সোশ্যাল মিডিয়ার ঢোলকলমি পোকা

29

আমীন আল রশীদ
‘বাঙালি হুজুগে জাতি’ ‘প্রবাদটি নতুন নয়। যখন থেকে এই প্রবাদ চালু হয়েছে, তখন দেশে ফেসবুক বা অন্য কোনও সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না। আশির দশকের শেষদিকে ঢোলকলমি পোকার গুজব ছড়িয়ে সারা দেশে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, ঢোলকলমি নামের একটা গাছ খুব বিষাক্ত, যার পাতা হাতে ডললে বিষক্রিয়ায় মানুষ মারা যায়। পরে শোনা গেলো, গাছের পাতা নয়, ওই গাছে বসে একটা পোকা, যা মানুষের হাতে বসলে বা কামড়ালে মানুষের মৃত্যু হয়।
আবছা মনে করতে পারি, ঝালকাঠি শহরে আমাদের বাসায় ঢোকার পথের পশ্চিম পাশে বেড়া হিসেবে প্রচুর কলমিলতা ছিল এবং এই গুজব ছড়ানোর পরে সব কেটে ফেলা হয়। পরে জানা গিয়েছিল সেটি ছিল নিতান্তই গুজব এবং কথিত ওই পোকার আক্রমণে কারও মৃত্যু হয়নি। ওই সময় মানুষকে এই গুজব থেকে শেষমেশ বাঁচিয়েছিল গণমাধ্যমই। পত্রিকায় রিপোর্ট হয়েছিল এবং বিটিভিতে বিশেষজ্ঞরা হাজির হয়ে সেই পোকা হাতে নিয়ে দেখিয়েছেন, এটির স্পর্শে কিছুই হয় না। কিন্তু কারা কেন এই গুজব ছড়িয়েছিল, তা জানা যায়নি। এখন এই সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এরকম একটি গুজব আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বাছবিচার ছাড়াই তৎক্ষণাত তাতে বিশ্বাস করে অ্যাক্ট ও রিঅ্যাক্ট করা লোকের সংখ্যাও অনেক।
গত বছর নিরাপদ সড়কের দাবিতে গড়ে ওঠা কিশোর আন্দোলনের সময়েও এরকম একটি গুজব ছড়িয়েছিল, রাজধানীর ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ অফিসে কয়েকজনকে খুন ও ধর্ষণ করা হয়েছে। ফেসবুক লাইভে এসে এই গুজবের আগুনে ঘি ঢেলেছিলেন একজন মডেল। ফলে সেটি আরও বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে এবং ওই সময়ে অসংখ্য মানুষ গণমাধ্যমকর্মীদের ফোন করে জানতে চেয়েছেন আসলে কী ঘটছে? কেউ কেউ অভিযোগের সুরে বলেছেন, সাংবাদিকরা তথ্য গোপন করছেন। অর্থাৎ মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো গুজবকে বিশ্বাস করেই মূলধারার গণমাধ্যমকে অবিশ্বাস করছে। এখন প্রশ্ন হলো, মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো তথ্য (গুজব) বিশ্বাস করছে কেন? তারা কেন মূলধারার গণমাধ্যমে আস্থা রাখতে পারছে না? আস্থা রাখতে পারছে না বলেই কি তারা গুজবে কান দিচ্ছে?
সবশেষ সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব এলো লবণের সংকট এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে শত শত মানুষ দোকানে ভিড় করে লবণ কেনার জন্য। ফলে এখন এই প্রশ্নটি সামনে আনা দরকার, তা হলো কারা এ ধরনের গুজব ছড়ায় এবং তাদের উদ্দেশ্য কী?
গুজবের একটা রাজনৈতিক অর্থনীতি আছে; এটা অনেক সময়ই রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ধরা যাক, কোনও একটি বিষয়ে কোনও একটি রাজনৈতিক দল, এমনকি অনেক সময় সরকারও বিশেষ কোনও উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ছোট পরিসরে কোনও একটি কথা, মতামত, ধারণা বা তথ্য ছড়িয়ে দেয়। ওই প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকা লোকগুলো সেই তথ্য বা কথাটি প্রচারে ভূমিকা রাখেন। হতে পারে সোশ্যাল মিডিয়ায়, হতে পারে গণমাধ্যমে, হতে পারে মানুষের কানে কানে।
সম্প্রতি লবণ নিয়ে যে গুজবটি ছড়ানো হলো, ধরেই নেওয়া যায় এর পেছনে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর একটি সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য ছিল এই, মানুষ যখনই জানবে বাজারে লবণ পাওয়া যাচ্ছে না বা সংকট তৈরি হয়েছে, তখন তারা লবণ কিনে ভবিষ্যতের জন্য মজুত রাখার জন্য দোকানে হুমড়ি খেয়ে পড়বে। একজন লোক যদি দশ প্যাকেটও কেনেন, তাহলে ওই দোকানে আধা ঘণ্টা পরে গিয়ে আর কেউ লবণ পাবেন না। এভাবেই সংকট তৈরি হয়।
লবণের গুজব ছড়ানোর পরে শিক্ষিত-সচেতন বহু মানুষও এভাবে লবণ কিনে মজুত রাখার জন্য দোকানে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়েন এবং অনেকে ৫ থেকে ২০ প্যাকেট পর্যন্ত লবণ কিনেছেন। অথচ যে দোকানদাররা এক প্যাকেট লবণ ১০০ টাকায় বিক্রি করেছেন, ওই লবণের প্রকৃত মূল্য ৪০ টাকা। অর্থাৎ এক গুজবে প্রতি প্যাকেটে তিনি অতিরিক্ত মুনাফা করলেন ৬০ টাকা। এটি পাড়া মহল্লার খুচরা পর্যায়ের চিত্র। যারা হাজার হাজার বস্তার কারবার করেন, সংকটটা দীর্ঘায়িত হলে বা অন্তত দুদিনও যদি এই গুজব অব্যাহত থাকতো এবং মানুষ দোকানে গিয়ে এরকম ৪-৫ প্যাকেট লবণ কিনে আনতো, তাহলে দেখা গেলো বড় ব্যবসায়ীরাও এই কৃত্রিম সংকট পুঁজি করে মুহূর্তের মধ্যে কোটি কোটি টাকা বাজার থেকে তুলে নিতেন। ফলে দেখা যাচ্ছে, যখনই কোনও পণ্যের ঘাটতি বা সংকটের গুজব ওঠে, তাতে প্রথম চোটে লাভবান হন ব্যবসায়ীরাই। আর ফাঁকতালে পকেট কাটা যায় জনগণের। উপরন্তু বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। বাজার অস্থির হলে সমাজ ও রাষ্ট্রও অস্থির হয়। সরকার চাপে পড়ে। সুতরাং গুজব ছড়িয়ে বাজার অস্থির করার পেছনে অনেক সময় সরকারবিরোধী চক্রও কাজ করে।
সুতরাং গুজবের নিরীহ ভিকটিম হয় সাধারণ মানুষ। তাদের মধ্যে শিক্ষিত সচেতনরাও রয়েছেন, যারা কোনও তথ্য যাচাই-বাছাই না করেই, অন্যের কথায় বিশ্বাস করে বা কানকথা শুনেই চিলের পেছনে ছোটেন। এই ছোটার পেছনে তার অতীত অভিজ্ঞতা এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের বিদ্যমান পরিস্থিতিও অনেক সময় ভূমিকা রাখে। কোনও একটি সমাজে গুজব রটনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে কারণ সেই সমাজ ও রাষ্ট্রে অনেক আগে থেকেই এই চর্চাটি রয়েছে। শিক্ষিত ও সচেতন মানুষের যে অংশটিও গুজবে কান দিয়ে দোকানে গিয়ে ১০ প্যাকেট লবণ কিনে আনলেন, তার এই কাজের পেছনে এক ধরনের ভীতি ও শঙ্কা ভূমিকা রেখেছে। একই সময়ে চলমান পেঁয়াজের অভিজ্ঞতাটি এক্ষেত্রে জনমনে ক্রিয়াশীল ছিল। যে কারণে এক প্যাকেট লবণে একটি পরিবারেও এক মাস চলে যাওয়ার পরও মানুষ সেই পেঁয়াজের অভিজ্ঞতায় ১০ প্যাকেট লবণ কিনে আনে। এখানে মানুষের মনে প্রধানত কাজ করে সরকার ও রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর তার ভরসা ও আস্থাহীনতা।
তবে লবণের দাম বাড়ার গুজব সরকার যেভাবে প্রতিহত করেছে, বিভিন্ন স্থানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে অনেককে কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে এবং জরিমানা করা হয়েছে, গুজবে কান না দিতে মাইকিং করা হয়েছে, সেটি নিশ্চয়ই প্রশংসনীয়। এর অব্যবহিত আগে ছেলেধরা গুজবে নিরীহ মানুষ পিটিয়ে মেরে ফেলার ঘটনার সময়েও এভাবে মাইকিং করে এবং গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় বিশেষ বার্তা দেওয়া হয়েছিল। সেগুলোও কার্যকর হয়েছে। অর্থাৎ, গুজব প্রতিরোধের প্রধান অস্ত্র হচ্ছে তথ্য। যখন কেউ কোনও একটি খারাপ উদ্দেশ্য গুজব ছড়ায়, তৎক্ষণাত সেটির পাল্টা হিসেবে আরও কয়েকগুণ বেশি ও বিস্তৃত পরিসরে প্রচার করা দরকার। কিন্তু সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কি সব গুজবের বিষয়ে একইভাবে সক্রিয় হয়?
দেশে যখন সোশ্যাল মিডিয়া বা ফেসবুক ছিল না, তখনও গুজব ছড়িয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, এখন কিছু লোক ফেসবুককেই গুজব ছড়ানোর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। বিশেষ করে যেসব গ্রুপ ও ব্যক্তির হাজার হাজার ফলোয়ার রয়েছে, তারা কিছু একটা লিখলে বা ছবি দিলে সেটি মুহূর্তের মধ্যে বিশাল পরিসরে মানুষ জেনে যায়। ফলে সোশ্যাল মিডিয়ার এই যে শক্তি, তাকে অনেক সময় যেমন গুজবের মেশিন হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তেমনি গুজব প্রতিহতের হাতিয়ার হিসেবেও। এখানে মূল বিষয় ইনটেনশন বা নিয়ত। অর্থাৎ একই ছুরি দিয়ে একবার ফল কাটা হচ্ছে, আরেকবার মানুষের শরীর। অতীতের সঙ্গে বর্তমানে এই ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে গুজবের তফাৎ হলো এই, এখন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে সংঘবদ্ধভাবেই কোনও একটি বিষয়ে লাখ লাখ বা কোটি কোটি মানুষকে বিভ্রান্ত করা যায়। সেটি রাজনীতির মাঠে ভোটের খেলাই হোক অথবা নিত্যপণ্য। ফলে কোন ইস্যুতে সরকার কতটুকু অ্যাক্ট ও রিঅ্যাক্ট করবে, সেটি নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সঙ্গে তার স্বার্থ কতটুকু জড়িত তার ওপর।
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর

LEAVE A REPLY