ইজিবাইকের কঠিন সমাধান

129

দিনে দিনে রিকশার বিকল্প হিসেবে ইজিবাহক আমাদের গুরুত্বপূর্ণ যানবাহনে পরিণত হয়েছে। অথচ তিন চাকার এই যানটির আইনগত কোনো বৈধতাই নেই। এর চেয়ে অবাক ব্যাপার, একে যান্ত্রিক বা অযান্ত্রিক কোনো ফ্রেমেই আবদ্ধ করা যাচ্ছে না। মূলত বাংলাদেশ, ভারত ও চীনে জনপ্রিয় ও প্রচলিত এ যান কেবল রাজধানী ঢাকাতেই নয়, বরং পুরো দেশেই বলা যায় জালের মতো ছড়িয়ে আছে। দেশের প্রায় ১৫ লাখ ইজিবাইক ‘অবৈধ’ হওয়ায় একদিকে যেমন এর অর্থনৈতিক লাভালাভ থেকে সরকার বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে একে কেন্দ্র করে চলছে প্রায় ৯০ কোটি টাকার মাসিক চাঁদাবাজি। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ‘নিয়ন্ত্রণহীন ইজিবাইক’ শীর্ষক জাতীয় একটি দৈনিকের প্রধান শিরোনামে এ যানটির আরও নানাদিক উন্মোচিত হয়েছে। আমরা বিস্মিত, জনজীবনে অপরিহার্য হয়ে ওঠা একটি যান বছরের পর বছর ধরে সড়কে কী এক বিশৃঙ্খলভাবে চলছে! যার ন্যূনতম নিবন্ধন নেই, চালকের নেই লাইসেন্স, নেই প্রশিক্ষণও। ইজিবাইকে অপ্রাপ্ত বয়স্করাও বসছে চালকের আসনে। প্রতিবেদন বলছে, খোদ রাজধানীতেই চলছে প্রায় দুই লাখ ইজিবাইক।
ইজিবাইক এখনও কীভাবে চলছে, সে এক বিস্ময়। কার্যত ২০১১ সালের মে মাসে সরকার ইজিবাইক চলাচল ও আমদানি নিষিদ্ধ করে। সেখানে অবশ্য একটা ফাঁক থেকে যায়। সরকারি প্রজ্ঞাপনে যন্ত্রাংশ নিষিদ্ধ করা হয়নি বিধায় ইজিবাইকের যন্ত্রাংশ আমদানি অব্যাহত থাকে। এরপর এখানে গড়ে ওঠা সংযোজন শিল্পের মাধ্যমে তৈরি ইজিবাইকই এখন চলছে। সে সময় সরকার যখন এটি নিষিদ্ধ করে, তখন দেশে মাত্র আড়াই লাখের মতো ইজিবাইক চলত। তখন বলা হয়েছিল, পর্যায়ক্রমে এটি উঠিয়ে দেওয়া হবে। উল্টো আমরা দেখছি, পর্যায়ক্রমে ইজিবাইক আরও জেঁকে বসেছে। ইজিবাইকের ব্যাটারি চার্জের কারণে যেমন বিদ্যুৎ খরচ হয়, তেমনি এর ব্যাটারি পরিবেশেরও অনুকূল নয়। তার ওপর ইজিবাইকের কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে। নানাদিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ বিধায় ইজিবাইক নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। অথচ সেটিই আজ কীভাবে ছড়িয়ে পড়ল? আমরা দেখেছি, মূলত প্রভাবশালীদের দাপটেই ইজিবাইক চলছে। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে পুলিশ- সবাই ইজিবাইক চাঁদাবাজির সুবিধাভোগী।
গ্রামগঞ্জে আগে যত রিকশা দেখা যেত, এখন তা দেখা যায় না বললেই চলে। ইজিবাইকই সে জায়গা দখল করেছে। কারণ এটি একই সঙ্গে অর্থ ও সময় সাশ্রয়ী। আগের অনেক রিকশাচালকও এখন ইজিবাইক চালান। এতে আয়ও বেশি। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, একজন রিকশাচালক দৈনিক গড়ে সাড়ে চারশ’ টাকা আয় করেন। অথচ ইজিবাইক চালিয়ে আয় করেন ১২শ’ টাকার মতো। এমনকি এই ইজিবাইককে কেন্দ্র করে এখন প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। ফলে এ যানটির সংখ্যাও বাড়ছে। আমরা সহযোগী এক দৈনিকের প্রতিবেদনে দেখেছি, দেশে প্রতি মাসে প্রায় দুই হাজার নতুন ইজিবাইকের চাহিদা রয়েছে। ইজিবাইকের এ বিবর্তনে আমরা বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালকের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য মনে করি। তিনি বলেছেন, ‘এখন এর বৈধতা বা অবৈধতা নিয়ে বিতর্ক তোলার চেয়ে বরং এটি কীভাবে নিরাপদে চালানো যায়, সেটিই ভাবা উচিত।’ ইজিবাইক এখন ২২টি মহাসড়কে নিষিদ্ধ। এগুলো যেহেতু স্থানীয় পর্যায়ে বেশি চলছে। তাই এর নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপদে চলাচলের জন্য স্থানীয় প্রশাসনকেই উদ্যোগী হতে হবে। আমরা ইতোমধ্যে দেখেছি, খুলনায় ইজিবাইকের নিবন্ধনের কাজ শুরু হয়েছে। এভাবে সর্বত্রই ইজিবাইক নিবন্ধনের আওতায় আসুক। একই সঙ্গে ইজিবাইকের চালকের লাইসেন্সও বাধ্যতামূলক করা দরকার। তাতে একদিকে যেমন এগুলো চলাচলে শৃঙ্খলা আসবে, অন্যদিকে সরকারের রাজস্বও আসবে। তার চেয়ে বড় কথা, যেখানে মানুষের চলাচলের জন্য কোনো গণপরিবহন বা বাস-মিনিবাস নেই, এমনকি যাদের চলাচলে রিকশার বিকল্প হয়ে উঠেছে এই ইজিবাইক, তাদেরও উপকার হবে। কিন্তু কাজটি সহজ নয়, বরং কঠিন।

Previous articleযশোরের শীর্ষ সন্ত্রাসী ও অস্ত্র ব্যবসায়ী বিহারী শাকিলের অস্ত্র ভান্ডার অক্ষত!
Next articleআওয়ামী লীগের নেতৃত্বে নতুন মুখ আসছে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here