মুহূর্তের সীমা পেরুনো সাংবাদিকতা

35

 

পলাশ দত্ত
সহজে বললে, পৃথিবীতে ইন্টারনেট এসেছে বলেই ডেটা সাংবাদিকতা। পরিসরের সংকট ইন্টারনেটে নেই। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে চালু হয়েছে মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতা। এসেছে লং ফর্ম ডিজিটাল স্টোরি। তবে শুধু ইন্টারনেটই নয়। সাংবাদিকতার নতুনতর ধরনগুলির উদ্ভাবন ও প্রসারের মূলে রয়েছে আরেকটি বস্তু। তা হলো স্মার্ট মোবাইল ফোন। স্মার্ট ফোনে ভর করে এসেছে নাগরিক সাংবাদিকতা।

ইন্টারনেট ও স্মার্ট ফোন- এই দুইয়ে মিলে পৃথিবীতে যে- বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছে তাকে আমরা চিহ্নিত করেছি চতুর্থ শিল্প বিপ্লব নামে। এই চতুর্থ শিল্প বিপ্লব পৃথিবীজুড়ে নানা কিছু বদলে দিচ্ছে, নানা কিছু বদলে দেয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সাংবাদিকতায়ও সম্ভাবনার সঞ্চার ঘটাচ্ছে এই বিপ্লব। এ যুগে সাংবাদিকতায় নানা সম্ভাবনার একটি হলো ডেটা সাংবাদিকতা।

সাংবাদিক/সংবাদমাধ্যমের কাজ হলো মানুষকে বর্তমান ঘটনা সম্পর্কে জানানো। এই সাংবাদিকতা নানা বিবর্তনের মধ্যে এগিয়েছে। কিন্তু মানুষকে ঘটনা জানানোর মৌল দায়িত্বের কোনো বদল এখনো ঘটেনি । ইন্টারনেটের যুগে এসে এই ঘটনা জানানোর সুযোগ আরো বিস্তার লাভ করেছে। পত্রিকা টিভির অনলাইন সংস্করণ মুহূর্তের ঘটনা মুহূর্তে মানুষকে জানার সুযোগ করে দিচ্ছে। একই সঙ্গে ‘মুহূর্তের বাইরে গিয়ে’ ঘটনাকে বা ঘটনার সামগ্রিকতাকে প্রকাশ/জানানোর সুযোগও তৈরি হয়েছে। ‘মুহূর্তের সীমা পেরুনো’ এই খবর/কনটেন্ট প্রচলিত সাংবদিকতায় তৈরি হয় অপ্রকাশিত তথ্য, ওয়াকেবহাল/বিশেষজ্ঞের মতামত/কথোপকথন ইত্যাদিকে ভিত্তি করে। ইন্টারনেটের ক্রমবিস্তার এই ‘মুহূর্তের সীমা পেরুনো’ সাংবাদিকতায় বড় ধরনের একটি বৈশিষ্ট্য সংযোজন করে দিয়েছে। প্রচলিত পদ্ধতিতে সম্ভব নয় এমন সব সংবাদ তৈরির সুযোগও করে দিয়েছে ইন্টারনেট। ‘মুহূর্তের সীমা পেরুনো’ সেই বড় বৈশিষ্ট্য ও নতুন ধরনের সংবাদ তৈরির প্রক্রিয়াই হলো ডেটা সাংবাদিকতা।

এই সাংবাদিকতা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য/মত নির্ভর নয়। এক্ষেত্রে ডেটাই সংবাদের মর্মার্থ তুলে ধরে। ফলে ডেটার সঠিক উৎস নির্বাচন করা গেলে সংবাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব বা পক্ষদুষ্ট হওয়ার অভিযোগ থেকে মুক্ত থাকা যায়। আর ডেটা ভিত্তিক প্রতিবেদন যে কোনো বিষয়েই তৈরি করা সম্ভব। ইন্টারনেটের এই যুগে ডেটা সংগ্রহ কঠিন কোনো কাজ নয়। বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে বিপুল পরিমাণ ডেটা উন্মুক্ত রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) নিয়মিত তাদের ওয়েবসাইটে বিভিন্ন জরিপ ফল প্রকাশ করে থাকে। শিক্ষা বিষয়ক ডেটার জন্য রয়েছে বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর ওয়েবসাইট। অর্থনীতি বিষয়ক ডেটার জন্য রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট। এর পাশাপাশি বিশ্ব ব্যাংক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, অভিবাসন বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইওএম, ইউনেস্কো, আইএলও- এসব আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিটিরই পৃথক ডেটা পোর্টাল রয়েছে। সেখান থেকে ডেটা সংগ্রহ করে ডেটা রিপোর্ট তৈরি করা যায়।

বাংলাদেশে গত এক দশকে বিপুল পরিমাণ ডেটা উন্মুক্ত হয়েছে। এক দশক আগেও নানা বিষয়ে তথ্য জানতে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সশরীরে যেতে হতো। যাওয়ার পরও তথ্য-উপাত্ত সেখানে সহজলভ্য ছিল না। বিপুল পরিমাণ সময় ব্যয় করে কিছু তথ্য হয়ত পাওয়া যেত। ইন্টারনেটের বিস্তৃতি তথ্য-উপাত্তকে একেবারে আমাদের হাতের নাগালে এনে দিয়েছে। এখন অফিস-বাসায় বসে কম্পিউটারে ইন্টারনেটে যুক্ত হয়েই বিভিন্ন বিষয়ের ডেটা পাওয়া সম্ভব। সম্ভব তা দিয়ে প্রতিবেদন তৈরি।

যেমন ধরা যাক ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের স্কুলগুলোয় শৌচাগারের ব্যবস্থা নিয়ে একটি প্রতিবেদন। আমরা চাই সহপাঠ সুবিধাসম্পন্ন স্কুলগুলোয় মেয়েদের জন্য পৃথক শৌচাগার আছে কি না তা যাচাই করতে। প্রচলিত পদ্ধতিতে আমরা দৈবচয়ন ভিত্তিতে কয়েকটি স্কুল বেছে নিয়ে সেগুলোতে গিয়ে খোঁজ নিতে পারি। তার ভিত্তিতে মোট স্কুলসংখ্যা মিলিয়ে হিসেব করে একটি ‘ধারণা’ তৈরি করতে পারি। সেই ‘ধারণা’র ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদনও তৈরি করতে পারি হয়ত।

কিন্তু ডেটা ব্যবহারের মানসিকতা তৈরি হলে শৌচাগার বিষয়ে আমার প্রতিবেদন তৈরি করতে পারি ডেটা ব্যবহার করে। এবং উন্মুক্ত ডেটা ব্যবহার করেই তা সম্ভব। ফলে দৈবচয়ন বা অন্য কোনো পদ্ধতিতে বাছাই করা কয়েকটি স্কুলের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করতে হয় না। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সহপাঠ সুবিধাসম্পন্ন স্কুল রয়েছে ২৮৬টি। স্কুলগুলোর অসংখ্য ডেটা বিস্তারিতভাবে পাওয়া সম্ভব ব্যুরোর ওয়েবসাইট থেকে। সবগুলো স্কুলের শৌচাগার সম্পর্কিত ডেটা নিয়ে সহজেই জানা সম্ভব কতগুলো স্কুলে মেয়েদের জন্য পৃথক শৌচাগার নেই। ব্যানবেইসের এই ডেটার ভিত্তিতে তৈরি একটি ডেটা প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রায় সহপাঠ স্কুলগুলোর প্রায় ১৫ শতাংশে মেয়েদের জন্য পৃথক শৌচাগার নেই। ব্যানবেইসের ডেটা ব্যবহার করে শিক্ষা বিষয়ে দিক-নির্দেশনা দিতে পারে এমন প্রতিবেদন তৈরি করা সম্ভব। এসব প্রতিবেদন শিক্ষা বিষয়ক সাংবাদিকতায় নতুন মাত্রাও যুক্ত করতে পারে।

ওয়েবসাইটে ডেটা উন্মুক্ত করার পাশপাশি নানা জরিপের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে বইও প্রকাশ করে থাকে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। করে থাকে সংবাদ সম্মেলন। যেমন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিক্স’ (এসভিআরএস) জরিপ। ব্যুরো প্রতিবছর এই জরিপটি পরিচালনা করে থাকে। জরিপ শেষে এর ফল নিয়ে একটি সংবাদ সম্মেলনও করে ব্যুরো।এতে সচরাচর বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির বিষয়টিতে গুরুত্ব দেয় ব্যুরো। ফলে সংবাদ সম্মেলনের দিন সব অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও স্যাটেলাইট চ্যানেলে গড় আয়ু বিষয়ক খবরটিই প্রকাশ হয়, প্রাধান্য পায়। একইভাবে পরদিন দেশের সব মুদ্রিত সংবাদমাধ্যমে ওই বিষয়টিই মূল বিবেচ্য হয়ে দাঁড়ায়।

অথচ বিবিএসের ওই প্রতিবেদনটি শদুয়েক পৃষ্ঠার হয়ে থাকে। এতে থাকে বাংলাদেশের মানুষের খাওয়ার পানির উৎস থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়ের ডেটা। কিন্তু সংবাদমাধ্যমগুলি বিবিএসের সংবাদ সম্মেলনের মূল কেন্দ্রবিন্দুতেই আটকে থাকে। ফলে বাংলাদেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার নানা সূচক নির্দেশক এই বিপুল ডেটার অন্তর্নিহিত অর্থ আর মানুষের কাছে পৌঁছয় না। ডেটা ভিত্তিক সংবাদ একটি সংবাদমাধ্যমের সংবাদে বৈচিত্র্য যোগ করে। সংবাদ সংগ্রহের প্রচল পদ্ধতিতে সংবাদ তৈরি সম্ভব নয় এমন সব বিষয়ে উন্মুক্ত ডেটা ব্যবহার করে সংবাদ তৈরি করা যায়। যেমন ধরা যাক, প্রবাসী বাংলাদেশিদের পেশা। এ বিষয়ে খবর তৈরি করা যায় বিবিএসের এসআইআর প্রতিবেদন ২০১৬ থেকে। একইভাবে নানা খাত নিয়ে ডেটা ভিত্তিক প্রতিবেদন তৈরি করা সম্ভব।

এজন্য চাই প্রথমত সাংবাদিকদের ডেটামুখি মানসিকতা সৃষ্টি। দ্বিতীয়ত ডেটা সাংবাদিকতার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাথমিক স্তরের অনলাইন টুলসের সাথে পরিচিতি। ডেটামুখী মানসিকতা সাংবাদিকদের যেকোনো বিষয়কে ডেটার ভিত্তিতে উপস্থাপনে উৎসাহী করবে। ফলে দৈনন্দিন ইভেন্ট ভিত্তিক খবরকেও তিনি ডেটা সাংবাদিকতার কোনো একটি রূপে প্রকাশ করতে পারবেন। সফল হবেন ইভেন্টকে ভিত্তি করে ডেটা দিয়ে ঘটনার সামগ্রিক রূপ তুলে ধরতে। সক্ষম হবেন ইভেন্টের বাইরে শুধু ডেটার ভিত্তিতে প্রাথমিক পর্যায়ের প্রতিবেদন তৈরিতে।

LEAVE A REPLY