যুদ্ধাপরাধী কসাই কাদের যখন ‘শহীদ’

74

প্রভাষ আমিন
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে। ইতিমধ্যে নেতা পর্যায়ের অধিকাংশ যুদ্ধাপরাধীর বিচার হয়েছে, অনেকে ফাঁসির দন্ড পেয়েছে, তা কার্যকরও হয়েছে। এখনও অনেকের বিচার প্রক্রিয়া চলছে। শেখ হাসিনাকে আমি অনেক কারণে ধন্যবাদ জানাই। তবে সবচেয়ে বড় ধন্যবাদটা জানাই একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করায়। আর এটি তিনি করেছেন জনরায় নিয়েই।
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতিহারের প্রধান অঙ্গীকার ছিল, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। সেই অঙ্গীকারেই আওয়ামী লীগ বিশাল জনরায় পেয়েছিল। ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা সেই অঙ্গীকার ভুলে যাননি। ধন্যবাদ দেওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ, একসময় আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম। নব্বইয়ের দশকে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে জামায়াতে ইসলামীর আমীর বানানোর পর শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলনে মাঠে ছিলাম, পুলিশী নির্যাতনের শিকার হয়েছি। কিন্তু তখন বিএনপি সরকার বিচারের উদ্যোগ তো নেয়ইনি, উল্টো গোলাম আযমের বিচারের জন্য গঠিত গণআদালতের উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দিয়েছিল। স্বাধীন দেশে রাষ্ট্রদ্রহিতার মামলা মাথায় নিয়েই চলে যেতে হয়েছিল শহীদ জননীকে। শহীদ জননীর মৃত্যুর পর যুদ্ধাপরাধের বিচারের আন্দোলনে ভাটা পড়ে যায়। পরে দুই শীর্ষ রাজাকার মতিউর রহমান নিজামী আর আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মন্ত্রী হয়ে গেলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আশা আরো দূরে সরে যায়। কিন্তু শেখ হাসিনা দৃঢ় অঙ্গীকারে জাতি গ্লানিমুক্ত হয়েছে এবং হচ্ছে। একটা বিষয় প্রমাণিত হয়েছে, অপরাধ কখনো তামাদি হয় না এবং অপরাধ করলে শাস্তি পেতেই হয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে প্রথম ফাঁসি কার্যকর হয়েছিল জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার, যে একাত্তর সালে ‘কসাই কাদের’ নামে পরিচিত ছিল। কাদের মোল্লার রায় ও ফাঁসি নিয়ে তখন তুমুল আলোড়ন উঠেছিল। ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়েছিল। বেরুনোর সময় কাদের মোল্লা হাত তুলে ‘ভি’ চিহ্ন দেখিয়েছিল। যাবজ্জীবন কারাদন্ডের রায়েই ক্ষুব্ধ ছিল তরুণ প্রজন্ম, কাদের মোল্লার ‘ভি’ চিহ্ন সে ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালে। সেদিন বিকেলেই শাহবাগে সৃষ্টি হয় গোটা বিশ্বেরই এক নজিরবিহীন স্বতস্ফূর্ত গণ আন্দোলন- গণজাগরণ মঞ্চ। সেই মঞ্চের যৌক্তিক দাবির মুখে আইন পরিবর্তন হয়, আপিলে কাদের মোল্লার ফাঁসি হয় এবং ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর কসাই কাদের মোল্লার ফাঁসির দন্ড কার্যকর হয়। দন্ড কার্যকর হওয়া প্রথম যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লা।
মৃত্যুর আগে যেমন বিতর্কের ঝড় তুলেছিল কাদের মোল্লা, মৃত্যুর পরও তুলেছে। কাদের মোল্লা বিতর্ক প্রসঙ্গে একটা গল্প মনে পড়ে গেল। এক লোক গ্রামের সবাইকে খুব জ্বালাতো। মরার সময় সে গ্রামের সবাইকে ডেকে বললো, তোমাদের অনেক জ্বালিয়েছি। আমার মরার পর তোমরা আমার লাশ বাঁশে করে গ্রামের চৌমাথায় ঝুলিয়ে রেখো। এটাই আমার শাস্তি। তার মৃত্যুর পর গ্রামের লোকজন ভাবলো, একটা লোকের শেষ ইচ্ছা বলে কথা। তারা তার লাশ বাঁশে করে চৌমাথায় ঝুলিয়ে রাখলো। পরে পুলিশ এসে গ্রামের সবাইকে ধরে নিয়ে গেল। সেই লোক আসলে মরার পরও গ্রামের সবাইকে জ্বালিয়েছে। কাদের মোল্লাও মৃত্যুর ৬ বছর পরও দেশবাসীকে ভোগাচ্ছে। গত ১২ ডিসেম্বর কাদের মোলল্লার মৃত্যুর দিন। সেদিন জামায়াতে ইসলামীর মুখপাত্র দৈনিক সংগ্রাম তাদের প্রথম পাতায় তিন কলামে শিরোনাম করেছে ‘শহীদ আবদুল কাদের মোল্লার ৬ষ্ঠ শাহাদাত বার্ষিকী আজ’।
দৈনিক সংগ্রামের এই ঔ্যদ্ধত্যে আবার প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। অনেকেই দৈনিক সংগ্রামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা করার দাবি তুলেছেন। আমি নিজেও এই দাবি জানিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছি। আমি মনে করি দেশের সর্বোচ্চ আদালতে সর্বোচ্চ সাজা পাওয়া একজন যুদ্ধাপরাধীকে ‘শহীদ’ বলা অবশ্যই রাষ্ট্রদ্রোহিতা। যার বিরুদ্ধে একাত্তরে হত্যা-ধর্ষণের মত অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে, নির্মমতার জন্য একাত্তরে যাকে ‘কসাই’ বলা হতো; সেই কাদের মোল্লাকে ‘শহীদ’ বলা কোনোভাবেই স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষ মেনে নেবে না। বিজয়ের মাসে এই ঔদ্ধত্য কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। এবারের শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের নানা আয়োজনে, মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ এবং রায়েরবাজার বধ্যভূমিতেও সবাই রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে দৈনিক সংগ্রামের বিরুদ্ধে মামলা ও পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। বিজয়ের মাসে কাদের মোল্লার মত যুদ্ধাপরাধীকে ‘শহীদ’ বলাটা আসলে সকল দেশপ্রেমিক মানুষের হৃদয়ে আঘাত হেনেছে।
সংগ্রামের এই ভূমিকা অবশ্য আজ নতুন নয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাদীদের যে বিচার হচ্ছে, তার অনেক রায়েই সংগঠন হিসেবে জামায়াতে ইসলামী এবং গণমাধ্যম হিসেবে দৈনিক সংগ্রামের ভূমিকার কথা উঠে এসেছে। একাত্তর সালে সংগ্রামের পাতায় পাতায় থাকতো স্বাধীনতা বিরোধীদের খবর। দাবি আছে ব্যক্তি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পর সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের বিচারের। একদিন নিশ্চয়ই এই দেশে জামায়াতে ইসলামী এবং দৈনিক সংগ্রামেরও বিচার হবে। তার আগেই দৈনিক সংগ্রাম কাদের মোল্লাকে ‘শহীদ’ বলে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মত অপরাধ করেছে। এখনই সংশ্লিষ্টদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। তবে একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে একটি গণমাধ্যম বন্ধ করার দাবির সাথে আমি একমত নই। যারা সংগ্রামের এই ভূমিকার জন্য দায়ী, তাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি। আর দৈনিক সংগ্রাম যাতে স্বাধীনতা বিরোধী ভূমিকা চালাতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার নামে আপনি কোনোভাবেই রাষ্ট্রবিরোধী বা স্বাধীনতাবিরোধী কিছু প্রকাশ করতে পারবেন না। দৈনিক সংগ্রামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলার দাবি জানিয়ে স্ট্যাটাস দিয়ে ফেসবুকে প্রচুর গালি এবং হুমকি পেতে হয়েছে। আমার চেয়ে আরো বেশি গালি খেতে হচ্ছে অঞ্জন রায়কে। কারণ তার ধর্মীয় পরিচয়। অশ্লীলতম গালিগালাজ তো আছেই, আছে স্পষ্ট হত্যার হুমকিও। ফেসবুকে অনেকেই বলছেন, এটা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। কিন্তু যা ইচ্ছা তাই লেখা কিন্তু গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নয়। গণমাধ্যমকে অবশ্যই দায়িত্বশীল হতে হবে। রাষ্ট্রের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার রায় মানতে হবে, সে রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। কাদের মোল্লাকে ‘শহীদ’ বলাটা কোনোভাবেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নয়। অনেকে বলছেন, সংগ্রাম ভুল করেছে, সম্পাদক ভুল স্বীকার করে ক্ষমাও চেয়েছেন। এটা ঠিক গণমাধ্যমের ভুল হতে পারে, হয়ও; সেটার সংশোধনী ছাপা হয়, ভুল স্বীকার করা হয়। ভুল হলে ক্ষমা চাইলে পার পাওয়া যায়। তবে ভুল আর অপরাধ এক নয়। সংগ্রাম যা করেছে, তা নিছক ভুল নয়, সুনির্দিষ্ট অপরাধ। এবং সেই অপরাধটা ইচ্ছাকৃত, উদ্দেশ্যমূলকভাবে করেছে। এটা নিছক ক্ষমা চাইলে হবে না। সুনির্দিষ্ট অপরাধের জন্য সংশ্লিষ্টদের শাস্তি পেতেই হবে। আর সংগ্রাম সম্পাদক স্বেচ্ছায় ক্ষমতা চাননি, চাপের মুখে ক্ষমার কথা বলতে বাধ্য হয়েছেন।
অনেকে সরকার, বিচার ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ওপর অনাস্থার কথা বলেছেন। আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে, কিন্তু আপনি প্রচলিত ব্যবস্থাকে অস্বীকার করতে পারবেন না। যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লা কিন্তু প্রচলিত বিচার ব্যবস্থা মেনে নিয়েছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছিল। অনেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত এবং গ্রহণযোগ্য। এর আগে যুদ্ধাপরাধীদের যত বিচার হয়েছে, বাংলাদেশের মত এত সুযোগ কোথাও পাননি যুদ্ধাপরাধীরা। ফেসবুকে কেউ গালি দিলে আমি মন খারাপ করি না। বরং মনে করি, আমি ঠিকই লিখেছি এবং আমার লেখার কোনো যৌক্তিক জবাব নেই তার কাছে। থাকলে তো যুক্তি দিয়েই জবাব দিতেন। যুক্তি যখন ফুরিয়ে যাবে, তখনই আপনি গালি দেবেন। তবে দুঃখ একটাই। এই গালিবাজরা সবাই ফেসবুকে ইসলামের ঝান্ডা ওড়্য়া। আর উচ্চারণের অযোগ্য গালি দেয়। এই গালি দিয়ে তারা আসলে ইসলামকেই হেয় করে।
কাদের মোল্লাকে ‘শহীদ’ বলার প্রতিবাদে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ নামে একটি সংগঠন শুক্রবার সন্ধ্যায় দৈনিক সংগ্রাম অফিসের সামনে বিক্ষোভ করেছে। তাদের বিক্ষোভের মুখেই সংগ্রাম সম্পাদক ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছেন। পরে পুলিশ তাকে আটক করে নিয়ে যায়। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা মঞ্চের বিক্ষুব্ধ কর্মীরা সংগ্রাম অফিসে ঢুকে ব্যাপক ভাংচুর চালিয়েছে। সংগ্রাম অফিসের সামনে বিক্ষোভ, বিচারের দাবি পর্যন্ত আমি তাদের সাথে একমত। কিন্তু আপনি একটি সংবাদপত্র অফিসের ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর চালাতে পারেন না। আমি সংগ্রামের বিরুদ্ধে মামলা করতে বলেছি, তাই বলে হামলা চালানো সমর্থনযোগ্য নয়। আমরা আইনের কাছে প্রতিকার চাইবো, আইন হাতে তুলে নেবো না। অনেকেই সংগ্রাম অফিসে হামলা-ভাঙচুরকে সমর্থন করে, স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রতিরোধ করার ডাক দিয়েছেন। কেউ অপরাধ করলে, তার বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ আছে।
আর চাইলে আপনি রাজনৈতিক প্রতিরোধও করতে পারেন। কিন্তু আইন হাতে তুলে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ার আকাঙ্খা মানে আপনিও তাদের মত আইনের শাসনে বিশ্বাস করছেন না। সরকার কিন্তু দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া শেষে যুদ্ধাপরাধীদের দন্ড দিয়েছে। কাউকে কিন্তু ক্রসফায়ার করা হয়নি। তাই কোনোভাবেই আইন হাতে তুলে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। এটা দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।
আমি আবারও একাত্তরের কসাই, সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক সর্বোচ্চ দন্ড পাওয়া যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লা ‘শহীদ’ আখ্যা দেয়ার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি এবং সংগ্রামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করার দাবি জানাচ্ছি। অপরাধ করে কেউ পাড় পায়নি, পাবেও না।

Previous articleবিজয়ের মাসেই চিরবিদায় নিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী স্বপন
Next articleবঙ্গবন্ধুর লাশ পড়ে থাকলো, এত নেতা কোথায় ছিল : শেখ হাসিনা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here