবসর বলতে শুধু রাতে পাঁচ ঘণ্টা ঘুমানোর কথা জানিয়েছেন বলে জানান ফয়সাল।
“একটা মুহূর্তও আমি নষ্ট করতে চাই না। গতবার জেলে বসে বসে নির্বাচনী মেনুফেস্টো তৈরি করেছি,” শেখ হাসিনাকে উদ্ধৃত করে লিখেছেন তিনি।
তরুণদের আত্মবিশ্বাসী হওয়ার পরামর্শ দিয়ে এ প্রসঙ্গে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হারের পর দলীয় নেতাদের তার প্রতি আচরণের কথা তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।
“আওয়ামী লীগের কতিপয় সিনিয়র নেতা নাকি একবার তাকে ডেকে বলেন, তিনি কাজের বুয়াদের মতো দেশি তাঁতের শাড়ি পরেন বলে ভোট কম আসে। শেখ হাসিনা এ কথার প্রচ- প্রতিবাদ করেছিলেন। আজকের লেটস টক অনুষ্ঠানেও তিনি অফ হোয়াট রঙের দেশি শাড়ি পরে এসেছেন। কোনো রকম বিদেশি শিফন শাড়ি কিংবা কড়া মেকাপ ছাড়া একজন ভদ্রমহিলা কত সুন্দরী হতে পারেন তার উদাহরণ শেখ হাসিনা।
“তিনি আমাদের দিকে তাকিয়ে বলেন, বাইরের ব্র্যান্ডের কাপড় চোপড় পরে জৌলুস দেখানো অতো পছন্দ করি না। এগুলো অসুস্থ প্রতিযোগিতা। বাংলাদেশকেই আমি ব্র্যান্ড বানাব।”
চাকরির বয়সসীমা বাড়ানোর দাবি নিয়েও প্রধানমন্ত্রী তার অবস্থান প্রকাশ করেছেন বলে জানিয়েছেন ফয়সাল।
“তিনি ছোট করে বলে দিলেন, আগে সেশনজট ছিল, এখন তো ২৩ বছরে ছাত্ররা গ্র্যাজুয়েট হয়ে যাচ্ছে। যারা চেষ্টা করছে তারা চাকরিও পেয়ে যাচ্ছে। যারা ৩৫ বছরে চাকরির চিন্তা করছো তারা ২৩ বছরের জুনিয়রের সাথে কীভাবে কমফোর্টলি চাকরি করবা একটু ভেবে দেইখ্যো।”
জঙ্গিবাদ দূর করার পর মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই চলছে বলে জানান শেখ হাসিনা।
“এরপর দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্টেপ নিব।”
অনুষ্ঠানের শেষে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয় ফয়সালের। মিনিট কয়েকের আলাপচারিতা নিয়ে ফয়সাল লিখেছেন, প্রধানমন্ত্রী সিলেটের কৃষি বিশ্ববিদ্যলয়কে ফুড প্রসেসিং ও মার্কেটিং নিয়ে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন।
শেষে তিনি লিখেছেন, “শেখ হাসিনার কথা খুব মনে থাকবে। শি ইজ অ্যান অ্যামেজিং লেডি!”

Previous articleসিইসি পরিবর্তনের দাবি কামাল হোসেনের
Next articleহুকুম যেন না নড়ে : হাকিমদের সিইসি