সামাজিক সেবায় হয়রানি ও অনৈতিক লেনদেন

38

ড. মো. ফখরুল ইসলাম
দেশে সাক্ষরতার হার বাড়ছে; এটি বেশ আশাপ্রদ। তবে যে বিষয়টি আশাহত করে চলেছে তা হল, সিংহভাগ শিক্ষিত মানুষজনের মধ্যে আধুনিক জ্ঞান ও চেতনা জাগরণের পরিবর্তে অন্ধকার পথের চোরাগলি অনুসরণের ভয়ংকর প্রবণতা। জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্মেষের এ যুগে বেশিরভাগ শিক্ষিত মানুষের মধ্যে সত্য, ন্যায় ও উদারতা বিকাশের পরিবর্তে স্বার্থপরতা ও অপরকে হয়রানি করার প্রবণতা যেন দিন দিন বেড়েই চলেছে।

শিক্ষিত মানুষের মধ্যে এ অভাববোধ দেখে অল্পশিক্ষিত সাধারণ মানুষ সেগুলো নির্দ্বিধায় অনুসরণ করার জন্য আরও বেশি উৎসাহিত হয়ে পড়ছে। ফলে দেশের শিক্ষিত, অল্পশিক্ষিত, অশিক্ষিত সব মানুষের মধ্যে কাজকর্মে অন্ধকারের চোরাগলি অনুসরণের তৎপরতা সব জায়গায় লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে। এটি আমাদের প্রশাসনিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনে একটি সৎ ও নির্ভীক জীবন গঠনের পথে দিনে দিনে চরম হুমকি হয়ে উঠছে; বিশেষ করে আমাদের ক্ষুদ্র সামাজিক সেবাদান প্রক্রিয়ার পরিসরকে জিম্মি করে দায়িত্বশীলদের সঙ্গে একশ্রেণির পেশাদার দালাল শ্রেণির আবির্ভাব সামাজিক হয়রানির মাত্রাকে তীব্রতর করে তুলেছে।

দায়িত্বশীল সরকারি পেশাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে ভাগবাটোয়ারা করার একটি অপরাধী চক্র তৈরি হয়েছে। দেশি-বিদেশি এজেন্টরা এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে অর্থনীতি ও সমাজনীতির দুর্বলতা আরও বেশি প্রকট করে তুলছে। তাই তো ঘুষ-দুর্নীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে মাদক পাচার, ব্যাংক ডাকাতি, জালনোট তৈরি ইত্যাদিতে সংযুক্ত হয়ে অপরাধের ফাঁদ পেতে জনজীবনকে দুঃসহ করে তুলেছে। সঙ্গে আছে কিছু হলুদ সংবাদমাধ্যমের পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ; যেটি সমাজকে অনাকাঙ্ক্ষিত পথে চালিত করতে সহায়তা করছে।

সামাজিক সেবায় হয়রানি ও অনৈতিকভাবে বিকিকিনি এখন ওপেন সিক্রেট। আমাদের দেশে সামাজিক সেবার সংজ্ঞা ও ধারণা মানুষের কাছে মোটেও স্পষ্ট নয়। সেবাদান প্রক্রিয়ায় দায়িত্বশীলদের কাছেও তা স্পষ্ট নয়। ফলে দায়িত্বশীলরা সামাজিক প্রতিষ্ঠানের কাঠামোর মধ্যে বসে জনসেবা করাকে নিজের ক্ষমতা মনে করে। এটাকে ক্ষমতা ভেবে নিজ ক্ষমতার শ্রেণিবিভাগ করার ভাবনা শুরু হয়। সেখান থেকে জন্ম নেয় স্বজনপ্রীতি, এলাকাপ্রীতি ও দলপ্রীতি।

এ হীন ভাবনার বাইরে স্বাভাবিকভাবে তাদের মস্তিষ্ক কাজ করতে অপারগ হয়ে পড়ে। তাদের পারঙ্গম করতে তদবির নামক প্রক্রিয়ার তৎপরতা শুরু হয়ে যায়। এ থেকে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের জন্য হয়রানি ও অনৈতিক ফাঁদ পাতার কৌশল শুরু হতে থাকে। আর এসব অনৈতিক ফাঁদ পাতার কৌশলের একটি চরম রূপ হল ঘুষ-দুর্নীতির আশ্রয় নেয়া। যথার্থ জবাবদিহিতার কারণে আমাদের সমাজে এ রূপটি অত্যন্ত কদর্যভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ লাভ করেছে। তাই জনসেবার প্রক্রিয়ার পথে-প্রান্তরে যেখানে-সেখানে হয়রানির ফাঁদ পাতা রয়েছে। পানি, বিদ্যুৎ, জমি, থানা, পাসপোর্ট, বিআরটিএ, কোর্ট, শিক্ষা বোর্ড এমনকি হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার দোরগোড়া পর্যন্ত জালের মতো চরম হয়রানির ফাঁদ পাতা রয়েছে।

এসব ফাঁদ কে পেতে রেখেছে? নিশ্চয়ই একশ্রেণির দালাল। দালালরা এটি একা করার সাহস পায় না। এর সঙ্গে যুক্ত আমাদের শিক্ষিত চশমখোর লোকজন। এগুলো দেখভাল করার জন্য যারা দায়িত্বশীল, তাদের দুর্বল ভূমিকা অথবা অনৈতিক যোগসাজশ একশ্রেণির বেআইনি দালালগোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতা করে চলেছে।

এ বেআইনি দালালগোষ্ঠীর দৌরাত্ম্য অফিস-আদালত ও সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে। এরা বড়ই ভয়ংকররূপে আমাদের সমাজ, অর্থনীতি ও পারিপার্শ্বিক সব জায়গায় বিরাজমান। তাই এদের মাধ্যমে ঘুষ দিয়ে সব সেবা কিনতে হয়। সরকারে কিছু লোক হা-পিত্যেশ করে নিত্যনতুন সেবাদান ব্যবস্থা চালু করলেও এ দালালরা সেটি বাস্তবায়ন করতে দিতে চায় না।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, স্কুলে স্কুলে কম্পিউটার ও মাল্টিমিডিয়া প্রদান করা হয়েছে। এতগুলো বছর পেরিয়ে (১২.০১.২০২০) এক সংবাদমাধ্যমে জানা গেল, স্কুলের মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের তালা খোলা হয় না। কারণ বিদ্যুৎ নেই। যেসব বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ আছে, সেখানে শিক্ষকরা ল্যাপটপ চালাতে জানেন না। কারণ দক্ষ শিক্ষকের নিয়োগ হয়নি। দালালের মাধ্যমে যারা অবৈধভাবে নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণের সার্টিফিকেট জুড়ে দেয়া থাকলেও আসলে তারা মাল্টিমিডিয়া ব্যবহার করতে জানেন না।

কম্পিউটার প্রশিক্ষণের সার্টিফিকেটখানা পয়সা দিয়ে দালালদের কাছে কেনা হয়েছিল। এভাবে জানা গেছে, গোটা নিয়োগ প্রক্রিয়াটাকেই দুর্নীতির মাধ্যমে নষ্ট করা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোয় এমন অনৈতিক ঘটনা হরদম ঘটানো হয়। অনেক সময় অর্থের বিনিময়ে; আবার অনেক সময় রাজনৈতিক তদবিরের মাধ্যমে এসব ঘটনা ঘটানো হয়ে থাকে।

এভাবে আমাদের সেবাদানকাজে নিয়োজিত দায়িত্ববানরা যুগ যুগ ধরে একটি অকার্যকর সেবা সিস্টেম অনুসরণ করে আসছে। যেখানে শত নির্দেশনায়ও কাজ হয় না। সেসব মেধাহীনকে প্রশিক্ষণ দিয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ করা সম্ভব হয় না। একইভাবে ভূমি অফিসের কম্পিউটার কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। পাসপোর্ট অফিসের সিসি ক্যামেরা নষ্ট করে রাখা হয়।

এমনকি সময়মতো অফিসের হাজিরা চেক করা হবে জেনে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসের কার্ড পাঞ্চিং মেশিনগুলো আন্দোলন করে দরজায় লাগাতে দেয়া হয়নি! অনেক টাকা খরচ করে সেগুলো কিনে বহুদিন ধরে ফেলে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। এসব করা হয়েছে ডিজিটাল মেশিন বিষয়ে একশ্রেণির ফাঁকিবাজ কর্মচারীদের ভীতি। এরা কেউ কেউ টেবিলে বসে না। অনেক সিবিএ নেতা ও কর্মচারী অফিসে একবার এসে ঢু মেরে বাইরে চলে যায়। বাইরে গিয়ে ভিন্ন ব্যবসাপাতি করে।

এখনও আমাদের দেশে ট্রেন সময়মতো আসে না, ছাড়েও না। প্লেন সিডিউল ভেঙে গিয়ে অপেক্ষার প্রহর অনেক দীর্ঘায়িত হলেও বিমান কোম্পানিগুলো হোটেল দিতে চায় না। লাঞ্চ বা নাশতা দিতে চায় না। এরা যাত্রীসেবা কারে কয়, তা বোঝার চেষ্টা করে না। অথচ দুর্নীতির মাধ্যমে বিমান কোম্পানিকে লাটে তোলে। অনেক অফিসে ‘অনুসন্ধান’ টেবিলখানাও নেই! থাকলেও কেউ ফোন ধরে না। দেখা করতে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলে ভালোভাবে কথা বলে না। পাশ ফিরে অন্যত্র তাকায়; ভাবখানা দেখেও না দেখার মতো। অথবা বিরক্ত হয়ে উত্তর দেয়। এসবই হচ্ছে আমাদের দেশে সেবাদানের নমুনা। বিদ্যুৎ অফিস আগাম নোটিশ না দিয়ে ফুড়ুৎ করে বিদ্যুৎ সেবা বন্ধ করে দেয়। এটি যে কত বড় ক্ষতি ও বিপর্যয় ডেকে আনে, তা ভুক্তভোগীরাই জানেন।

থানায় ই-মামলা করার সেবা চালু করা যেতে পারে। পাসপোর্ট করতে পুলিশ ভেরিফিকেশন উঠিয়ে দেয়া হোক। থানা মানে ঘুষের জায়গা। এ ভীতি জনমনে আর কতদিন থাকবে? পুলিশ মানুষের বন্ধু- এ ধারণা প্রতিষ্ঠিত করতে হলে এ অপবাদ ঘুচে যাওয়া জরুরি। হাসপাতালে ই-সেবা চালু করা হোক। ভোটদান নিয়ে মানুষের আতঙ্ক দানাবাঁধার কারণ সেখানেও অনৈতিকতার ছড়াছড়ি।

ইভিএম মেশিনে ভোট গ্রহণ বা ভোট প্রদান করার মতো শক্ত নৈতিকতায় মোড়ানো প্রোগ্রামার বা মানুষ আমরা এখনও হতে পারিনি। তাই এর বিপক্ষে প্রতিবাদ চলছে এবং সেটাকে সযতেœ আমলে নেয়া উচিত। কারণ, একজন ভালো-সৎ মানুষের জন্য ভালো দেশ ও সৎ পরিবেশ সৃষ্টিতে আমাদের সবার নজর দেয়ার সময় এসেছে। এটা উপেক্ষা করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা তো করবেই না; বরং ঘৃণাই করতে থাকবে।

আমাদের জীবন অতি সংক্ষিপ্ত। সৎ জীবন ও সুন্দর সমাজব্যবস্থা কায়েম করতে হলে জোরের যুক্তি না দেখিয়ে যুক্তির জোরের দিকে ধাবিত হওয়া প্রয়োজন। নির্বিঘ্নে ভোটদান করতে না পারার জন্য কমিশন ও ভোটকেন্দ্রে সেবাদানে দায়িত্বরত পাহারাদারদের নির্লজ্জ পক্ষপাতিত্ব ও হয়রানি জাতি হিসেবে আমাদের চরম দেউলিয়াত্বকে হীনভাবে প্রকাশ করে বৈকি! এসবকিছু নিয়েই আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে।

ঘুষ-দুর্নীতি দিয়ে সেবা বিকিকিনি আর কতদিন চলবে? একজন বিবেকবান মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই সভ্য হতে চায়। পাপমুক্ত, নৈতিকতাসম্পন্ন সুস্থ জীবনযাপন করার নিশ্চয়তা পেতে চায়। সেটা দীর্ঘায়িত হলে সামাজিক ঘৃণা ঘনীভূত হয়ে অচিরেই মুক্তির বিকল্প পথ খুঁজে নিতে চেষ্টা শুরু করবে এবং তার ফল হতে পারে ভয়াবহ।

লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান

LEAVE A REPLY