বঙ্গবন্ধুই মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক

0
57

কল্যাণ ডেস্ক : বহুল আলোচিত পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহ হত্যা মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। গত ৮ জানুয়ারি কয়েক দফা পর্যবেক্ষণসহ ২৯ হাজার ৫৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়।
বিচারপতি শওকত হোসেন, বিচারপতি আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি নজরুল ইসলাম তালুকদারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চের বিচারপতিরা বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। বিচারপতি আবু জাফর সিদ্দিকীর বাংলায় লেখা ১৬ হাজার ৫৫২ পৃষ্ঠার পর্যবেক্ষণসহ রায়ে মামলার প্রেক্ষাপট, ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা ও নৃশংসতার চিত্র, প্রায়োগিক ও ব্যবহারিক আইনের প্রয়োগ ও যৌক্তিক বিশ্নেষণের সঙ্গে একমত পোষণ করে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছেন ওই বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি নজরুল ইসলাম তালুকদার।
বিচারপতি আবু জাফর সিদ্দিকীর দেওয়া রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলার মুজিবনগরে বাংলার মুকুটহীন সম্রাট হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী এবং ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামানসহ অন্য জাতীয় নেতাদের মন্ত্রিপরিষদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে আইনানুগ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে শুরু হয় বাংলাদেশের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ।
নবগঠিত প্রবাসী সরকার জেনারেল এমএজি ওসমানীকে রণাঙ্গনের প্রধান (সেনাপ্রধান) নিযুক্ত করে শৃঙ্খলার সঙ্গে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান করা হয়। মুজিবনগর সরকারকে এসপি মাহবুবের নেতৃত্বে ইপিআরের ১২ বাঙালি সৈনিকসহ আনছার সদস্যরা প্রথম গার্ড অব অনার প্রদান করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে স্থান করে নেন।
রায়ে বলা হয়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলেও এর ভিত্তি রচিত হয়েছে ১৯৪৭ সালে তৎকালীন পাক-ভারত উপমহাদেশ বিভক্ত করে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের সময়ে পাকিস্তান নামের রাষ্ট্র গঠনের পর থেকেই। আর এই স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল একটি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি দ্বারা গঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নেতৃত্বে ও কর্তৃত্বে এবং ওই সরকারের রাষ্ট্রপতি ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হয়েছে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে এবং গোড়া থেকেই এ সিদ্ধান্তের নেতৃত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধু।
সংশ্নিষ্টরা বলছেন, রায় প্রকাশের সময়কালও ঐতিহাসিক দিক বিবেচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, চলতি বছর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী (মুজিববর্ষ)।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জাতির উদ্দেশে দেওয়া দিকনির্দেশনামূলক ঐতিহাসিক ভাষণে বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের বাড়ি থেকে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। জাতির পিতার স্বাধীনতার ঘোষণা তৎকালীন ইপিআরের জুনিয়র অফিসার ও জওয়ানরাই ওয়্যারলেসের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দিয়ে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন।
রায়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ রাইফেলসের বর্ণাঢ্য ইতিহাস ভূলুণ্ঠিত করে বাহিনীর কতিপয় উচ্চাভিলাষী সদস্যের ঔদ্ধত্যপূর্ণ মানসিকতা এবং স্বার্থান্বেষী মহলের প্ররোচনা ও উসকানিতে বিডিআরের সদর দপ্তর পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহে ৫৭ নিরস্ত্র সামরিক অফিসারসহ ৭৪ জনকে নৃশংসভাবে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, অস্ত্রাগার লুণ্ঠনসহ সেনা পরিবারের সদস্যদের প্রতি অমানবিক আচরণ ও পাশবিক নির্যাতন চালিয়ে জঘন্য অপরাধ করা হয়েছে। এমন ঘটনা সংঘটনের পর ডিএডি তৌহিদের নেতৃত্বে বিদ্রোহীরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের সময় বাংলাদেশ রাইফেলসের সদস্যরা সত্য গোপন করে সাধারণ ক্ষমা প্রদানের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ওপর চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে ধৃষ্টতা প্রদর্শন করেছে।
রায়ে বিদ্রোহ দমনে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করা হয়েছে। এতে বলা হয়, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা বিনষ্ট করার লক্ষ্যে একটি স্বার্থান্বেষী মহল পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত বাহিনীকে ধ্বংসের চক্রান্ত করেছিল। এটা রুখে দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাষ্ট্রনায়কোচিত পদক্ষেপ ছিল সময়োপযোগী। আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় প্রশিক্ষিত দক্ষ ও সুশৃঙ্খল প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনী দেশের সংবিধান ও গণতন্ত্রের প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও অবিচল আস্থা রেখে চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে দেশবাসীর ভালোবাসা ও সুনাম অর্জন করেছে।
রায়ের পর্যবেক্ষণে ‘ঘটনার পেছনের ঘটনা’ উদ্ঘাটনে একটি তদন্ত কমিশন গঠনের সুপারিশ করেন হাইকোর্ট। পাশাপাশি জাতির সামনে প্রকৃত স্বার্থান্বেষী মহলের চেহারা উন্মোচনের জন্য জনস্বার্থে সরকারকে আইনানুগভাবে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করা হয়।

LEAVE A REPLY