দুর্নীতির বিরুদ্ধে আলটিমেটাম ব্যবস্থার চূড়ায় নজর দিতে হবে আগে

183

 

নীতি থাকলে তবেই দুর্নীতির প্রসঙ্গ আসে। নীতি না থাকার অর্থ নীতিহীনতা। নীতিহীনতা প্রবৃত্তিতাড়িত জীবের বৈশিষ্ট্য; তারা অসভ্য, অসামাজিক ও বুনো। প্রকৃতিতে অবাধে বিচরণকারী প্রায় সব সত্তাই তথা জীবই ‘নীতিহীন’। কারণ তাদের মধ্যে সামাজিক বন্ধন থাকে না, থাকলেও তা আলগা। সামাজিক বন্ধনের মূলে থাকে ‘নীতি’, যা প্রয়োজনপ্রসূত। সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ জীবের প্রকৃষ্ট উদাহরণ মানুষ। যেহেতু মানুষ নীতির সুতায়, কর্তব্য-অকর্তব্যের কাঠামোতে বাঁধা, তাই তারা নীতিহীনতাকে ভালো চোখে দেখে না। নীতিবোধই সমাজের মূল চালিকা-শর্ত। এ বোধ যখন দূষণের শিকার হয় দুর্নীতির প্রসঙ্গ তখনই উত্থাপিত হয়। নীতিহীনতা ও দুর্নীতি বাহ্যত সমার্থক মনে হলেও দুটি ভিন্ন বিষয়।
সমাজবদ্ধ থাকার নীতিবোধই রাষ্ট্র গঠনের সময় আরো বিস্তৃত অর্থে ক্রিয়াশীল হয়েছে। এ বোধের মূল বিষয় সমষ্টির কল্যাণ ও সুরক্ষা। সংবিধান, আইন-কানুন, পরিচালনব্যবস্থা সবই এ বোধ থেকে নিঃসৃত। এসবের বিশদীকরণ, বিস্তৃতকরণ একেক রাষ্ট্র একেকভাবে হয়েছে। রাষ্ট্রের পরিচালকবর্গ বা সাধারণ সদস্য সবার জন্যই মূল বিষয়ে নিষ্ঠ থাকা কাম্য। পরিচালকবর্গের জন্য নিষ্ঠ থাকা অবশ্য কর্তব্য, যদিও বাস্তবে প্রায়ই ব্যত্যয় ঘটে। অর্থাৎ নীতিবোধ দূষণের শিকার হয়। ফলে সমাজ ও রাষ্ট্রে দুর্নীতির বিস্তার ঘটে। বাংলাদেশ এ প্রবণতার বাইরে নয়।
দুর্নীতির মাত্রা তারাই বেশি বাড়ায়, যাদের দূষণ সক্ষমতা বেশি। সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব, রাষ্ট্রীয় প্রশাসন এবং ব্যক্তির লোভ-লালসা দুর্নীতির অন্যতম প্রধান কারণ। এটা কোন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে, তা আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। ঘুষ না দিলে কাজ হয় না, রাজনীতির মাঠে নামার টিকিটও পাওয়া যায় না। সমাজ ও রাষ্ট্রে নতুন নতুন বাণিজ্য চালু হয়েছে; যেমন ঘুষ বাণিজ্য, ফি বাণিজ্য, মনোনয়ন বাণিজ্য প্রভৃতি। রাষ্ট্রের কর্তাদের, প্রশাসনের অধিপতিদের বেতন-ভাতা বাড়িয়েও দুর্নীতির গতি রোধ করা যাচ্ছে না। শুধু সমাজই দূষিত হচ্ছে না, উন্নয়নের গতিও অবদমিত হচ্ছে। এ রোগের সঠিক ও টেকসই নিরাময় দরকার। এর জন্য সবার আগে অধিপতিদের হাতে-পায়ে বেড়ি পরাতে হবে। তা না হলে উন্নয়ন সুষম হবে না, সমৃদ্ধি বেশির ভাগ মানুষের উপকারে আসবে না।
এ পরিপ্রেক্ষিতেই সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতির মূলোত্পাটন করার লক্ষ্যে সরকারের কঠোর অবস্থানের বার্তা প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছে দিতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারের এ অবস্থান দৃঢ় থাকলে সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণ অবশ্যই আশা করা যায়। এ জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দুর্নীতিমুক্ত হতে হবে সবার আগে। কারণ দুর্নীতিগ্রস্ত নেতৃত্ব যতই গর্জন করুক, দুর্নীতিবাজদের লাগাম পরানোর নৈতিক সক্ষমতা তাদের থাকে না। তারা শুদ্ধাচারী না হলে প্রশাসনের দুর্নীতিবাজদের শায়েস্তা করা সম্ভব হবে না। দেশের স্বার্থে এবং জন-আস্থা অর্জনের লক্ষ্যে দুর্নীতিবিরোধী ‘জিহাদ’ ঘোষণার আবশ্যকতা রয়েছে।

Previous articleদুর্নীতি-মাদক-সন্ত্রাস রোধে অনুশাসনমূলক বার্তা দেবেন শেখ হাসিনা
Next articleবাংলাদেশের মেয়ে, বাংলাদেশের নারী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here