ভারতীয় গরু আর বাংলাদেশি চাকরি

60

হারুন উর রশীদ
আমাদের কাছে ভারতীয় গরু বেশ ‘পছন্দের’। তাই গুলির মুখেও বাংলাদেশের গরু ব্যবসায়ীরা ভারতে যান। চেষ্টা করেন গুলি খেয়ে হলেও দু-চারটা গরু নিয়ে আসতে। তাতে তাদেরও কিছু লাভ হয়। আর আমরাও ভারতীয় গরুর মাংসের স্বাদ পাই। কিন্তু ভারতীয়রা বাংলাদেশের কোন জিনিসটি সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন তা কি আপনার জানা আছে?
জানা না থাকলে আমি বলে দেই। তাদের পছন্দের শীর্ষে আছে বাংলাদেশের চাকরি। আর ভারতীয় যারা এখানে চাকরি করেন তাদের ১০ ভাগেরও বৈধতা নেই। আমরা অনেক মানবিক। কারণ ভারতে যাওয়া বাংলাদেশের গরু ব্যবসায়ীরা গুলির মুখে পড়ে প্রাণ হারালেও অবৈধ ভারতীয়রা কিন্তু কোনও প্রতিরোধের মুখে পড়ছেন না। এমনকি আমরা তাদের বেতন তাদের দেশেই পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেই। ফলে মানি লন্ডারিংয়ের দায়ও তাদের ওপর ফেলা যাবে না। তারা আসেন ট্যুরিস্ট ভিসায়, থাকেন ট্যুরিস্ট ভিসায়। আর যদি কখনও দেশে ফিরে যান তাহলেও ভ্রমণ করেই ফিরে যান। কারণ সঙ্গে করে কিছু নিয়ে যান না। আগেই নিজের দেশে তাদের প্রাপ্য পেয়ে যান। এই কথাগুলো আমার নিজের নয়। যারা বাংলাদেশের জব মার্কেট নিয়ে খোঁজ রাখেন তাদের।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) গত সপ্তাহে বাংলাদেশে বিদেশিদের চাকরির বাজার নিয়ে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তা সরকারি হিসাব, প্রকৃত হিসাব নয়। আর তাতে বলা হয়েছে বাংলাদেশে মোট ২ লাখ ৫০ হাজার বিদেশি কাজ করেন। এই বিদেশিদের মধ্যে বৈধভাবে কাজ করেন ৯০ হাজার। ১ লাখ ৬০ হাজারের কোনও বৈধতা নেই। আর কথিত বৈধদের মধ্যে ৫০ ভাগ কোনও অনুমতি ছাড়াই ট্যুরিস্ট ভিসায় কাজ করেন। বিদেশিরা বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর ২৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা পাচার করেন। বাংলাদেশে কাজ করেন ৪৪ দেশের নাগরিকরা। শীর্ষে কারা আছেন? টিআইবির জবাব ভারতীয়রা।
টিআইবির প্রতিবেদন প্রকাশের পর আমি ব্যক্তিগতভাবে তৈরি পোশাক কারখানার কয়েকজন মালিকের সঙ্গে কথা বলেছি। কথা বলেছি তথ্যপ্রযুক্তি এবং সেবাখাতের কয়েকজনের সঙ্গে। এর আগেও আমি এই বিদেশি কর্মীদের নিয়ে প্রতিবেদনের কাজ করেছি। তাতে জানা যায়, বাংলাদেশে সব মিলিয়ে ১০ লাখের মতো বিদেশি নাগরিক কাজ করেন। টিআইবির প্রতিবেদনে এই তথ্যটি আসে সংবাদমাধ্যমের খবরের বরাত দিয়ে। তাদের ছোট একটি অংশ বাংলাদেশের উন্নয়ন খাতে কাজ করেন। বাকিরা ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, শিল্প ও সেবাখাতে আছেন। এই ১০ লাখের মধ্যে কমপক্ষে ৫ লাখ ভারতীয় নাগরিক। আর তাদের ৯০ ভাগেরই বাংলাদেশে কাজ করার কোনও বৈধতা নেই। বাংলাদেশে চীন, শ্রীলঙ্কা এমনকি নেপালের নাগরিকরাও বেসরকারি চাকরির বাজার দখল করে আছেন। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সময় আমরা শত শত নেপালি নাগরিককে দেখেছি, যারা এখানে অবৈধভাবে কাজ করতেন।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতেই এখন এক লাখ ভারতীয় কাজ করেন। তারা ডিজাইন থেকে হিসাব বিভাগ সবখানেই আছে। কেন আছেন? তাদের এখন কি খুব প্রয়োজন? আসলে প্রয়োজনীয়তার চেয়ে বায়িং হাউজের কৌশলে ভারতীয় নাগরিকদের রাখতে বাধ্য হন পোশাক কারখানার মালিকরা। বায়িং হাউজগুলোতে ভারতীয়দের দাপট। তারা অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রকও। তাই পোশাক কারখানায় ভারতীয়দের কাজ দেওয়া যেন বাধ্যতামূলক। আবার তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও আটকে দিয়েছে ভারত। তাদের সফটওয়্যার আনলে তাদের লোক আনতে হবে। তাদের প্রযুক্তি আনলে তাদের পরিচালক আনতে হবে। আর ট্রাভেল এজেন্সিগুলোতে খোঁজ নিয়ে দেখুন, সেখানেও একই অবস্থা। এমনকি বিজ্ঞাপন নির্মাণ থেকে শুরু করে টিভি অনুষ্ঠান তৈরি করতেও ভারতীয়দের আনতে হয়। তারা প্রযুক্তি নিয়ে আসে, সঙ্গে চাকরীপ্রার্থী। উপায় নেই!
আমার এক অর্থনীতিবিদ বন্ধু বললেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয়, শাড়ি সাজিয়ে রাখতে ভারতীয়, মার্কেটিংয়ে ভারতীয় এমনকি হিসাব রাখতেও ভারতীয়। তার কথা এর পেছনে প্রয়োজনীয়তার চেয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখার কৌশটি আসল। আর আমাদের নীতির কারণে তারা সুযোগ পাচ্ছে। তাদের বের করে দিতে আইনি পদক্ষেপও নেই।
কিন্তু ভারত কি এই সুযোগ দেয়? অন্য কোনও দেশ দেয়? দেয় না। গত বছরের একটি ঘটনা বলি। একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম তাদের ভারতের ব্যুরো অফিসের বাংলা ডেস্কে কয়েকজন ডেস্ক এডিটর নেওয়ার বিজ্ঞাপন দেয়। বাংলাভাষী যে কারও আবেদনের সুযোগ ছিল। আমার জানামতে বাংলাদেশ থেকেও অনেকে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশি কেউ চাকরি পাননি। যারা চাকরি পেয়েছেন তারা সবাই ভারতীয়। এর কারণ হলো, ভারতের আইনে তাদের দেশে কোনও কাজের দক্ষ লোক থাকলে বাইরের কোনও দেশ থেকে লোক নেওয়া যাবে না। ভারতে যেহেতু বাংলাভাষী রয়েছেন, তাই বাংলাদেশের কেউ চাকরি পাননি। ভারতের মতো এ ধরনের আইন তো আমাদের দেশেও থাকা প্রয়োজন। কিন্তু আমরা কি তা করছি? এ ধরনের আইন তো দূরের কথা, যারা অবৈধভাবে আছেন, তাদেরই ভদ্রভাবে বিদায় করার কোনও উদ্যোগ কি সরকার নিচ্ছে?
অনেকে বলবেন ব্যবসা, শিল্প ও সেবাখাতে আমাদের দক্ষ লোকের অভাব আছে। এটা আংশিক সত্য। কিন্তু পুরো সত্য হলো আমরা কিছু বলতে পরছি না। কিছু করতে পারছি না।
২৭ লাখ বেকারের দেশ বাংলাদেশ। আর এই দেশে চাকরির বাজারে দাপটের সঙ্গে রাজত্ব করছে ভারতীয়সহ বিদেশিরা। একই দক্ষতা নিয়ে তারা বাংলাদেশিদের চেয়ে ৪-৫ গুণ বেশি বেতন পান। বাংলাদেশের প্রবাসী কর্মীরা এখন বছরে গড়ে রেমিট্যান্স পাঠান ১৬ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু আমরা কি জানি আমাদের দেশ থেকে বিদেশিরা বছরে ৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স নিয়ে যায়? এটা কিন্তু বৈধ চ্যানেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব। অবৈধভাবে কত যায়?
শুরুতেই গরুর জন্য আমাদের সীমান্তে গরু ব্যবসায়ীদের ‘জীবনদানের’ কথা বলেছিলাম। আমরা গরু আনার জন্য গুলি খাই। কিন্তু দেশের বেকার যুবকদের চাকরি রক্ষার জন্য একটু ঘাম ফেলতেও রাজি নই। কোনও অভিযান চালাতেও আমাদের ভয় লাগে! আমরা এমন কেন?
লেখক: সাংবাদিক

LEAVE A REPLY