জেনারেল কাসেম সোলেমানি হত্যাকান্ড : ‘ইসলামপন্থার’ রাজনীতির গভীরতম সঙ্কট

38

সাঈদ ইফতেখার আহমেদ
ইরানের ইসলামী বিপ্লবী রক্ষী বাহিনীর অন্তর্গত কুদস বাহিনীর কমান্ডার, মেজর জেনারেল কাসেম সোলেমানি ৩ জানুয়ারী মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হন। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাকে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির পর সবচেয়ে প্রভাবশালী মনে করা হতো।
রক্ষী বাহিনী গঠন করা হয় ইসলামী বিপ্লবের পরপরই, ১৯৭৯ সালের ২২ এপ্রিল। এটি ইরানের সেনাবাহিনীর শাখা হলেও এর মূল কাজ বিপ্লবকে এবং ইসলামিক রিপাবলিককে রক্ষা করা। এ লক্ষ্যে তাদের উপর দায়িত্ব বর্তেছে বহিঃশত্রুর আক্রমণ, সেনা অভ্যুত্থান এবং সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন ঠেকানো।
রক্ষী বাহিনীর একটা ইউনিট হল কুদস বাহিনী, যার আনুমানিক সদস্য সংখ্যা ১০ থেকে ২০ হাজার। এর কার্যকলাপের ধরণ অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ-এর মত। এ কুদস বাহিনী পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকে লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজার হামাস, পশ্চিম তীরের ইসলামিক জিহাদ, ইয়েমেনের হুতি, ইরাক, সিরিয়া এবং আফগানিস্তানের বিভিন্ন শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোকে।
জেনারেল সোলেমানির দায়িত্ব ছিল মূলতঃ দুটি। প্রথমতঃ মধ্যপ্রাচ্যের শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলিতে ইরানের মত ‘ইসলামী বিপ্লব’ সংগঠিত করতে সহায়তা করা পশ্চিমা সমালোচকদের ভাষায় যেটা শিয়া বিপ্লব রফতানী। দ্বিতীয়তঃ অন্যান্য মুসলিম প্রধান দেশ এবং অঞ্চলের সুন্নি ‘ইসলামী’ মিলিশিয়া বাহিনী এবং দলগুলির সাথে যোগাযোগ বৃদ্ধি করা। এর সব কিছুর মূল লক্ষ্য হচ্ছে সৌদি প্রভাবকে ক্ষুন্ন করে ইসলামী দুনিয়ায় ইরানকে নেতৃস্থানীয় আসনে প্রতিষ্ঠা করা।
আধুনিক বিশ্বে ‘ইসলামী বিপ্লবের’ ধারণা আনেন মুসলিম ব্রাদারহুডের হাসান আল বান্না, সাইয়্যেদ কুতব এবং জামায়াতে ইসলামীর সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদুদি। তারা সবাই সুন্নি মাজহাবের অন্তর্গত ওয়াহাবি/সালাফি ব্যাখ্যা দ্বারা অনুপ্রাণিত। ‘ইসলামী বিপ্লবের’ ধারণা তারা প্রথম আনলেও বাস্তবে দেখা গেল এ বিপ্লব হল শিয়া প্রধান একটি রাষ্ট্রে।
এ বিপ্লব সুন্নি/ওয়াহাবি “ইসলামপন্থী’ দলগুলোকে ঈর্ষান্বিত করলেও তারা একই সাথে আশান্বিত হয়ে উঠে এ ভেবে যে, আধুনিক বিশ্বে ‘ইসলামী’ বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। শিয়ারা যেহেতু করতে পেরেছে, সেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নি প্রধান দেশগুলিতে এ ধরনের বিপব সংগঠিত করতে না পারবার কোনো কারণ নেই। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র।
দীর্ঘ সময় পার হবার পর সুন্নি/ওয়াহাবি ‘ইসলামপন্থীরা’ প্রথম সফলতা পেলেন আফগানিস্তানে। প্রথমে মুজাহেদিন এবং পরে তাদের হটিয়ে ক্ষমতায় আসল তালেবানরা। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণ এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক তাদের ক্ষমতাচ্যুত হবার পর ইরানের শিয়া বিপ্লবের সাথে সুন্নি/ওয়াহাবি ‘ইসলামপন্থীদের’ একটি বড় দাগের পার্থক্য বিশ্ববাসীর চোখে ধরা পড়ল।
ইরানে শিয়া ‘ইসলামপন্থীরা’ যেখানে বিল্পব করলেন পাশ্চাত্যকে চ্যালেঞ্জ করে সেখানে সেই পাশ্চাত্যের সহায়তা নিতে হল মুজেহেদিনদের ক্ষমতায় আসতে। এ মুজাহেদিন থেকেই পরবর্তীতে তালেবানরা বেরিয়ে আসে। এর মধ্যে দিয়ে গুণগতভাবে শিয়া এবং সুন্নি/ওয়াহাবি ‘ইসলামপন্থীদের’ মাঝে বড় একটা পার্থক্যের জায়গা স্পষ্ট হয়ে উঠে।
ফলে নতুন করে আবার অনেকের চোখে ধরা পড়ে যে, শিয়া ‘ইসলামপন্থী’ দল এবং গ্রুপগুলো পাশ্চাত্যবিরোধী। এর বিপরীতে সুন্নি/ওয়াহাবি ‘ইসলামপন্থীরা’ মুখে বিরোধীতা করলেও বাস্তবে তারা পাশ্চাত্যের সাহায্য ও সমর্থনের উপর নির্ভরশীল। পাশ্চাত্যের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে চলতেও তারা আগ্রহী।
এ আগ্রহের বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে উঠে যখন বাংলাদেশে জামায়াতের কিছু নেতাকে যুদ্ধাপরাধের মুখোমুখি করানো হয়, তখন তাদের বাঁচাবার জন্য জামায়াত নেতৃত্বকে হন্যে হয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের মুখাপেক্ষী হতে দেখা যায়। শুধু জামায়াত নয়, মুসলিম ব্রাদারহুডসহ অন্য সুন্নি/ওয়াহাবি ‘ইসলামপন্থী’ দল এবং গ্রুপগুলিকেও নানাভাবে পাশ্চাত্যের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং সেসমস্ত দেশে আসা যাওয়া ও চিকিৎসা সুবিধা নিতে দেখা যায়।
শীতল যুদ্ধকালীন সময়ে একমাত্র ইসরায়েল ছাড়া অন্য কোনো ইস্যুতে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পাশ্চাত্যের সাথে সুন্নি/ওয়াহাবি ‘ইসলামপন্থীদের’ ভিন্নমত দেখা যায়নি। এ ভিন্নমত না থাকবার কারণে তাদেরকে একদিকে যেমন ভিয়েতনামে মার্কিন যুদ্ধের বিরোধীতা করতে দেখা যায় নাই, তেমনি বিরোধীতা করতে দেখা যায় নাই ১৯৭১ সালের বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানের গণহত্যার প্রতি আমেরিকার সমর্থনের।
এ দুটো দেশের একটিতে সরাসরি মার্কিন হস্তক্ষেপ এবং অপরটিতে সমর্থনে ৩০ লক্ষ করে মোট ৬০ লক্ষ লোক নিহত হয়। এর একটি মুসলিম প্রধান। নিহত ৩০ লক্ষ জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ সুন্নি মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও সারা বিশ্বের সুন্নি ‘ইসলামপন্থী’ দলগুলি পাকিস্তান এবং মার্কিন নীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বিস্ময়করভাবে চুপ থাকে।
এ সমস্ত কিছুর ফলে ষাট, সত্তর, আশির দশকগুলোতে অধিকাংশ মুসলমানের মনে এ ধারণা জন্ম লাভ করে যে সুন্নি/ওয়াহাবি ‘ইসলামপন্থী’ দলগুলি আসলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পাশ্চাত্যের ক্রীড়নক হিসাবে কাজ করছে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং কমিউনজমকে ঠেকানোর জন্য। সে সময় বাংলাদেশের জামায়াতসহ অন্যান্য দেশে এ সমস্ত দলের মাঠের বক্তৃতার একটা বড় অংশ জুড়েই থাকত সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং কমিউনিজম বিরোধীতা।
সুন্নি/ওয়াহাবি ‘ইসলামপন্থীদের’ পাশ্চাত্যের কাঁধে সওয়ার হয়ে তাদের অনুকূলে রাজনীতি করবার ফলে মিসরের ব্রাদারহুড এবং আরো দুই তিনটি জায়গা ছাড়া বেশিরভাগ মুসলিম প্রধান দেশে তারা তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি। ব্রাদারহুড জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসলেও সামরিক অভ্যুত্থানে আবার তাদের ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়। ক্ষমতা হারাবার পর তারা জনগণকে সাথে নিয়ে ক্ষমতা দখলকারী জেনারেল আব্দেল ফাত্তাহ আল সিসির বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়।
এ ব্যর্থ হবার অন্যতম কারণ হচ্ছে এ ব্রাদারহুডেরও বিভিন্ন সময়ে পাশ্চাত্যের সাথে যোগাযোগ রেখে চলা। পাশ্চাত্যের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখবার ফলে এ সমস্ত ‘ইসলামপন্থী’ দাবিদাররা আসলেই কতটা ইসলামের প্রতি নিবেদিত, সে প্রশ্ন সুন্নি মুসলমানদের বড় অংশের মাঝে সব সময়ই দেখা গেছে।
অপরদিকে, পাশ্চাত্যের কাঁধে সওয়ার না হবার ফলে শুধু ইরানেই নয়, লেবানন, ইয়েমেন, বাহরাইনসহ শিয়া প্রধান রাষ্ট্রগুলিতে শিয়া ‘ইসলামপন্থী’ দলগুলি ব্যাপক জনপ্রিয়। এমনকি পাকিস্তানের শিয়া সংগঠনগুলোরও তাদের দেশের শিয়াদের উপর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।
ইরানসহ সমস্ত শিয়া ‘ইসলামপন্থী’ সংগঠনগুলো শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্যের বিরোধীতা করেই তাদের রাজনীতি অগ্রসর করেনি একই সাথে অত্যন্ত জোরালোভাবে তারা সৌদি রাজতন্ত্রের বিরোধীতাও করে আসছে। কিন্তু সুন্নি/ওয়াহাবি ‘ইসলামপন্থীরা’ ইসলামে নিষিদ্ধ রাজতন্ত্রের বিষয়ে যেমন নীরব, তেমনি নীরব সে দেশের এলিট সমাজের ভোগ বিলাসী জীবন যাপনের বিষয়েও।
ট্র্যাডিশন ভেঙ্গে সৌদি যুবরাজ সালমান যখন দেশটিকে পাশ্চাত্যের আদলে আধুনিকায়ন করতে চাচ্ছেন সে বিষয়েও সুন্নি/ওয়াহাবি ‘ইসলামপন্থীদের’ কিংকর্তব্যবিমূড় হওয়া ছাড়া আর কোনো ভূমিকায় দেখা যায় না। মুসলিম উম্মাহ নিয়ে বক্তৃতা বিবৃতিতে সদা সরব হলেও বাংলাদেশসহ বিভিন্ন মুসলিম প্রধান দেশগুলি থেকে যাওয়া নারী গৃহ শ্রমিকরা যখন সৌদি আরবে যৌন নিপীড়নের শিকার হন, অথবা চূড়ান্ত অমানবিকতার শিকার বহু বিদেশী মুসলিম শ্রমিক যখন প্রতি বছর লাশ হয়ে দেশে ফেরেন, তখনও সুন্নি/ওয়াহাবি ‘ইসলামপন্থীরা’ হয় চুপ থাকেন, নাহয় মিডিয়ার প্রচার বলে উড়িয়ে দিয়ে সৌদি সরকারের পক্ষেই সাফাই গান।
বস্তুত, এদের ভূমিকা সোভিয়েত ইউনিয়নের সময় সিপিবিসহ সারা বিশ্বে ‘মস্কোপন্থী’ দলগুলো যে ভূমিকা পালন করেছে অনেকটা তার মত। ‘মস্কোপন্থীরা’ তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন যা করত তার সবকিছুরই সাফাই গাইতেন অথবা মিডিয়ার প্রচার বলে উড়িয়ে দিতেন।
‘মস্কোপন্থীরা’ যেমন স্তালিন থেকে গর্বাচেভ, সব সোভিয়েত নেতাকেই সমর্থন দিয়ে গেছেন, তেমনি সুন্নি/ওয়াহাবি ‘ইসলামপন্থীরাও’ সব সৌদি বাদশাহকেই সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। ‘মস্কোপন্থীরা’ যেমন মনে করতেন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরোধীতা করা মানে কমিউনিজমের বিরোধীতা করা, তেমনি সুন্নি/ওয়াহাবি ‘ইসলামপন্থীরাও’ মনে করছেন সৌদি আরবের কোনো কিছুর বিরোধীতা করা মানেই ইসলামের বিরোধীতা করা। তখন যেমন জনমনে ধারণা ছিল ‘মস্কোপন্থী’ দলগুলি সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে আর্থিক সহায়তা পায়, তেমনি সুন্নি/ওয়াহাবি ‘ইসলামপন্থীদের’ সম্পর্কেও মানুষের ধারণা, তারা সৌদি আরব থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা পান।
কিন্তু অপরদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পাশ্চাত্য এবং সৌদি আরবের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই আপোষহীন অবস্থানের ফলে ইরানের শিয়া ‘ইসলামী’ বিপ্লবের প্রতি অনেক সুন্নি মুসলমানের আগ্রহ শুরু থেকেই পরিলক্ষিত হয়। তাদের কাছে মনে হয়েছে, এ বিরোধীতার জায়গাটা অকৃত্রিম; লোক দেখানো রাজনৈতিক না।
এর বিপরীতে, সুন্নি/ওয়াহাবি ‘ইসলামপন্থীদের’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পাশ্চাত্যবিরোধী ভূমিকা অনেক মুসলমানের কাছে লোক দেখানো ঠেকেছে। তারা যেটা বুঝতে পারছেন না সেটা হল মার্কিনবিরোধী হলে সুন্নি/ওয়াহাবি ‘ইসলামপন্থীরা’ যুক্তরাষ্ট্র এবং পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দূতাবাসের অনুষ্ঠানগুলিতে আমন্ত্রণ কেন পাচ্ছেন।
হিজবুল্লাহ, হুতি, অথবা বাহরাইন এবং পাকিস্তানের শিয়াপন্থীদের জন্যতো এটা কল্পনাতীত ব্যাপার। আর ইরানের সাথেতো যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্যের কিছু দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কই নেই। তেমনি এটা কল্পনাতীত ব্যাপার বামপন্থী দলগুলির ক্ষেত্রেও। উদাহারণস্বরূপ বলা যায়, বাংলাদেশে এটি কল্পনা করাও সম্ভব না যে, সিপিবিকে আমন্ত্রণ জানান হয়েছে মার্কিন দূতাবাসের কোন অনুষ্ঠানে।
ফলে, সুন্নি/ওয়াহাবি ‘ইসলামপন্থীদের’ সার্বিক রাজনৈতিক অবস্থান এক ধরণের স্ববিরোধিতা, সুবিধাবাদিতা এবং দ্বিচারিতাপূর্ণ বলে অধিকাংশ মুসলমানের ধারণা। আর এ ধারণার শক্তিশালী উপস্থিতির ফলেই দুই একটি জায়গা ব্যতীত বিশ্বের কোনো রাষ্ট্রেই তারা মূলধারা হয়ে উঠতে পারেনি। তেমনি পারেনি শিয়াদের মাঝে এ রাজনৈতিক আন্দোলনের কোনো আবেদন তৈরি করতে যেটা কিনা ইরানের বিপ্লব করতে পেরেছে সুন্নিদের মাঝে।
ইরান এ আবেদন তৈরি করতে পারবার ফলেই জেনারেল সোলেমানি হত্যাকান্ডের শিকার হবার পর শুধু শিয়াদের মাঝে নয়, সারা দুনিয়ার সুন্নি মুসলমানের মাঝে এর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। এ হত্যাকান্ড তাদেরকেও শোকগ্রস্ত করে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে সুন্নি/ওয়াহাবি ‘ইসলামপন্থীদের’ এর প্রতিবাদ করাতো দূরের কথা, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং সৌদি আরবের সাথে সুর মিলিয়ে এ হত্যাকান্ডকে সমর্থন করতে দেখা যায়।
এর মধ্যে দিয়ে সুন্নি মুসলমানদের আশা, আকাক্সক্ষা, চিন্তাধারার সাথে সুন্নি/ওয়াহাবি ‘ইসলামপন্থী’ দলগুলোর সমর্থকদের চিন্তাধারার বড় দাগের পার্থক্য আবার নতুন করে স্পষ্ট হয়েছে। সুন্নি মুসলমানরা যেখানে জেনারেল সোলেমানিকে দেখছেন মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা, ইসরায়েল এবং সৌদি প্রভাবের বিরুদ্ধে একজন লড়াকু যোদ্ধা হিসাবে, সেখানে সুন্নি/ওয়াহাবি ‘ইসলামপন্থীরা’ তাকে দেখছেন লক্ষ লক্ষ সুন্নি হত্যাকারী হিসাবে। তারা তাকে সুন্নি হত্যাকারী বলছেন কেননা সৌদি আরবও তাই বলছে।
সৌদি আরবের এটা বলবার কারণ জেনারেল সোলেমানি ইরাকে ইসলামিক স্টেট বা আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সরাসরি ভূমিকা পালন করেছেন। সিরিয়া থেকে তাদের নির্মূলে তার দেশ ইরান, সিরিয়া ও রাশিয়াকে সাহায্য করেছে। ‘ইসলামী বিপ্লবের’ পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব ইরানের প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন। সেখানকার রাজ পরিবার মনে করছে ইরানের প্রভাব মুসলমানদের মাঝে যত বৃদ্ধি পাবে, তত সেটা রাজতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে উঠবে। তাই ইরানকে ঠেকাবার জন্য সৌদি আরব এবং ইসরায়েল দুই তরফ থেকেই আইএসের উত্থানকে আশির্বাদস্বরূপ মনে করা হয়েছে।
সুন্নি/ওয়াহাবি ‘ইসলামপন্থীরা’ আইএসকে দেখেছেন ইসলামী আন্দোলনের অংশ হিসাবে। ইরাক, সিরিয়াতে আইএসের উথানের সময় তাদের সমর্থকরা এ ‘ধর্মভিত্তিক’ রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীটির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত না হলেও নানাভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একে সমর্থন যুগিয়ে গেছেন। তত্ত্বগতভাবেও আইএসের সাথে সুন্নি/ওয়াহাবি ‘ইসলামপন্থী’ দলগুলোর বড় দাগে কোনো পার্থক্য নেই। পার্থক্য মূলত রাজনৈতিক লক্ষ্য হাসিলের কৌশলের জায়গাটিতে। কিন্তু আইএস প্রায় নির্মূল হয়ে যাওয়া, এবং এ নির্মূলে জেনারেল সোলেমানি বড় ভূমিকা পালন করবার ফলে তাদের সমস্ত ক্ষোভ যেমন তার উপর গিয়ে পড়ে, তেমনি এটা তাদেরকে রাজনৈতিকভাবে হতাশাতেও নিমজ্জিত করে।
এ হতাশা আরো গভীরতর হয় যখন তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাসের সাথে বাস্তব জীবনের সংঘাত দেখতে পাওয়া যায়। তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাসের মূল ভিত্তিভূমি হলো মুসলিম উম্মাহর ধারণা। অর্থাৎ, সারা দুনিয়ার মুসলিমরা এক, তাদের স্বার্থও এক। তারা সবাই একই সুরে কথা বলবেন, একই লক্ষ্যে কাজ করবেন। কিন্তু বাস্তবে এসে যখন দেখা যায় তারা যে দেশটিকে আইকন মনে করেন সেই সৌদি আরব কাশ্মীর নীতির পরেও ভারতের হিন্দুত্ববাদী মোদী সরকারের সাথে দহরম মহরম করছে, অথবা উইঘুরে মুসলিমরা নিপীড়িত হলেও সে নিপীড়নকে অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে শক্তভাবে চীনকে সমর্থন দিচ্ছে তখন এ সবকিছুর সাথে মুসলিম উম্মাহর ধারণা মিলানো তাদের জন্য কঠিন হয়ে যায়।
এ মিলাতে না পারবার মূল কারণ আধুনিক জটিল আন্তর্জাতিক রাজনীতি যে রাষ্ট্র-কেন্দ্রিক জাতীয়াতাবাদী ধারণার উপর গড়ে উঠেছে, সে ধারণাকে উপেক্ষা করা বা বুঝতে না পারা।
শুধু ‘ইসলামপন্থীরা’ নয়, এ ধারণাকে উপেক্ষা করেছেন স্বয়ং লেনিনের মত বামপন্থীরাও। ‘ইসলামপন্থীদের’ মত তারাও ধরে নিয়েছিলেন সারা দুনিয়ার শ্রমিক শ্রেণি এক। তারা সবাই এক সুরে কথা বলবেন। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যখন বাঁধল, হতাশ হয়ে লেনিন লক্ষ্য করলেন, শ্রমিক শ্রেণি এক না হয়ে নিজ নিজ রাষ্ট্রের পক্ষে দাঁড়িয়ে গেছে।
বস্তুত আধুনিক বিশ্বে জাতীয়তাবাদ এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা সঠিকভাবে অনুধাবণ করতে পারবার ব্যর্থতা যেমন বাম রাজনীতিকে সঙ্কটে নিমজ্জিত করেছে, তেমনি ‘ইসলামপন্থীদের’ রাজনীতির সঙ্কটও গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে। এ তাত্ত্বিক সঙ্কটের সাথে রাশিয়ার পুনুরুত্থান তাদেরকে বিশ্ব রাজনীতিতে ক্রমশ প্রান্তের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন, ৯/১১ ইত্যাদির ফলে অনেকে মনে করতে শুরু করেছিলেন যে বিশ্ব রাজনীতির মূল দ্বন্দ্ব হবে পশ্চিমা গণতন্ত্র বনাম ‘ইসলামপন্থার’ রাজনীতি। রাশিয়ার পুনরুত্থানের ফলে সে জায়গাটা দখল করে নিয়েছে রাশিয়া-চীন মৈত্রী বনাম মার্কিন নেতৃত্বে পশ্চিমা বিশ্ব।
এ দ্বন্দ্বে ‘ইসলামপন্থীদের’ ভূমিকা নেমে এসেছে কোনো একটি পক্ষকে সমর্থন দেওয়ার মাঝে। সুন্নি/ওয়াহাবি ‘ইসলামপন্থীরা’ কাসেম সোলেমানির হত্যাকান্ডে উল্লাস করে প্রাকাশ্যেই জানিয়ে দিয়েছেন, এ দ্বন্দ্বে শীতল যুদ্ধকালীন সময়ে তাদের মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথেই তারা আছেন।
আর এ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই যেহেতু আয়াতুল্লাহ খামেনীকে বিপ্লব করতে হয়েছে, সেহেতু ইরান এ দ্বন্দ্বে আমেরিকা, পাশ্চাত্য এবং সৌদিবিরোধী জোরালো ভূমিকায়
থাকবে এটাই স্বাভাবিক। এ দ্বন্দ্বে তারা রাশিয়া, চীনকে পাশে পেলেও খোদ ভিতর থেকে আবার চ্যালেঞ্জ উত্থাপিত হচ্ছে শিয়াপন্থী সরকারের বিরুদ্ধে।
শিয়াপন্থী ইরানে সুন্নি এবং ইহুদীদের অবস্থা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের মত, যেমনটা শিয়াদের অবস্থা সৌদি আরবে। সৌদি আরবের তুলনায় ইরানে নারীরা ভালো ভূমিকা পালন করতে পারলেও, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কিছু উচ্চ পদ তাদের জন্য নিষিদ্ধ। ফলে, তারাও নিজেদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক মনে করছেন।
ইরানের নারীরা পাশ্চাত্যের মুসলিম নারীদের মত তাদের দেশেও হিজাবকে বাধ্যতামূলক না রেখে ‘চয়েস’ হিসাবে ঘোষণা করবার দাবি জানাচ্ছেন। যে বিষয়টা তাদেরকে বিস্মিত এবং হতাশ করছে সেটা হল, পাশ্চাত্যে মুসলিম নারীরা হিজাবকে ‘চয়েস’ বললেও, কেন তারা ইরানের নারীদের ‘চয়েস’ ঘোষণার দাবিকে সমর্থন করছেন না।
এসব কিছুর সাথে সীমিত গণতন্ত্র, সীমিত বাক স্বাধীনতা এবং ক্রমাগত মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফলে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সঙ্কট জনগণের ক্ষোভকে অনেকটা গণবিস্ফোরণের অবস্থায় নিয়ে গেছে। সোলেমানি হত্যাকান্ডের প্রতিশোধ হিসাবে মার্কিন ঘাঁটিতে মিসাইল নিক্ষেপ করে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটিয়ে ইরান এ ক্ষোভকে আপাতত প্রশমিত করতে চাইলেও, ভুল ক্রমে ইউক্রেনের বিমানে মিসাইল ছুঁড়বার ফলে সেটি এখন বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জনগণ “ইসলামপন্থী’ দাবিদার সরকারকে মিথ্যাবাদী অভিহিত করে সর্বোচ্চ নেতা খামেনির পদত্যাগ দাবি করছেন যেটা দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিরল। সোলেমানি হত্যাকান্ড শুধু সুন্নি/ওয়াহাবি ‘ইসলামপন্থীদের’ রাজনৈতিক সঙ্কটের গভীরতাকে নতুন করে অঙ্গুলি নির্দেশ করেনি, এটি একই সাথে শিয়াপন্থী রাজনীতির ভিতও কাঁপিয়ে দিয়েছে।
লেখক : শিক্ষক, স্কুল অব সিকিউরিটি অ্যান্ড গ্লোবাল স্টাডিস, আমেরিকান পাবলিক ইউনিভার্সিটি সিস্টেম, পশ্চিম ভার্জিনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র

LEAVE A REPLY