সংসদে ‘ক্রসফায়ারের দাবি’ বিস্ময়কর

33

এটা সত্যিই অভাবনীয় ও বিস্ময়কর যে ধর্ষণ রোধ করার লক্ষ্যে ধর্ষককে ‘ক্রসফায়ারে হত্যা করার’ মতো নৈরাজ্যবাদী দাবি উত্থাপিত ও আলোচিত হয়েছে জাতীয় সংসদে। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় এই দাবি জানান জাতীয় পার্টির সাংসদ কাজী ফিরোজ রশীদ ও মুজিবুল হক। সরকার ও বিরোধীদলীয় একাধিক সাংসদ ওই দুই সাংসদের বক্তব্য সমর্থন করেন। ধর্ষণ রোধ করতে না পারা নিঃসন্দেহে সাম্প্রতিক কালের ভয়াবহতম এক সামাজিক সংকট। শহর-গ্রাম-মফস্বল, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-হাসপাতাল-বিপণিবিতান থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট-স্টেশন-টার্মিনাল-গণপরিবহন কোথায় ধর্ষণ হচ্ছে না? মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়া এই জঘন্য অপরাধ থেকে সমাজকে মুক্ত করতে না পারার কারণে নারীর অগ্রগতি ও সামাজিক প্রগতি দুটোই মারাত্মক হুমকিতে পড়েছে। কিন্তু সমাজ থেকে একটি অপরাধ নির্মূল করার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘ক্রসফায়ার’ বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের মতো অনিয়মের পথ বেছে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী কাজী ফিরোজ রশীদ জাতীয় সংসদে বলেছেন, “এই মুহূর্তে সমাজকে ধর্ষণমুক্ত করতে হলে ‘এনকাউন্টার মাস্ট’। ধর্ষককে গুলি করে মারতে হবে। একমাত্র ওষুধ পুলিশ ধরার পর ধর্ষককে গুলি করে মেরে ফেলা।” তার পাশ থেকে আরেক সাংসদ আইন করার কথা বললে ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘আইন লাগে না। পুলিশের আইন আছে তো। মাদকের আসামি পরশুদিনও মারা হয়েছে, কোন আইনে মারা হয়েছে?’ এর আগে ধর্ষণ নিয়ে সংসদে আলোচনার সূত্রপাত করেন জাতীয় পার্টির মুজিবুল হক। তিনি বলেন, যে হারে ধর্ষণ বেড়েছে, সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়ে তা ‘কন্ট্রোল’ হচ্ছে না। অনুরোধ থাকবে ধর্ষণের দায়ে মৃত্যুদন্ড দেওয়ার ব্যবস্থা করার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে মুজিবুল হক বলেন, ‘এত ঘটনা ঘটছে মাদকের জন্য, এত ক্রসফায়ার হচ্ছে, সমানে বন্দুকযুদ্ধে মারা যায়, ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ, জঘন্য ঘটনার জন্য কেন একটাও বন্দুকযুদ্ধে মারা যায়নি, আমি জানি না।’ রাষ্ট্রের আইনসভায় আইনপ্রণেতারা কীভাবে প্রকারান্তরে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড সমর্থন করে বক্তব্য দিতে পারেন তা সত্যিই বোধগম্য নয়। বহুল আলোচিত ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘এনকাউন্টার’ যে প্রকৃত অর্থে মোটেই ক্রসফায়ার নয়, বরং ‘টার্গেট কিলিং’ বা সুস্পষ্ট হত্যাকান্ড মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা তা বহুদিন ধরেই বলে আসছেন। সাংসদদের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এখন সেই সত্য আরও প্রতিষ্ঠিত হলো। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে জনমানসে যে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে তা থেকে সমাজের অনেক সাধারণ মানুষ প্রায়শই অপরাধ নির্মূলে এমন অনৈতিক উপায়ের কথা বলে থাকেন। রাজনীতিবিদদেরও বিভিন্ন সময়ে নানা আলাপ-আলোচনা-জনসভায় ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে এমন বক্তব্য দিতে দেখা গেছে। কিন্তু গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে বিচার ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে কোনো বাহিনী বা কর্তৃপক্ষেরই বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের পথ অনুসরণ করার সুযোগ নেই। সাংসদ বা কোনো নাগরিকেরও এমন কোনো বেআইনি পন্থাকে সমর্থন করার সুযোগ নেই। সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে সাংসদরা শুধু সংবিধান মেনে চলারই নয়, সংবিধান অনুসারে রাষ্ট্র পরিচালনার অঙ্গীকার করেছেন। ফলে অনেকের মতো ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের পক্ষে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ সাংসদদের নেই। তাই সংবিধান অসাংবিধানিক পন্থা অবলম্বনের দাবি জানিয়ে এই সাংসদরা শপথ লঙ্ঘন করলেন কি না সেটাও বিবেচনার দাবি রাখে।
দেশে যে ধর্ষণের মহামারী চলছে, সে বিষয়ে সংসদে পুলিশ সদর দপ্তরের একটা প্রতিবেদন থেকে কিছু পরিসংখ্যানও উদ্ধৃত করেছেন জাতীয় পার্টির ওই সাংসদ। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর ১৭ হাজার ৯০০ নারী নির্যাতনের মামলা হয়। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৫ হাজার ৪০০ জন। ১৮৫টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। আগের বছর ২০১৮ সালে ধর্ষণের সংখ্যা ছিল ৭২৭। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সাংসদরা ধর্ষণ রোধের উপায় খুঁজতে এবং কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারকে চাপ প্রয়োগ করবেন সেটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো সাংসদরা কঠোর পদক্ষেপের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগের অধিকতর সক্রিয়তার দাবি না জানিয়ে অসাংবিধানিক উপায় অবলম্বনের দাবি তুলছেন। তবে এই আলোচনায়, ‘পুলিশের কোন আইনে মাদকের আসামি মারা হয়েছে’ বলে সাংসদ ফিরোজ রশীদ যে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা সব ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড বন্ধ করাটা জরুরি। বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করে সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারার বিপদ এখানেই। একটি মিথ্যা যেমন অগণিত মিথ্যার জন্ম দেয়, তেমনি একটি অপরাধ অগণিত অপরাধের জন্ম দেয়। সমাজের একাংশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডকে সমর্থন করার যে মানসিকতা লক্ষ করা যাচ্ছে, সম্ভবত তারই দৃষ্টান্ত দেখা গেল জাতীয় সংসদে। দেশকে এখান থেকে ফিরিয়ে আইনের শাসন ও বিচারিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

LEAVE A REPLY