মোদির শাসনে বিশৃঙ্খলায় পতিত ভারত

72

আন্তর্জতিক ডেস্ক : নরেন্দ্র মোদির সরকার নাগরিকত্ব সংশোধন আইনবিরোধী বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা করলেও ভারতজুড়ে রাজপথ উত্তপ্ত। এমনকি গ্রেফতার হওয়ার পরোয়া না করেই পথে নামছেন অনেকে।

১৯ বছরের আদিত্য চৌধুরী বৃহস্পতিবার সকাল কাটিয়েছেন চিৎকার করে স্লোগান দিয়ে। মান্ডি হাউস এলাকায় তার সকালটি ছিল পুলিশের হাতে আটক না হওয়ার চেষ্টাতেও। দিল্লিতে চলমান বিক্ষোভে এই স্থানটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখানেই বিক্ষোভকারীরা জড়ো হন নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে। যে আইনটিকে তারা বলছেন বৈষম্যমূলক। নরেন্দ্র মোদি সরকার আইনটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।
আমার মনে হয়, অসাংবিধানিক একটি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এটিই আমাদের শেষ সুযোগ।
আদিত্য বলছিলেন, আমরা জমায়েতে স্লোগান দিচ্ছিলাম। পুলিশ জনগণকে তাড়াচ্ছিল। চারদিক থেকে তারা আমাদের দিকে আসছিল। এটি হিন্দু বা মুসলিমের বিষয় নয়। গত ছয় বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। আমার মনে হয়, অসাংবিধানিক একটি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এটিই আমাদের শেষ সুযোগ।
আদিত্য ছিলেন ভাগ্যবান। তাকে অন্যদের মতো পুলিশ টেনে-হিঁচড়ে ভ্যানে তুলে স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যায়নি। ভারতের বিভিন্ন শহরে কয়েকশ’ বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে। যারা এমন একটি আইনের বিরোধিতা করছিলেন যাতে নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য ধর্মকে ভিত্তি করা হয়েছে। ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) শাসিত বিভিন্ন রাজ্যের সরকার ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৪৪ ধারা জারি করেছে। এর ফলে কোনও একটি স্থানে চারজনের বেশি মানুষের একত্রিত হওয়া নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। দিল্লির আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা মোদির কেন্দ্রীয় সরকার মোবাইল ফোনের ইন্টারেনট পরিষেবা বন্ধ করে দিয়েছে এবং জনগণ যাতে জমায়েত হতে না পারেন সেজন্য মেট্রো রেলসেবাও বন্ধ রাখা হয়েছে।
দিল্লিতে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়ার কৌশলটি শুরু হয়েছে কাশ্মির ও উত্তর-পূর্ব ভারতে প্রয়োগের মধ্য দিয়ে। এতে করে ভারত যে সংকটে রয়েছে সেটিরই ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
সোমবার পুলিশ ও বিক্ষোভকারী সংঘর্ষের সময় ম্যাঙ্গালুরু ও লক্ষ্নৌতে দুই ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। ম্যাঙ্গালুরু শহরের পুলিশ কমিশনার পিএস হার্শা বলেছেন, অন্তত ২০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। লক্ষ্ণৌতে আহত হয়েছেন এক পুলিশ সদস্য।
মুসলিম শিক্ষার্থী অধ্যুষিত জামিয়া মিলিয়া ও আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পুলিশি নিপীড়ন, টিয়ার গ্যাস ও ব্যাটন চার্জের পর আইনবিরোধী বিক্ষোভ জোরদার হয়। খবরে জানা গেছে, পুলিশি এই হামলায় দিল্লির এক শিক্ষার্থী একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। আলিগড়ের চিকিৎসকরা বাধ্য হয়েছেন টিয়ার গ্যাস শেলের আঘাত পাওয়া এক শিক্ষার্থীর হাত কেটে ফেলতে।
পিএইচডি শিক্ষাবিদ ইমরান চৌধুরী হরিয়ানার নিজের গ্রাম থেকে প্রথম স্নাতক পাস করা ব্যক্তি। তিনি বর্ণনা দিয়েছেন কীভাবে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরিতে ঢুকে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছুড়ে এবং শিক্ষার্থীদের মারধর করে। এটি এতোই অপমানজনক ছিল ইমরানের কাছে যার ফলে এতো কষ্ট করে যা কিছু অর্জন করেছেন বা করতে চাইছেন সবকিছুই তার কাছে এখন হাস্যকর মনে হচ্ছে।
ইমরানের কথায়, আমি জানি না কেন আমাকে এতো অবজ্ঞা করা হচ্ছে, যেন আমি কিছুই না। আমার সম্মানের যেনও কোনও গুরুত্ব নেই।
বিক্ষোভের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, ‘গায়ের পোশাক দেখে আপনারা সহজেই চিহ্নিত করতে পারেন কারা সহিংসতা ছড়াচ্ছে’। ভারতীয় মুসলিম সমাজে মোদির এই বক্তব্য সাম্প্রদায়িক উসকানি হিসেবে সমালোচিত হচ্ছে।
নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করার ক্ষেত্রে মোদির সরকার হয়ত জনগণ ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সম্পর্কে সঠিক মূল্যায়ন করতে পারেনি। তারা ভাবতে পারেননি ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে ধর্মকে ভিত্তি করায় এমন প্রতিক্রিয়া আসবে।
সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তানে নিপীড়নের শিকার হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, জৈন ও পার্সিদের ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু মুসলিমদের নয়। জাতিসংঘের মতে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানরা বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত সম্প্রদায়। নতুন এই আইনে এই রোহিঙ্গারা ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়ার উপযুক্ত হিসেবে বিবেচিত হবে না।
অনেক ভারতীয় নাগরিকের কাছে নতুন এই আইনটি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ নীতির লঙ্ঘন, যে ভিত্তির ওপর দেশটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অনেকেই দাবি করছেন, নতুন এই আইনটিকে প্রস্তাবিত জাতীয় নাগরিক তালিকার আলোকে দেখতে হবে। যে তালিকায় ১৩০ কোটি মানুষকে ভারতীয় হওয়ার প্রমাণ দিতে হবে। এই নাগরিক তালিকা থেকে বাদ পড়া অমুসলিমরা হয়ত নতুন এই আইনে আশ্রয়ের আবেদন করতে পারবেন কিন্তু মুসলিমদের বিড়ম্বনায় পড়তে হবে।
মোদির জনপ্রিয়তা ও হিন্দুত্ববাদের প্রচারের কাছে ম্রিয়মান হয়ে পড়া বিরোধী দলগুলো এই বিক্ষোভে সমর্থন দিয়ে শক্তি জুগিয়েছে।
এটি কোনও মুসলিমপন্থী আন্দোলন নয়। এটি প্রজাতন্ত্রপন্থী আন্দোলন।
ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট ক্যালকাটা ক্যাম্পাসের ২৭ বছরের পিএইচডি শিক্ষার্থী পরশ হিতেন গালা বলেন, ‘দেশে আজ যারা সহিংসতার শিকার হচ্ছে তাদের প্রতি সমর্থন জানানোই আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। হোক সে ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থী কিংবা নাগরিক যারা ইন্টারেনট বন্ধ করে দেওয়াতে বা ১৪৪ ধারা জারির কারণে ভুক্তভোগী হচ্ছেন।’
বাদ্রি রায়না নামের অবসরপ্রাপ্ত ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক বলেন, ‘সবাইকে একত্রিত করতে বিরোধী দলগুলো যেখানে ব্যর্থ হয়েছে সেখানে শাসক দল সফল হয়েছে। এটি কোনও মুসলিমপন্থী আন্দোলন নয়। এটি প্রজাতন্ত্রপন্থী আন্দোলন।’
মুসলিম শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা যে শুধু ভারতে প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছে তা নয়, বাংলাদেশ, যুক্তরাজ্য, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
জামিয়া মিলিয়ার নারী শিক্ষার্থীদের ওপর দিল্লি পুলিশের হামলায় হতবাক হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমসে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী বুশরা মিশমা। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে এমনটি ঘটছে তা মেনে নেওয়ার মতো না। ভারতীয় পুলিশ, যে কোনও দেশের পুলিশ এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করতে পারে না। যে শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করছিলেন। এটি একটি নিন্দাজনক কাজ’।
মোদির সরকার নাগরিকত্ব সংশোধন আইনবিরোধী বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা করলেও ভারতজুড়ে রাজপথ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে, এমনকি গ্রেফতারের পরোয়া না করেই পথে নামছেন অনেকে।
দিল্লির উপতলীয় গুরগাঁও থেকে মান্ডি হাউসে এসেছেন অদিতি নামের তরুণী। যেখানে মাত্র কয়েক ঘণ্টা পূর্বে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের আটক করে নিয়ে গেছে। তিনি বলছেন, ‘যদি তাকে একাই প্রতিবাদ করতে হয় তিনি তা করবেন’। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই তরুণীর কথা, ‘কাশ্মিরকে অবরুদ্ধ করার চার মাস পার হয়ে গেছে। এবার তা আমাদের ক্ষেত্রেও ঘটছে। এখন, আমরা সবাই অনুধাবন করতে পারব’।
অটোরিকশা করে যাচ্ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যবয়সী এক নারী। কারণ বিক্ষোভের ফলে তিনি যে মেট্রো স্টেশন দিয়ে যাতায়াত করতেন তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, বিক্ষোভের পেছনে যে নতুন আইনের ভূমিকা রয়েছে তা সম্পর্কে কিছুটা অবগত তিনি। সাংবাদিক ওই নারীর নাম জানতে না পারেননি। তার মতে, নতুন আইন বাস্তবায়ন নিয়ে মানুষ এখনও সংশয়ে আছে।ওই নারী কথায়, ‘নতুন আইনে কী আছে তা সঠিকভাবে আমি জানি না। আমি শুনেছি এতে বিদেশিদের বাদ দেওয়া হবে। চাকরির কথা বিবেচনা করলে খুব ভালো। ভারতে এখন কোনও চাকরি পাওয়া যাচ্ছে না।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও একই ধরনের যুক্তির কথা বলেছেন। তার মতে, ভারতের মতো দরিদ্র দেশে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান দরকার। সম্প্রতি হিন্দি ভাষার একটি টিভি চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি আরেকটি যুক্তি তুলে ধরেছেন। তার মতে, ‘ভারত হবে হিন্দুদের মাতৃভূমি’। যা উত্তর ভারতের হিন্দুভাষী গেরুয়া অঞ্চলের মানুষের কথার প্রতিধ্বনি। এই এলাকাটি বিজেপির শক্ত নির্বাচনি ঘাঁটিও। সাংবাদিক রাহুল কানওয়ালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অমিত শাহ প্রশ্ন করেন, ‘হিন্দুরা কোথায় যাবে?’
এর আগে বৈধ কাগজপত্র ছাড়া ভারতে বসবাসকারীদের অমিত শাহ ‘কীট’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। সূত্র : হাফিংটন পোস্ট ইন্ডিয়া

Previous articleশেখ হাসিনার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে : কাদের
Next articleসম্মেলনের উৎসবে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here