বৃহস্পতিবার স্কুল পরিচ্ছন্ন করবে শিক্ষার্থীরাই

148

আমিরুল আলম খান
শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি ‘প্রতি বৃহস্পতিবার স্কুলে সাপ্তাহিক পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম’বিষয়ক নির্দেশনা দেওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসা মন্তব্যগুলোতে শিক্ষা ও কর্ম সম্পর্কে আমাদের সমাজের একশ্রেণির
মানুষের কুৎসিত দৃষ্টিভঙ্গির যে প্রকাশ ঘটেছে, তা এককথায় ভয়ংকর। দেশে শিক্ষার অর্থ দাঁড়িয়েছে স্রেফ সার্টিফিকেট অর্জন; জীবনে দক্ষতা অর্জন নয়, শ্রমের মর্যাদা নয়, মানবিকতার জাগরণ নয়।
আমাদের শিশুদের ঘাড়ে বইয়ের বোঝা, কোচিংয়ের তাড়না। বিদেশে শিশুরা শেখে কর্মদক্ষতা, বইয়ের বোঝা তাদের ঘাড়ে নেই বললেই হয়। প্রতিদিনের জীবন থেকে তারা আগামী দিনের জীবনের দক্ষতা রপ্ত করে, যা তাদের সারা জীবন কাজে লাগে। শেখে শ্রমের মর্যাদা, অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। নিজের কাজ নিজেই করতে হয়। চাকরবাকর সেখানে মেলে না। তাই রাজপুত্র বা ধনীর দুলাল, সবাইকে কাজ করতে শিখতে হয়। ব্রিটিশ রাজপুত্রকেও যেতে হয় যুদ্ধক্ষেত্রে, একজন সাধারণ সৈনিকের মতোই তাঁকে মোকাবিলা করতে হয় ময়দানের বাস্তবতা।
আমাদের ছোটবেলায় প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত বৃহস্পতিবার ছিল অনেক আনন্দের। সেদিন মাত্র দুটো পিরিয়ড হতো, তারপর নানা কাজে
লেগে যেতাম আমরা। শ্রেণিকক্ষ, স্কুলের মাঠ পরিষ্কার করা ছিল আমাদের নিয়মিত সাপ্তাহিক কাজের অংশ। তার আগে হতো কবিতা আবৃত্তি, গান, বিতর্ক, অভিনয় ইত্যাদি সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড ও খেলাধুলা। মাঠ ও শ্রেণিকক্ষ পরিচ্ছন্ন করতে একেকজনকে বড়জোর ২০ মিনিট শারীরিক পরিশ্রম করতে হতো। তাতে যে ক্যাম্পাস আমরা নিজেরা তৈরি করতাম, তা হয়ে উঠত একান্ত আপন। তাতে আমাদের বাবা-মা/অভিভাবক কোনো দিন আপত্তি করেননি; বরং খুশি হতেন। স্কুল ছিল জীবনে দক্ষতা অর্জনের শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান।
জাপানের শিক্ষার্থীরা নিজেদের স্কুল প্রাঙ্গণ নিজেরাই পরিষ্কার রাখে। অনেক স্কুলে আলাদা করে কোনো কর্মী নেই পরিষ্কারের কাজ করার জন্য। থাকেও যদি, তারা প্রধানত সেই কাজগুলোই করে, যেগুলো সাধারণত শিক্ষার্থীরা করতে সমর্থ নয়।
জাপানে এই ‘পরিচ্ছন্নতা অভিযান ঘণ্টা’ সরকারের পক্ষ থেকে বাধ্যতামূলক নয়, কিন্তু প্রায় প্রতিটি স্কুলই এটা তাদের সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছে। কিন্তু কেন? জাপানের শিক্ষকেরা বলেন, শিক্ষার্থীরা এটা তাদের সিলেবাসের অংশ হিসেবে করবে না। করবে তাদের দায়িত্ববোধ থেকে।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কর্মকান্ডের অংশ হিসেবে জাপানি শিক্ষার্থীরা ধুলো ঝাড়ামোছা, সিঁড়ি, দরজা, জানালা ও মেঝে পরিষ্কার করে। অতি অল্প বয়সী শিক্ষার্থীদের টয়লেট পরিষ্কারে অংশ নিতে হয় না। যে শিশু নিজের শিক্ষালয়কে সুন্দর রাখতে আনন্দ পায় না, সে বড় দুর্ভাগা! কথাটি এই নব্য ধনী বা তথাকথিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি কীভাবে বুঝবে?
খোঁজ নিলে দেখা যাবে, এরা কেউ হয়তো নদী দখল করে আছে, কেউ সরকারি বা অন্যের জমি। কেউ টেন্ডারবাজি করে, কেউ আদম পাচারে যুক্ত। কেউ ঘুষখোর, কেউ ব্যাংক লুটের সঙ্গে যুক্ত। এই রুচিহীন ও নিষ্কর্মার দলই শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ঘৃণা উগরে দিয়েছে।
গলদ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষাকাঠামোর গভীরে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা মনুষ্যত্বের জাগরণ ঘটায় না, বরং শিশুকে করে তোলে অহংকারী। ‘লেখাপড়া করে যে গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে’ বলে সেই ঔপনিবেশিক মানসিকতা তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিদ্যাসাগরের গোপাল সুশীল বালক, সে চায় সমাজে বজায় থাকুক ‘স্থিতাবস্থা’। সমাজবিপ্লবে তাদের ভয়ের কারণ আমরা বুঝি। কিন্তু বিদ্যাসাগরও চেয়েছিলেন পড়–য়ারা কঠোর পরিশ্রমী হবে, শিখবে শ্রমের মর্যাদা। নিজেও কঠোর পরিশ্রমী ছিলেন তিনি।
আমাদের নব্য বাঙালি শ্রেণির আপত্তি সেখানেই। মধ্যবিত্ত ক্ষমতার ভড়ং দেখাতে গ্রামীণ বা ছোট শহরের সামাজিক কাঠামোয় নিজেকে ভাবে মহাপরাক্রমশালী। তার ক্ষমতার দম্ভ আহত হয়, যখন সে শোনে তার মহা আদরের সন্তানকে স্কুলঘর, স্কুল প্রাঙ্গণ সাফসুতরো করার জন্য উপদেশ দেন স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রী। তারা ভেবে পায় না, তাদের আদরের ছেলেমেয়ে এই ‘নোংরা’ কাজ কেন করবে? এসব করবে সমাজের ‘নীচু
জাতের’ লোকেরা এবং তারা সরল সমীকরণ দাঁড় করায়, শিক্ষকেরা এ ব্যবস্থায় কাজে ফাঁকি দেওয়ার নতুন মওকা পাবেন!
একটি শিশু ছোটখাটো কাজ করতে অভ্যস্ত হবে, ছোটবেলা থেকেই সে শিখবে কোনো কাজে লজ্জা নেই, আছে তৃপ্তির গৌরব। সেটি হচ্ছে না বলেই আমাদের ডিগ্রিসর্বস্ব লেখাপড়া বছর বছর লাখ লাখ ‘বাবু’ তৈরি করছে, কিন্তু দক্ষ কর্মী তৈরি করছে না।
তাই প্রাথমিক স্তর থেকেই বইনির্ভর ‘বাবু’ তৈরি না করে কাজকে সম্মান করতে শেখা এবং সত্যিকারের কর্মী করে গড়ে তোলার দিকে নজর দিতে হবে। ভেঙে ফেলতে হবে শিক্ষার এই অচল কাঠামোকে।
লেখক : আমিরুল আলম খান যশোর শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান

Previous articleছাত্রলীগ সেক্রেটারির বাড়িতে বোমা তৈরির সরঞ্জাম
Next articleসাকিবেরময় ম্যাচে টাইগারদের ঐতিহাসিক জয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here