বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সুদিন

89

কামাল লোহানী
১০ জানুয়ারি ১৯৭২। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ফিরে আসবেন তার প্রিয় মাতৃভূমি মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে। স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রের প্রতিটি পর্যায়ে ব্যাপক প্রস্তুতি আর আবেগঘন পরিবেশ, বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুকে সুস্বাগতম জানানোর উদ্দেশ্যে। মরণজয়ী এই বীর দস্যুদানবের দেশ পাকিস্তান থেকে মুক্ত স্বদেশে ফিরবেন, অশেষ আনন্দের বাঁধভাঙা বন্যা সবার মাঝে। মুক্তিযুদ্ধের আহ্বান জানিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধ হাঁক দিয়ে যে মানুষটি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে বন্দি হয়ে কারাবাস করেছেন নয় মাস, তিনি আজ আসবেন তার ভালোবাসার মানুষগুলোর কাছে। কী আনন্দ চতুর্দিকে।
আমি তখন বাংলাদেশ বেতার ঢাকা কেন্দ্রের দায়িত্বে নিয়োজিত। সবার মাধ্যমে সবার সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিলাম এই মহান পুরুষের মুক্ত স্বদেশে প্রত্যাবর্তনকে বেতারের মাধ্যমে সরাসরি ধারাবিবরণী দিয়ে বাংলাদেশ তথা বিশ্ববাসীর কাছে তার শুভাগমন তুলে ধরতে। ঠিক হলো, তেজগাঁও বিমানবন্দরের একতলা ভবনের ছাদ থেকে বাংলাদেশ বেতারের ধারাবিবরণী শুরু হবে এবং কারওয়ানবাজার হয়ে শাহবাগ ব্রডকাস্টিং হাউস পেরিয়ে রেসকোর্স ময়দানে এসে এই বিবরণী শেষ হবে। এই চারটি পয়েন্টে আমরা দুজন করে অর্থাৎ তেজগাঁওয়ে আমি নিজে ও আমার সহযোগী সহকারী পরিচালক আশফকুর রহমান খান, কারওয়ানবাজার পয়েন্টে টি এইচ শিকদার ও শহিদুল ইসলাম, ব্রডকাস্টিং হাউসে মুস্তফা আনোয়ার ও আশরাফুল আলম এবং রেসকোর্স ময়দানে নির্মিত মঞ্চে আমি এবং আশফাক তেজগাঁ শেষ করে এখানে আসব। সেইমতো সবাইকে দায়িত্ব বেটে দেয়া হলো।
ঢাকার বিমানবন্দর তখন তেজগাঁওয়ে ছিল। এই চলতি বিবরণী প্রচারের জন্য দিল্লি থেকে আকাশবাণীর প্রতিনিধি হিসেবে এলেন ইংরেজি সংবাদ পাঠক, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ধারাভাষ্যকার সুরজিৎ সেন এবং হিন্দির জন্য এলেন কে কে নায়ার। আর কলকাতা থেকে এলেন মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে সুপরিচিত জনপ্রিয় সংবাদপাঠক দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। ওরাও শামিল হবেন আমাদের এই ধারাভাষ্যে, জাতির পিতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে। ঐতিহাসিক মুহূর্তের জন্য আমরা তেজগাঁও বিমানবন্দরের একতলার ছাদে অপেক্ষমাণ পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লন্ডন থেকে দিল্লি হয়ে সরাসরি ঢাকা আসবেন, অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা সেই জন্য। অকস্মাৎ পশ্চিম আকাশে দৃশ্যমান হলো সেই শ্বেতহংসটি যে বাংলার মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে ঢাকা পৌঁছাচ্ছে। বিস্ময়ে হতবাক দূর পশ্চিম আকাশের ওই একখন্ড উড়োজাহাজকে দেখতে পেয়ে যেন অগণিত মানুষের ভিড় জ্বলে উঠল প্রবল আবেগে। চতুর্দিক মুখোরিত হয়ে উঠল
‘তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব শেখ মুজিব’, ‘জয় বাংলা’ এই ধ্বনিতে। আকাশ যেন কেঁপে উঠছিল বিপুল মানুষের সমুদ্রগর্জনে। তাকিয়ে দেখলাম তেজগাঁও থেকে যে রাস্তা সোজা গেছে শাহবাগের দিকে, সে রাস্তার কালো পিচ দেখা যাচ্ছে না, শুধু চোখে পড়ছে মানুষ আর মানুষ। বিপুল জনতরঙ্গ উত্তাল যেন স্লোগানে মুখর এক প্রবল আহ্লাদে। প্রাণপ্রিয় নেতা তাদের ফিরছেন আজ এইখানে।
আমরা যারা এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে বেতার ভাষ্য দেয়ার জন্য তেঁজগাওয়ে উপস্থিত তাদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই দেবদুলাল আমাদের মধ্যে খুব জনপ্রিয় ছিলেন। আকাশবাণী কলকাতার সংবাদ পরিক্রমার লেখক প্রণবেশ সেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় নিয়মিতভাবে লিখতেন আর তাই আবেগময় দানাদার কণ্ঠে পাঠ করতেন দেবদুলাল। সংবাদ পরিক্রমার লেখক প্রণবেশ আমাদের ছোটবেলার বন্ধু এবং কলকাতা আকাশবাণীর প্রতিনিধি। বাবা তার ছিলেন পাবনার যশস্বী আইনজীবী কমলেশ সেন। প্রণবেশের বন্ধু দেবদুলাল যে সংবাদ পরিক্রমা পাঠ করতেন প্রতিদিন তাতে ছিল বাংলার মানুষের অকুতোভয় যুদ্ধযাত্রা এবং অমিততেজ লড়াইয়ের কাহিনী। কিংবা থাকত শত্রুর পরাজয়ে বিজয়ী বাঙালির আনন্দ উল্লাস। কি আবেগ নিয়েই না ফুটিয়ে তুলতেন প্রনবেশ সেন শরণার্থীদের দুঃসহ যন্ত্রণার কথা। আজ সেই মানুষটিকে সঙ্গে নিয়ে আমি আর আশফাক, সুরজিৎ আর নায়ার আমাদের সব মানুষের প্রাণপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কাভার করতে এসেছি।
যে ব্রিটিশদের কাছ থেকে এককালে আমরা আমাদের তথাকথিত স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম, সেই ব্রিটিশ শ্বেতহংসে আরোহণ করে এসে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার ক্ষতবিক্ষত তেজগাঁও বিমানবন্দরে নামলেন আমাদের জাতির সেই মহান পুরুষ, যাকে একনজর দেখনোর জন্য অযুত মানুষের ভিড়। ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর উড়োজাহাজটি এসে নামল তেজগাঁও বিমানবন্দরে। মাটি স্পর্শ করতেই রানওয়েতে অপেক্ষমাণ জনতার মধ্য থেকে মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ছুটে গেলেন ফুলের মালা হাতে, বিমানের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলেন, দোরগোড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মালা পরিয়ে বুকে মাথা দিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন তাজউদ্দীন। এর মধ্যে কীর্তিমান সন্তান সেই মহান পুরুষ বঙ্গবন্ধু তাকিয়ে দেখলেন রানওয়েতে একটি হুইলচেয়ারে প্রতীক্ষা করছেন তার বিজয়ী সন্তানকে বুকে জড়িয়ে আদর করতে, শেখ লুতফর রহমান, বঙ্গবন্ধুর অশীতিপর বাবা। তিনি ছুটে গেলেন, মাটিতে হাঁটু গেড়ে বাবার বুকে সন্তানের পিতৃ স্নেহ গ্রহণের সেকি অপরূপ দৃশ্য, বর্ণনা দিয়ে বোঝানো যাবে না। আমরা তো বাংলাদেশ বেতার আর আকাশবাণীতে পাঁচজন ধারাভাষ্যকার বিপুল উৎসাহে বাংলা, ইংরেজি এবং হিন্দিতে ধারাবিবরণী দিয়ে চলেছি। প্রতিটি মুহূর্ত চাইছি মানুষের কাছে যেন আমাদের কথায় দৃশ্যমান হয়, প্রাণান্ত সেই চেষ্টা। জানি না কতখানি সার্থক হয়েছিল সেদিনের আবেগ উচ্ছল বেতার ধারাভাষ্য। ওদিকে আবেগময় মুহূর্ত শেষ হয়ে গেলে মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জানানো হলো ‘গার্ড অব অনার’। এবার তার তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে গন্তব্যের পথে রওনা দেয়া।
ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী তখনো দায়িত্বে ছিলেন আর তাই একটি মোটরকারে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা জানালেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু আজকের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে অগণিত মানুষের ভিড়ে ‘পালিয়ে যাওয়ার মতো’ কোনো চতুর্দিক ঢাকা গাড়িতে যেতে রাজি হলেন না। নিরাপত্তা বাহিনী উপর্যুপরি যুক্তি দেখিয়ে তার যাত্রাপথকে সুগম করতে চাইলেন কিন্তু বঙ্গবন্ধু নাছোড়বান্দা। তিনি একটি খোলা ট্রাকে নেতৃবৃন্দ পরিবেষ্টিত হয়ে যেতে চান রেসকোর্স ময়দানে আর পথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিপুল জনসমুদ্রকে তিনি অভিবাদন জানাতে চান নয় মাসের বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের জন্য। অবশেষে একেবারে খোলা ট্রাকে খোন্দকার মোশতাক, তাজউদ্দীন আহমদ, যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মণি, আব্দুর রাজ্জাক, ছাত্রনেতা নূরে আলম সিদ্দিকী, তোফায়েল আহমেদ, আব্দুল কুদ্দুস মাখন এবং শাজাহান সিরাজ দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে যাত্রা শুরু করলেন। এদিকে আমাদের বেতার ভাষ্য দেয়ার জন্য রেসকোর্স ময়দানের মঞ্চে উপস্থিত হওয়ার কথা ছিল যে পাঁচজনার সুরজিৎ সেন, কে কে নায়ার, দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, আশফাকুর রহমান খান ও আমার সে চিন্তায় পড়ল ছেদ। পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখলাম এই বিপুল জনসমুদ্রে গাড়ি তো দূরের কথা আমরা হেঁটেও রেসকোর্স পৌঁছতে পারব না। অবশেষে বেকুবের মতো হাঁ করে ওই ছাদেই দাঁড়িয়ে রইলাম! কিন্তু আমি যোগাযোগ করলাম অন্য পয়েন্টগুলো যেন ঠিকমতো কাভার হয় এবং শেষ পর্যন্ত কেউ যেন রেসকোর্স ময়দানের মঞ্চে গিয়ে ধারাবিবরণী প্রচার করেন। সে কাজটি করেছিলেন আশরাফুল আলম, শাহবাগ বেতার ভবন থেকে রেসকোর্সে গিয়েছিলেন হেঁটে। বিবরণী প্রচারের ব্যবস্থা মঞ্চেই ছিল সুতরাং সে ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে তিনি যতটা সম্ভব ধারাভাষ্য প্রচার করেছিলেন।
ওই যে বলছিলাম আমরা অবাক বিস্ময়ে তার যাত্রাপথের দিকে তাকিয়ে ছিলাম, তখন চোখে পড়ছিল রাস্তায় তো বটেই রাস্তার পাশে, দালানগুলোতেও এমনকি গাছের ডালে ডালে পর্যন্ত উঠে বসেছিলেন অগণিত মানুষ তাদেরই চেনা মুখ অতিপ্রিয় বঙ্গবন্ধুকে দেখার জন্য। যেখান দিয়েই খোলা ট্রাকটি এগিয়ে যাচ্ছিল সেখানকার উপস্থিত জনতা বঙ্গবন্ধুর নামে স্লোগান দিয়ে গলা ফাটিয়ে উল্লাস প্রকাশ করছিলেন, দিচ্ছিলেন ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি। তাকিয়ে দেখছিলাম বিপুল জনসমুদ্রে ধীরগতিতে ভেসে চলেছে একটি খোলা ট্রাক মহানায়ককে বহন করে। এ দৃশ্য শুধু দেখা যায় বর্ণনা করা যায় না। তবু বলি একটি ছোট্ট নৌকো যেন জনতার সমুদ্রে ভেসে চলেছিল। প্রতিটি গাছের ডালে যেমন মানুষ ঝুলছে তেমনি দেখেছি সেদিন বাড়ির বারান্দায় কিংবা বেলকনিতে কিংবা খোলা দরজা, জানালায় দাঁড়িয়ে আছেন গৃহবধূরা, মনে তাদের উল্লাস মহান পুরুষের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে আর স্বাধীন বাংলাদেশের বিপুল গর্জনে।
এই তো মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ। গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্রের স্লোগানে লড়েছিল মুক্তিযুদ্ধ নয় মাস চূড়ান্ত সশস্ত্র লড়াইয়ে। নির্দেশ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চ ১৯৭১ তার বজ্রকণ্ঠের অমোঘ বাণীতে, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। সেই মহানায়কের প্রত্যাবর্তনে একি উল্লাস! উদ্বেলিত মানুষের আহ্লাদিত চিত্তের তাই পরম প্রকাশ দেখেছিলাম ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ মহান নেতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে।
কামাল লোহানী : সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।

LEAVE A REPLY