আলীনগরের কেচ্ছা

112

“লাক্সারি ট্র্যাপ”

কিউ জেড নাজু
এক ব্যাঙ্কার আত্মীয়কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “কেমন চলছে জীবন?”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেছিলেন: “টাকা তো অনেক কামাই, কিন্তু নিজের জীবনটা কোথায়? সকাল আটটা থেকে রাত আটটা অবধি খাটার পর আরাম করার অবসর কখন পাই?”
সভ্যতার উত্তরণের নামে জীবনটাকে কুরুক্ষেত্র বানানোর যে প্রক্রিয়া সেটা যে শুরু হয়েছিল সেই কৃষি বিপ্লবের সময় তা জানতে পারলাম “সেপিয়েন্সঃ এ ব্রিফ হিস্ট্রি অফ হিউম্যানকাইন্ড” পড়ার সময়।
এখানে একটা অধ্যায়ের নাম “লাক্সারি ট্র্যাপ”।জীবনকে আরেকটু সুন্দর করার জন্য, আরেকটু আরাম আয়েশে থাকার জন্য খাটুনি খানিকটা বাড়িয়ে দেয়া এবং এই বাড়েয়ে দেয়া খাটুনি থেকে কখনোই মুক্তি না পাওয়ার নামই লাক্সারি ট্র্যাপ।
আমাদের পূর্বপুরুষরা খাবার সংগ্রহ থেকে যখন খাবার চাষে মনোযোগ দিলেন, তারা ভেবেছিলেন এক জায়গায় থেকে অনেক খাবার উৎপাদন করা গেলে একটু নিশ্চিন্তে থাকা যাবে। বসে বসে আরাম আয়েশ করা যাবে। সেই লক্ষ্যে তারা সকাল সন্ধ্যা খাটলেন। ফসল এলো প্রচুর, কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ফসলহানির অনিশ্চয়তা থেকেই গেল আগের মতো। অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে আরো বেশী খাটুনি, যাতে উৎপাদন বাড়ে।
উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বছর বছর সন্তান জন্মদান, তাদের সেই কৃষিকাজে নিযুক্ত করা। এই বর্ধিত মুখ যে উদ্বৃত্ত খাবার খেয়ে ফেলছে, সেই হিসাবটা করতে ভুলে গিয়েছিলেন আমাদের পূর্বপুরুষেরা।
ফলে আগে বনে বাদাড়ে ঘুরে ফিরে সংগৃহীত খাবারে যাদের চলে যেত; আরাম, আয়েশ, অবসর মিলত অনেক, তারাই এখন খাটছেন সকাল-সন্ধ্যা। জমি চাষ, রোপন, আগাছা বাছাই, সেচ দেয়া, ফসল কাটা, ঝাড়াই বাছাই এসবই চলতে থাকল বছর জুড়ে। সেই প্রত্যাশিত আরাম আয়েশ, নিশ্চয়তা আর এল না।
আমাদের পেছনে এখন অসংখ্য মোটিভেশন। খাটো, পরিশ্রম কর, বেশি বেশি আয় কর, ওপরে ওঠো। আমাদের অবসর নেই কেন?আমাদের একটা ছোট্ট জীবনের জন্য সকাল আটটা থেকে রাত আটটা অবধি খাটতে হচ্ছে কেন?
আমাদের দাদুরা যতটা সময় অফিস করতেন, বাবারা করেছেন তার চেয়ে বেশি, আমরা খাটছি আরও বেশি, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম আরও বেশি খাটবে। আমরা আটকে গেছি লাক্সারি ট্র্যাপে।
সেই জেলে আর ব্যবসায়ীর গল্প আমরা হয়তো অনেকেই জানি। এক দ্বীপের এক জেলে নিজের নৌকায় করে সকালে সাগরে মাছ ধরে, কিছু নিজের জন্য রাখে, বাকীটা বিক্রি করে সংসার চালায়। দুপুরে ঘুমোয়, বিকেলে ছেলের সাথে সাগরসৈকতে খেলতে যায়। রাতে জোছনা বিলাস করে।
একদিন সেই দ্বীপে বেড়াতে আসা এক কোটিপতি ব্যবসায়ীর সাথে জেলের দেখা হল। সেই ব্যবসায়ী জেলেকে একটা *মোটিভেশনাল স্পিচ* দিয়ে দিল।
“তুমি আরও বেশি বেশি মাছ ধরছ না কেন?”
জেলে জিজ্ঞেস করে, “কেন, বেশি মাছ ধরে কী হবে?”
ব্যবসায়ী বলে, “তাতে করে তোমার আরও অনেক বেশী আয় হবে, আরও বড় জাল, আরও বড় নৌকা, আরও বেশী মাছ আরও বেশী আয়। বড় শহরে তোমার অফিস হবে, বড় ফ্ল্যাটে থাকবে। ছুটি কাটাতে যাবে কোনও এক দ্বীপে। মাছ ধরবে, ছেলের সাথে খেলবে, রাতে জোছনা বিলাস করবে।….”
জেলে উত্তর দিল, “আমি এখন তো সেটাই করছি। মাছ ধরছি, ছেলের সাথে খেলছি, রাতে জোছনা দেখছি।”
গল্পের সেই জেলে হয়তো লাক্সারি ট্র্যাপ থেকে বেরিয়ে এসেছিল। আমাদের বেরনোর পথ কই ? ? ?
লেখক : অল-ইন্ডিয়া ভ্রম্যমান প্রতিনিধি, দৈনিক কল্যাণ

LEAVE A REPLY