দেশপ্রেম ও সত্য আমাদের প্রধান শক্তি

41

বিশেষ প্রতিনিধি : কলম হচ্ছে হৃদয়ের জিভ। এই জিভ দিয়ে আমরা সত্য যেমন প্রকাশ করতে পারি, মিথ্যাও প্রকাশ করতে পারি অনায়াসে। সত্যকে মিথ্যা, মিথ্যাকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি। কলম তলোয়ারের চেয়ে ধারালো, চাবুকের চেয়ে তীক্ষ্ম, লৌহদন্ডের চেয়ে ভয়াবহ। এই সত্য মাথায় রেখে আজ থেকে ৩৫ বছর আগে যাত্রা শুরু করেছিল ‘দৈনিক কল্যাণ’। আজ ৩৬ বছর পদার্পণের প্রাক-মুহূর্তে সেই সত্য আবার উচ্চারণ করছি আমরা। আমাদের মূলশক্তি হচ্ছে সত্য। সত্যের সঙ্গে বসবাস। সত্যের শক্তিতে এতটা পথ আমরা পাড়ি দিয়ে আসতে পেরেছি। ‘কল্যাণ’ পৌঁছাতে পেরেছে বাংলাদেশের হাজার হাজার পাঠকের কাছে। জায়গা করে নিতে পেরেছে পাঠক হৃদয়ে। গত ৩৫ বছরে ‘কল্যাণ’ অবিরাম আলো ফেলেছে সত্যের ওপর, উদ্ঘাটন করেছে সত্যরূপ। আমাদের কলম শুধু সত্য এবং ন্যায়ের সঙ্গে থেকেছে। মিথ্যা, অন্যায় ও মানুষের অকল্যাণের দিকে আমরা আমাদের কলম কখনো চালিত করিনি। আগামী দিনগুলোতে ‘কল্যাণ’ তার এই নীতিতেই অবিচল থাকবে। সত্য, ন্যায়, মানুষের কল্যাণ এবং দেশপ্রেম-এই মন্ত্র বুকে ধারণ করে আমরা এগিয়ে যেতে চাই।
আমাদের স্পষ্ট ঘোষণা, আমরা নিরপেক্ষ; কিন্তু সব ক্ষেত্রে ওই কথিত নিরপেক্ষ নই। আমরা মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ, যতক্ষণ পর্যন্ত ওই মত মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিরুদ্ধে না হয়। আমরা মানুষের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ, যতক্ষণ পর্যন্ত এই স্বাধীনতা অন্যের অধিকার ক্ষুন্ন না করে। আমরা ধর্মীয় স্বাধীনতার ক্ষেত্রে শতভাগ নিরপেক্ষ, যতক্ষণ পর্যন্ত ওই স্বাধীনতা শান্তি ও উন্নয়ন বিরুদ্ধ না হয়। তাই আমরা সে ঠিকুজিতে মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষ অ-সাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয়ের কথা তুলে ধরেছি। আমরা সন্ত্রাস, দুর্নীতি, অনাচার, অবিচার এবং অসামাজিকতার কালো ছায়ার বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রামের বলিষ্ঠ উচ্চারণের ঠিকুজি লিখেছি। সর্বোপরি শান্তি ও উন্নয়নের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদী তৎপরতাকে শুধু ঘৃণাই করিনি, সেই অপশক্তিকে রুখতে সাহসিকতার সাথে ঠিকুজি লিখেছি মানুষকে প্রেরণা যোগাতে। আঞ্চলিক বহুমুখি সমস্যার সমাধানের দাবিতে আমরা সোচ্চার থেকেছি অবিচল। যশোরের প্রাণপ্রবাহ ফেরাতে ভৈরবসহ কপোতাক্ষ, চিত্রা, বেত্রাবতী, বেগবতী, মুক্তেশ্বরীর বুকে দেড়শ’ বছর ধরে হারিয়ে থাকা স্রোতধারা বহাতে নিরলস কলমযুদ্ধ করেছি, যার চিত্র এই ঠিকুজিতে পাওয়া যাবে। পাশাপাশি যশোরের অভিশাপ বলে পরিচিত মনিরামপুর, কেশবপুর ও অভয়নগর উপজেলার বৃহৎ এলাকার জলাবদ্ধতার নিরসনের দাবিতে আমরা নিরলস থেকেছি সব সময়। ‘এ পৃথিবীতে যা কিছু চিরকল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী বাকি অর্ধেক নর’ কবির এ কথার বাস্তবতার সাথে আমরা একমত বিধায় নারী অধিকারকে সুপ্রতিষ্ঠ করার সকল প্রচেষ্টার কথাও স্থান পেয়েছে দৈনিক কল্যাণের সেই ঠিকুজিতে।
আমাদের এই যে গর্বিত পথ চলা কিন্তু নিষ্কণ্টক ছিল না। এ জন্য আমাদের অনেক কাঠ-খড় পোড়াতে হয়েছে। পত্রিকাটিকে আতুর ঘরে গলা টিপে হত্যা করার একটি চক্রান্ত ছিল স্থানীয় একটি অপশক্তির। তারা এর শুভ যাত্রাকে সু-নজরে দেখতে না পেরে নানা কৌশলের শেষ প্রচেষ্টা হিসেবে বিজ্ঞাপন তালিকাভুক্তির (মিডিয়ালিস্ট) পথ দুর্ভেদ্য প্রাচীর দিয়ে আটকে দিয়েছিল। এতে পত্রিকাটি এক দূরাতিক্রম আর্থিক সংকটের মুখে পড়ে অস্তিত্ব হারানোর মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। কিন্তু সামনের বাতিঘর যা ক্ষীণ হলেও আমদের আশার আলো দেখায়। আর সেই ক্ষীণ আলো আস্তে আস্তে আমাদের সামনে জ্বাজল্যমান হয়ে ওঠে। আমরা পাই পথ চলার সাহসী নিশানা।
আমরা বিশ্বাস করি বাঙালি জীবনের সবচেয়ে বড় গৌরবের ঘটনা ঘটেছে ১৯৭১ সালে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আমাদের শ্রেষ্ঠতম অর্জন। কিছু স্বাধীনতাবিরোধী মানুষ (!) ছাড়া আমরা প্রত্যেকেই সেই সময় দেশের জন্য যে যার অবস্থান থেকে যুদ্ধ করেছি। দেশের সর্বস্তরের মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল স্বাধীনতাযুদ্ধে। এই যুদ্ধে পুরুষের পাশাপাশি নারীর অবদান অবিস্মরণীয়। এই অবদান নানা রকমভাবে মূল্যায়ন করেছে ‘কল্যাণ’।
আমরা এগোতে চাই এভাবেই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বুকে ধারণ করে, সত্য উচ্চারণে অবিচল থেকে, দেশপ্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে। ‘দৈনিক কল্যাণ’ প্রিয় পাঠক, লেখক, গ্রাহক ও শুভানুধ্যায়ী, বিজ্ঞাপনদাতা ও হকার এজেন্ট যাঁরা বিভিন্নভাবে ‘কল্যাণ’এর সঙ্গে জড়িত, তাঁদের প্রত্যেককে কৃতজ্ঞতা, ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা জানাই। গত ৩৫ বছরের মতো আগামী দিনগুলোতেও আপনারা আমাদের সঙ্গে থাকবেন, পাশে থাকবেন। ‘কল্যাণ’ যেন আপনার পরিবারের প্রতিদিনকার সঙ্গী হয়ে থাকে, এই আমাদের চাওয়া।
সেই পথ ধরেই আমরা এগিয়ে চলেছি। শত সংকটে মহান আল্লাহর রহমত এবং শুভাকাক্সিক্ষদের সহযোগিতাই আমাদের শক্তি। এ শক্তিতেই দৈনিক কল্যাণ যে আদর্শ সামনে নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল তা থেকে বিচ্যুৎ না হয়েই এগিয়ে যাবে, ৩৬তম বর্ষে পদার্পণের এই শুভ মুহূর্তে আবারো রইলো আমাদের দীপ্ত উচ্চারণ।
সব শেষে, আসুন, দেশের প্রত্যেক মানুষ আমরা কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলি, জীবনকে ভালোবাসি সত্য, কিন্তু দেশের চেয়ে বেশি নয়।

LEAVE A REPLY