বঙ্গবন্ধুর জন্যে ক্ষণগণনা ও বুকের আলো

27

স্বদেশ রায়
গোটা জাতি বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর ক্ষণগণনা শুরু করেছে। এই ক্ষণগণনায় শুধু আনন্দ আছে। কোনও উৎকণ্ঠা নেই। কোনও অনিশ্চয়তা নেই। কিন্তু যে তারিখ থেকে এই ক্ষণগণনা শুরু হয়েছে এই দিনের, সেই মাহেন্দ্রক্ষণটির জন্যে শুধু গোটা বাঙালি জাতি নয়, বিশ্বের মানবিক ও উদারনৈতিক সব মানুষ ক্ষণগণনা শুরু করেছিলো ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে। সেদিন পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকায় মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের পরপরই ভাষাসৈনিক গাজীউল হক তাঁর বন্ধু তৎকালীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের কাছে ছুটে গিয়েছিলেন তাকে আলিঙ্গন করে বিজয়ের স্বাদ নেওয়ার জন্যে। কিন্তু তিনি তাঁর রুমে ঢুকেই চমকে চান। নীরব নিথর এক মানুষ বসে আছেন। তিনি তাঁর ডান হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে বাম হাতের কড়ে আঙুলের নখ খুটছেন (তাজউদ্দীন আহমদ যখনই কোনও বিষয়ে চিন্তিত বা ব্যথিত হতেন তিনি এমনটি করতেন) আর তাঁর চোখের কোণ গড়িয়ে পানি এসে কপালে নেমেছে। বিজয়ী এক নেতাকে এভাবে নীরব নিথর দেখে চমকে যান গাজীউল হক। তিনি খুব ধীরপায়ে বন্ধু তাজউদ্দীনের কাছে এগিয়ে চেয়ারের
পাশে গিয়ে তাঁর কাধে হাত রাখেন। গাজীউল হকের হাতের স্পর্শ পেয়ে আর স্থির থাকতে পারলেন না তাজউদ্দীন আহমদ। তিনি বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘গাজী, আজকের এ মুহূর্তে মুজিব ভাই নেই। যার জন্যে আজকের এই বিজয়, তিনি কেমন আছেন আমরা কেউ জানি না।’ গাজীউল হক আর কোনও কথা বলতে পারেননি। তিনিও তাঁর বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘মুজিব ভাই ভাষা থেকে দেশ পর্যন্ত সবই দিলেন আমাদের।’ তখন তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘তাকে ছাড়া আমাদের এই বিজয় কখনও পরিপূর্ণ নয়।’ গাজীউল হকের ভাষায় , এ পর্যন্ত বলার পরেই যেন তাজউদ্দীন আহমদ কেমন কঠিন হয়ে যান। তিনি বলেন,‘ গাজী আরও সংগ্রামের জন্যে, যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হতে হবে। মুজিব ভাইকে ছাড়া কোনও বাংলাদেশ নয়।’
বাংলাদেশের সেদিনের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ শুধু তাঁর বন্ধু গাজীউল হককে এই যুদ্ধের কথা বলেননি, তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, যদি পাকিস্তান আমাদের নেতা, আমাদের রাষ্ট্রপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অবিলম্বে মুক্তি না দেয় তাহলে আমরা আমাদের মুক্তিবাহিনী নিয়ে মিত্র বাহিনীর সহায়তায় পশ্চিম খন্ডে পাকিস্তানকে আক্রমণ করে, পরাজিত করে তবেই আমাদের নেতাকে মুক্ত করবো। ইতিহাসে যা ঘটেনি তা নিয়ে কল্পনা না করাই ভালো, তারপরেও এ সত্য বলা যায়, সেদিন যদি মিত্রবাহিনীর সহায়তায় ভারতে ট্রেনিং নেওয়া মুক্তিবাহিনী ও বাংলাদেশের ভেতরে ট্রেনিং নেওয়া সব মুক্তিবাহিনী নিয়ে বাংলাদেশ বর্তমানের পাকিস্তানকে আক্রমণ করতো তাহলে পৃথিবীর ইতিহাসে আরেক জীবনপণ যুদ্ধ হতো। মুক্তিযোদ্ধারা নয় মাস যে জীবনপণ করে যুদ্ধ করেছিলো তার চেয়ে শতগুণ জীবনপণ যুদ্ধ করতো তাঁরা। কারণ, কিছুটা অতিরঞ্জিত মনে হলেও এ সত্য আজ এ প্রজন্মকে বলতে হবে, সেদিন মুক্তিযোদ্ধারা তাঁদের দেশের থেকেও বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসতো অনেক বেশি। তাই লাখ লাখ তরুণ সেদিন তাদের নেতা, তাদের প্রিয় মুজিব ভাইকে মুক্ত করতে অকাতরে জীবন দিতে পাকিস্তানের পশ্চিম খন্ডে যুদ্ধে যেতো। আর সেই সশস্ত্র যৌবন জলতরঙ্গ রোখার কোনও ক্ষমতা সেদিন আর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ছিল না। ইতিহাসে এ ঘটনা ঘটেনি। আর ঘটার প্রয়োজনও পড়েনি। কারণ, ১৬ ডিসেম্বর পূর্ব খন্ডে হেরে গিয়ে পাকিস্তান তখন মৃতপ্রায় একটি সাপ। লাঠির আঘাতে তার মেরুদন্ডের প্রায় সব হাড় তখন ভেঙে গেছে।
তবে বঙ্গবন্ধুর মুক্তি নিয়ে উৎকণ্ঠা শুরু হয় মূলত ১৯৭১ সালের আগস্ট মাস থেকে। যেদিন ইয়াহিয়া প্রথম প্রকাশ্যে বলেন, তিনি শেখ মুজিবুর রহমানকে দেশদ্রোহিতার অপরাধে বিচার শুরু করেছেন, বঙ্গবন্ধুর এই বেআইনি বিচারের বিরুদ্ধে সেদিন গোটা পৃথিবী সোচ্চার হয়েছিলো। শুরু হয়েছিলো বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করার একটি আন্দোলন পৃথিবীজুড়ে। ভারতের পার্লামেন্টের অনুমতি নিয়ে সেদিন এই আন্দোলনে যে অভূতপূর্ব নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মহীয়সী নারী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী, তা পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি ও রাষ্ট্রীয় কূটনীতির এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। সেদিন তাঁর এই আন্দোলনের গতিবেগ থেকে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছিলো এক, বন্দি নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু সেদিন কতটা শক্তিশালী ছিলেন। তাকে অন্যায়ভাবে বিচার করতে গিয়ে মূলত ইয়াহিয়া জ্বলন্ত আগুনে হাত দিয়েছিলেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রনীতি ও কূটনীতিতে জওয়াহেরলাল তনয়া ইন্দিরা গান্ধীও কতটা দক্ষ ছিলেন তার প্রমাণও তিনি রাখেন। বাঙালি সেদিনও এক ধরনের ক্ষণগণনা শুরু করেছিলো যেন বঙ্গবন্ধুর এই তথাকথিত বিচার শেষ হওয়ার আগেই তারা দেশকে মুক্ত করে তাদের প্রিয় নেতাকে মুক্ত করতে পারে।
তবে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে বঙ্গবন্ধুর এই মুক্তির ক্ষণগণনায় যোগ দেয় অতিবড় শত্রু দেশগুলোও। যেমন সেদিন যেসব দেশ, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ, চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো যে দেশগুলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করেনি তারাও ক্ষণগণনা শুরু করে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্যে। কারণ, তাদের জন্যে তখন সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায় বঙ্গোপসাগরের পাশে, চীন ও ভারতের মাঝখানের এই দেশটির স্থিতিশীলতা। দেশটিতে যাতে একটি একক সরকার গঠিত হয় বা সরকারের গোটা দেশের ওপর স্বাভাবিক নিয়মতান্ত্রিক কন্ট্রোল থাকে, তার প্রয়োজনীয়তা। নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী সংবাদপত্রগুলো তখন তাদের এডিটরিয়াল ও মন্তব্য কলামে লিখতে শুরু করে, এই মুহূর্তে দেশটির জন্যে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব। কারণ, এ মুহূর্তে শেখ মুজিবুর রহমান ছাড়া অন্য কোনও নেতা নেই, যিনি দেশের সব সশস্ত্র গ্রুপকে একটি শান্তিপূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসতে পারবেন। ভারত ও তাদের নেতা শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী শুরু থেকে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্যে সব ধরনের চেষ্টা করলেও তারাও কিছুটা উৎকণ্ঠিত ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমানের দেশে ফিরে আসার ক্ষণটির জন্যে। কারণ, যে ৯৮ লাখের ওপর শরণার্থী ভারতে গিয়েছিলো তার আংশিক মাত্র ১৬ ডিসেম্বরের পরে দেশে ফেরেন। তাদের একটি অংশ তখনও মনে করছিলেন, শেখের ফিরে আসা ছাড়া দেশে যাওয়া নিরাপদ নয়। কারণ, বঙ্গবন্ধু দেশে না ফেরা অবধি যেকোনও সময় যেকোনও ধরনের অঘটনের আশঙ্কা তাদের মধ্যে ছিল। এই প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে নিরাপদে দেশে পাঠানো ভারতের অনেক কমিটমেন্টের ভেতর একটা ছিল। তাই তাদের অনেকেই তখন অপেক্ষা করছিলো বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্যে।
আর ১০ জানুয়ারি ঢাকার মানুষের ক্ষণগণনা তো সেদিনের প্রতিটি সংবাদপত্রের পাতায় আছে। তবে সেখানে একটি রুদ্ধশাস ক্ষণগণনা দেখা যায় ব্রিটিশ রয়েল কমোট জেটটিকে যখন ঢাকার আকাশে দেখা দেয়। তখন মাটিতে থাকা হাজার হাজার মানুষ স্রষ্টার উদ্দেশ্যে যার যার ধর্মীয় রীতিতে দোয়া করতে থাকেন বিমানটি যেন নিরাপদে মাটিতে নামে। এই ক্ষণগণনা কিছুটা পাওয়া যায় তখন বাংলাদেশে থাকা ভারতীয় কিছু সামরিক কর্মকর্তার স্মৃতিকথায়। কারণ, ইতিহাসে দেখা যায় ওই মুহূর্তটিতে অনেক বড় দুর্ঘটনা ঘটে। সে জন্যে তারা অনেক বেশি সচেতন ছিলেন আগে থেকেই। যাহোক, তারপরে তো সেই মহালগ্ন আসে। অর্থাৎ হাজার বছরের সাধনার স্বাধীন বাংলাদেশের স্রষ্টা তার পা রাখেন তারই সৃষ্ট স্বাধীন ভূমিতে।
গতকাল তাঁর জন্মশতবর্ষে সেই বিশেষ ক্ষণগণনার দিন থেকে জাতি তাঁর জন্মদিনের মহালগ্নের ক্ষণগণনা শুরু করেছে। জাতিকে এই ক্ষণগণনা শুধু নয়, তাঁর জন্মদিন, জন্মবার্ষিকী পালনের মধ্য দিয়ে সেই শপথ নিতে হবে যাতে আগামী প্রজন্মের বাসযোগ্য বাংলাদেশ এই প্রজন্ম গড়ে যেতে পারে। কোনও নেতা তাঁর দেশকে মুক্ত করেন শুধু এজন্যেই যে তারা মুক্তভাবে সব সিদ্ধান্ত নেবে, এবং এক প্রজন্ম তার দেশকে এগিয়ে দিয়ে বাকি পথের জন্যে অন্য প্রজন্মের কাছে হস্তান্তর করে যাবে। এই শতবর্ষের ভেতর দিয়ে সেই আত্মোপলব্ধি করতে হবে যে স্বাধীন দেশ মানেই একটি আধুনিক দেশ সৃষ্টি। প্রতিমুহূর্তে দেশকে আধুনিকতার পথে এগিয়ে নেওয়া। বঙ্গবন্ধুর মতো নেতারা পৃথিবীতে আসেন মানব সম্প্রদায়কে এগিয়ে যাওয়ার পথের আলো দেখাতে। আমরা যেন এই ক্ষণগণনায় সেই আলো প্রত্যেকে নিজ নিজ বুকে জ্বালাতে পারি।
লেখক : সাংবাদিক

LEAVE A REPLY