জনকল্যাণে দৈনিক কল্যাণ

92

 

মিজানুর রহমান তোতা

“বছর ঘুরে আবার তুমি এসেছো রক্তের বাঁধনে জড়িয়ে-তুমি জনকল্যাণের কল্যাণ, তোমার শুভ জন্মদিনে জানাই অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে প্রাণঢালা শুভেচ্ছা, অভিনন্দন, ধন্যবাদ। বছর বছর বারবার তুমি এসো, এসো গো এসো সমাজ বিনির্মাণে বড় ভুমিকা রেখো”–একটি জেলা শহর থেকে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকা টানা ৩৫ বছর নানা ধরণের বাঁধা বিপত্তি, চড়াই উৎরাই পার করে আপন গতিতে বীরদর্পে সামনে চলে আসার কৃতিত্ব অর্জন করে দৈনিক কল্যাণ সংবাদপত্র জগতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে-এটি রীতিমতো ইতিহাস। ইতিহাসের গড়াপেটার সাক্ষী হয়ে থাকাটা মানুষের আদিম প্রবৃত্তি। সাংবাদিকতার মহান পেশায় নিয়োজিত থেকে সাংবাদিক একরাম-উদ-দ্দৌলা নিজেই একটি সংবাদপত্রের জন্ম দেন। পেশাদার সাংবাদিক সম্পাদক হয়ে তিনি নিরবছিন্ন প্রকাশনা অব্যাহত রেখে প্রশংসনীয় দৃষ্টান্তস্থাপন করেছেন।

দৈনিক কল্যাণের জন্মদিনে কল্যাণ পরিবারকে প্রাণঢালা অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। একগুচ্ছ লাল গোলাপ উপহার দৈনিক কল্যাণের সম্পাদক, যশোর সংবাদপত্র পরিষদের সভাপতি ও প্রেসক্লাব যশোরের সাবেক সভাপতি একরাম-উদ-দ্দৌলা। তিনি আমার বড় ভাই, সাংবাদিকতায়ও অগ্রজ। তার সাথে রয়েছে অনেক স্মৃতি। তার পত্রিকার জন্মদিন উপলক্ষে একটি লেখা দেয়ার অনুরোধ করলেন তিনি। কথা ফেলতে পারলাম না। পেশাগত ব্যস্ততার মাঝেও একরাম ভাইয়ের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে লেখা শুরু কললাম। বিভিন্ন বিষয়ের উপর লেখালেখি তো আমার নিজের পত্রিকায় করেই থাকি। ভাবলাম কল্যাণের জন্মদিনে সংবাদপত্র জগতে আমাদের বিচরণ, চলাফেরা ও মধুর সম্পর্কে টুকিটাকি বিষয় নিয়ে লেখা যুক্তিযুক্ত হবে। এককথায় স্মৃতিচারণমূলক লেখা। বিদগ্ধ পাঠক ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন আশা করি। কারণ নিজেদের কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।

একরাম ভাইয়ের সাথে আমার প্রথম দেখা ঐতিহ্যবাহী প্রেসক্লাব যশোরের পুরাতন ভবনে। সেই ১৯৭৭ সালের কথা। সঠিক দিনক্ষণ মনে নেই। তবে এটুকু মনে আছে তিনি তখন মরহুম আবুল হোসেন মীর সম্পাদিত সাপ্তাহিক ঠিকানার বার্তা সম্পাদক ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি দৈনিক গণকন্ঠে ডেস্কে আর আমি মফস্বলের সাংবাদিক একই পত্রিকায়। আবার ঘুরেফিরে যশোরে অবস্থান স্থানীয় পত্রিকায়। তিনি দৈনিক ঠিকানার নির্বাহী সম্পাদক আর আমি মিয়া আব্দুস সাত্তারের দৈনিক স্ফুলিঙ্গে বার্তা সম্পাদক। একরাম ভাই দৈনিক ঠিকানা ছেড়ে প্রকাশ করলেন দৈনিক কল্যাণ। আমি যোগ দিলাম দৈনিক ঠিকানার নির্বাহী সম্পাদক হিসাবে। ডেস্ক পরিবর্তনে যাওয়া আর আসার মাঝে একটা যোগসূত্র তার সাথে কর্মজীবনের শুরুতেই যেন কোন না কোনভাবেই ঘটেছে। প্রেসক্লাব যশোরের নেতৃত্বের ব্যাপারেও সাংবাদিকতার মতোই মিল খুঁজে পাওয়া যায়। আমি প্রেসক্লাবে একবার সেক্রেটারী ও দুই দফায় সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর একরাম ভাই সভাপতি হলেন। তার কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করি। আবার তৃতীয়বারের মতো সভাপতি নির্বাচিত হলে তার কাছ থেকেই দায়িত্ব বুঝে নিই। এখানেই শেষ নয়, আমি যখন অবিভক্ত যশোর সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ছিলাম, তিনি তখন সম্পাদক হলেও সাংবাদিক ইউনিয়নের আন্দোলন সংগ্রামের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। আমার দীর্ঘ ৪২ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে তার সাথে প্রেসক্লাব নির্বাচন ও বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধ হলেও শিশু মনের মানুষটি পরক্ষণেই হাসিমুখে কাছে টেনে নিতেন।

যশোরের স্থানীয় পত্রিকা ছেড়ে যখন জাতীয় পত্রিকায় যশোর প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিই তখন আমার সাথে আরো গাঢ়ো সম্পর্ক হয় একরাম ভাইয়ের। আমার মনে পড়ে আমি তখন দৈনিক আজাদের যশোর ব্যুরোর দায়িত্বে। আমার মোটরসাইকেলে একদিন মণিরামপুর গেলাম দু’জন। সারাদিন ঘুরলাম গ্রাম থেকে গ্রামে। রাতে অতিথি হলাম দু’জন উপজেলা চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামের। মণিরামপুর ডাকবাংলোতে রাতভর জামপেশ আড্ডা চলে। মেহেরপুরে গেলাম এসাথে একবার। থানা চত্বরের বাদুড় গাছ দেখলাম। আরও কত কি। আজো সেইসব গল্প মাঝে মধ্যে দেখা হলেই একগাল হাসি হেসে বলেন ‘তোতা তোমার কী মনে পড়ে সেদিনের সেইসব মধুর আড্ডার কথা, ঘুরতাম আড্ডা দিতাম, আগে কি সুন্দর দিন কাটাতাম ইত্যাদি। পরবর্তীতে দৈনিক ইনকিলাব ব্যুরোর দায়িত্বে থাকাকালেও তার সাথে অনেক স্মৃতি আছে। উল্লেখ করলে বিরাট বড় হয়ে যাবে লেখা। যুবক বয়সের সেই স্টাইল মাস্টার একরাম ভাইয়ের সাথে এখনো কোন পার্থক্য নেই। একই রকম চলাফেরা ও আলাপ ব্যবহার।

বলতে দ্বিধা নেই, সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে দৈনিক কল্যাণের যথেষ্ট অবদান আছে। সাংবাদিক জীবনে আমার সুখ ও দুঃখ দুটোই আছে। কখনো ভালো আবার কখনো মন্দ সময় পার করেছি। পথ চলতে জীবন জানালা খুলে শুধু নিকষ কালো অন্ধকার দেখেছি। তারপরেও সাহস নিয়ে আলোর সন্ধানে কলম চালিয়েছি। মাঠে ঘাটে ঘুরেছি। অন্ধকারের পুর্ণ রূপটি দেখেছি। আবার কখনো দেখেছি অবাছা আলোও। শত প্রতিকুলতার মধ্যে জীবন নামের বিশাল স্রোতসিনী নদী পাড়ি দিয়েছি। প্রত্যেক মানুষের জীবনেই জোয়ার ভাটার মতোই আসলে ঘটনা ঘটে থাকে। আমার জীবন যৌবনের পুরোটাই কাটলো সংবাদপত্রে। আর কতদিন কাটবে তা জানি না। সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক লেখার রসহীন তথ্যের সমাহার ঘটে আমার লেখা বই ‘মাঠ সাংবাদিকতায়’। জীবনচর্চার সুক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ সম্বলিত আরেকটি বই প্রকাশ হয় নাম ‘ক্ষত বিক্ষত বিবেক’।

যা’হোক, সত্যিকারার্থে সমাজের দর্পন হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হোক একরাম ভাই সম্পাদিত দৈনিক কল্যাণ। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বিশাল ভিড়ে ও কর্পোরেট পূঁজির আধিক্যের ভেতরে টানা ৩৫ বছর ধরে দৈনিক কল্যাণ নিয়মিত প্রকাশনা টিকে আছে এটি অনেকটাই অতি আশ্চার্য মনে হয়। শুধু কল্যাণ নয়, অনেক জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকার ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। সাংবাদিকতায়ও আমরা অনেকটা আশায় আশায় পথ চলছি ঠিকই, তবে সবসময় দুরাশায়ও কুরে কুরে খায়। কখন যে মহান পেশা থেকে ছিঁটকে পড়ি এই ভয়টা রয়েছে। আসলে কেউ স্বীকার করুক বা না করুক এটি প্রকৃত চিত্র। বর্তমানে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতায় অস্থিরতা বিরাজ করছে। যার মাত্রা দিনে দিনে বাড়ছেই। মহান পেশাটিও নানা কারণে আজ প্রশ্নবিদ্ধ। সংবাদপত্রের নীতিমালা অনেকেই মানছেন না। সাংবাদিক হলেই নিজেকে অনেকে ভিন্ন জগতের ভেবে থাকে। এই পেশায় যে ‘সামাজিক দায়িত্ব কর্তব্য আছে, সেবামূলক পেশা, নিঃস্বার্থ প্রেম’-এটি ভুলে যায় অনেকেই। একথা নির্দ্দিধায় বলা যায়, সাংবাদিকতার মর্যাদা ঐতিহ্য আজ অনেকক্ষেত্রেই ভুলুন্ঠিত হচ্ছে আমাদেরই অনেকের কারণে। সাংবাদিকদের মধ্যে বিভাজনের রেখা মোটা হওয়ার কারণেও পেশার মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

লেখাটিতে ব্যক্তিগত কথাবার্তা বেশী বলা হয়ে গেল। বিরক্তি উৎপাদন ঘটালাম সুপ্রিয় পাঠক মহলকে। পরিশেষে বলবো, জনপ্রিয় পত্রিকা দৈনিক কল্যাণের জন্মদিনে পত্রিকাটির সম্পাদক চিরসবুজ শিশুমনের বড়ভাই একরাম উদ দ্দৌলার দীর্ঘায়ু কামনা করি। প্রত্যাশা করছি জনকল্যাণে ভুমিকা রাখুক দৈনিক কল্যাণ।

(লেখক : বিশেষ প্রতিনিধি, দৈনিক ইনকিলাব ও সাবেক সভাপতি, প্রেস ক্লাব যশোর)।

LEAVE A REPLY