নেই কাজ তো খৈ ভাজ

0
266

শাহাদত হোসেন কাবিল
কথায় আছে ‘নেই কাজ তো খৈ ভাজ’। আমাদের দেশের এক শ্রেণির পন্ডিতদের দশাটা এ রকম। চলছিল এক রকম। কারো কোনো ক্ষতি নেই, জাতির ভাবমূর্তির ক্ষয় নেই, ইতিহাস বিকৃতির কোনো আলামত নেই, উৎপাদনে কোনো ঘাটতি নেই, ভুল বোঝাবুঝির কোনো কারণ নেই, এক কথায় জীবন চলার ক্ষেত্রে ন্যুনতম কোনো সমস্যা আজ পর্যন্ত দেখা দেয়নি। তবু পন্ডিতদের উর্বর মস্তিষ্কে খেললো বানান পরিবর্তন করতে হবে। অমনি চাপিয়ে দিল, এখন থেকে আগের বানান চলবে না। হুজুকে বাঙালি আর কি স্থির থাকে। পারলে উলঙ্গ হয়ে নাচে। হ্যাঁ এবার কাজের কাজ একটি হয়েছে। হাজার বছরের বাঙালি এত দিন যে ভুলের মধ্যে ডুবে ছিল তারা এবার সঠিক পথের সন্ধান পেল।
পন্ডিতদের তেজদীপ্ত মেধা দেখে মনে হয়, কি ভুলটা না জীবনে করে এসেছি, রবীন্দ্রনাথের ভুল বানানে লেখা কবিতা, সাহিত্য পড়ে। আগে যদি বুঝতাম সে এতটা তাহলে কি তাকে কবি গুরু বলে মানতাম। ভুল বানানে কাব্য রচনা করে নোবেল পাওয়া যায়, কি আশ্চর্য ব্যাপার! কি অপরাধটা না করেছি দুঃখু মিয়ার কাব্য পড়ে গদগদ হয়ে তাকে বিদ্রোহী কবি আখ্যায়িত করে। হায়রে কপাল, কি পুলকে যে মাইকেলকে মহাকবি বলেছিলাম, সে ভুল এখন শুধরাতে পারছিনে। মীর মোশারফ হোসেন, ভুল বানানে লিখে তুমি বাংলা সাহিত্যকে পুঁথিসাহিত্যের বেড়াজাল ভেঙেছ তা আর মানতে পারছিনে। ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ তুমি বহু ভাষাবিদ পন্ডিত। ভুল বানানে লিখে কেমন করে তুমি এ সম্মান পেলে? পল্লীকবি জসিম উদ্দিন, হায়রে কপাল, তুমিও একই দোষে দোষী হয়ে বিশেষ সম্মান নিয়ে আছো কি করে। তোমরা পরপারে বসে দেখো তোমাদের বানানের ‘পাখী’রা ভালো মতো উড়তে পারতো না। যেই না আমরা ‘পাখি’ বানান লিখলাম ওমনি তাদের ওড়ার গতি হাজার ভাগ বেড়ে গেল। তোমরা ‘বাড়ী’ লিখেছিলে বলে ওই বাড়িতে ঘুম হতো না। এখন আমরা ‘বাড়ি’ লিখছি বলে কত স্বস্তিতে ঘুম পড়তে পারছি। আর বেশি বলে তোমাদের বেশি খাটো করবো না।
রবি ঠাকুর, দুঃখু মিয়া, মাইকেল, মীর মোশারফ, জসিম উদ্দিন, ড. শহীদুল্লাহ তোমরা সাহিত্যের শীর্ষে উঠেছিলে কোন যুক্তিতে। পরীক্ষায় খাতায় ভুল বানান লিখলে যদি নম্বর কাটা যায় তাহলে তোমাদের ভুল লেখা সাহিত্য হয় কি করে? সেও ভালো তোমাদের মানমর্যাদা এখনো টিকে আছে। আমাদের সহনশীল পন্ডিতরা তোমাদের নামের আগের বিশেষণগুলো প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করেননি।
গেল সে ধাক্কা। কিন্তু এতেও খুব একটা জুত হলো না পন্ডিতদের। এবার আদাজল খেয়ে লাগলেন স্থানের নামের বানান বদলাতে হবে। ব্যস, শুরু হয়ে গেল খেলা। চাপিয়ে দিল সংশোধনী। আমরা যশোরবাসী নতুন বানান পেলাম। অযৌক্তিক খোড়া, বস্তাপচা, দুর্গন্ধময় বানান এনে চাপাল আমাদের ওপর। বিনীতভাবে বলতে চাই, বাংলা শব্দ কি ইংরেজি দিয়ে সঠিক উচ্চারণ করা যায়? তাহলে এই অকাজ নিয়ে এত গলদঘর্ম হচ্ছেন কেন আপনারা? যে বানানটি আমাদের ওপর চাপান হলো তা দিয়ে কি যশোর উচ্চারণটা সঠিক হচ্ছে? শুধু ইংরেজি নয় বিদেশি ভাষায় অন্য জাতির কোনো কিছুই সঠিক উচ্চারণ হয় না। যেমন আরবিতে ‘পে’ অথবা ‘পা’ বলে কোনো বর্ণ নেই। এ ক্ষেত্রে তাহলে আরবিতে পাকিস্তান বানানটা কি ভাবে লেখা যাবে? লিখতে হবে ‘বে’ অথবা ‘বা’ দিয়ে এবং তার উচ্চারণ হবে বাকিস্তান। এখন পাকিস্তানি পন্ডিতরা তাদের এ ভুল উচ্চারণের বানান সংশোধন করবেন কি করে?
বিড়ম্বনা নেই কোথায়? এই যে বানান সংশোধন করা হলো তা অনুসরণ করে কত শতাংশ? এই তো এবারের পিইসি পরীক্ষার রেজাল্টের পর এক প্রধান শিক্ষক পত্রিকা অফিসে তার প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের বিষয়ে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠালেন। সেটি সাংবাদপত্র ডেস্ক থেকে সংশোধিত বানানে সংশোধন করে প্রকাশ করা হয়। সংবাদটি পরের দিন পত্রিকায় দেখে ওই প্রধান শিক্ষক ফোন করে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ভালো হয়েছে। কিন্তু কিছু বানান ভুল হয়ে গেছে।
পত্রিকা ডেস্ক থেকে বিনীতভাবে প্রধান শিক্ষকের কাছে জানতে চাওয়া হয় কোন বানানগুলো ভুল হয়েছে একটু বলুন, প্লিজ।
প্রধান শিক্ষক সংশোধিত বানানের মধ্যে যেগুলো পড়ে সেগুলোর কথা বললেন।
পত্রিকা অফিস থেকে বলা হলো ওই বানানগুলো সংশোধন করা হয়েছে। আগের বানান আর নেই। কিন্তু তাকে বোঝানো গেল না। এই হচ্ছে বানান সংশোধনের বিড়ম্বনা।
লক্ষ্য করা গেছে সংশোধিত বানান সংবাদপত্রগুলো যেভাবে অনুসরণ করে অন্য কেউ তা করে না। ঢালাওভাবে দোষ না দিয়ে বলতে হয় যেখান থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শিখবে সেখানকার অবস্থা বড়ই নাজুক।
ঢাকায় অনুষ্ঠিত পিআইবির এক সাংবাদিক প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ নেয়ার সুযোগ হয়েছিল। একদিকার ক্লাসে রিসোর্স পার্সন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক শামসুল হক। প্রাইমারি স্কুলে আগেকার দিনে শিক্ষকরা দ্রুত লিখন লেখাতেন। সেই আদলে তিনি আমাদের দ্রুত লিখালেন। পরে আমাদের ২২ জনের কপি জমা নিলেন। এরপর সেগুলো দেখে তিনি দুটি শিট আলাদা করে রাখলেন। ওই দুটি শিটের এক সাংবাদিক একটি কলেজে অধ্যাপনা করেন এবং অন্যজন একটি স্থানীয় দৈনিকের নির্বাহী সম্পাদক। অধ্যাপক শামসুল হক সাংবাদিকের (প্রভাষক) উদ্দেশ্যে বললেন, আপনি তো শিক্ষকতা করেন। তো আপনার এত বানান ভুল কেন?
তিনি বললেন, স্যার সত্যি কথা বলতে কি এখন স্কুল-কলেজে বনানানের প্রতি ততটা গুরুত্ব দেয়া হয় না। এজন্য আমারও বানান চর্চা হয় না।
এরপর নির্বাহী সম্পাদকের উদ্দেশ্যে বললেন, আপনার একটি বানানও ভুল হয়নি। কারণটা কি বলুনতো।
নির্বাহী সম্পাদক বললেন, স্যার, আমি বানানে খুব একটা দক্ষ নই। কিন্তু যেহেতু আমি আমার পত্রিকার সম্পাদনার কাজটাও করি সেহেতু নিয়মিত অভিধান অনুসরণ করি। আমার লেখাটা যতটুকু শুদ্ধ হয়েছে মনে হয় এ কারণেই হয়েছে।
স্কুল-কলেজে বানানের প্রতি ততটা গুরুত্ব দেয়া হয় না সাংবাদিক (প্রভাষক) মহোদয়ের কতটুকু সত্য তা জানিনে। তবে এ কথা সত্য যে, আগেকার দিনে প্রশ্নপত্রের মাথায় লেখা থাকতো ৫টি বানান ভুলে ১ নম্বর কাটা যাবে। এখন আর এ কথাটা লেখা থাকে না। তাই বলি কি স্কুল-কলেজে যদি বানান চর্চা না থাকে তাহলে বানান সংশোধন করে অহেতুক বিড়ম্বনা বাড়িয়ে লাভটা হলো কি?
যশোরের সংশোধিত বানান নিয়ে ২০১৮ সালের ২১ এপ্রিল একটি গোলটেবিল বৈঠক হয় যশোর প্রেসক্লাবে। ‘যশোরবাসী সমন্বয় কমিটি’ আয়োজিত ‘যশোরের নয়া ইংরেজি বানানে সুবিধা-অসুবিধা’ শীর্ষক গোলটেবিলে সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক ফারুক জাহাঙ্গীর আলী টিপু সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
সেখানে আলোচকরা বলেছিলেন, যদি আমাদের উল্লেখযোগ্য কোনো ক্ষতি না হয়, তাহলে যশোরের ইংরেজি বানান নতুন করে লেখার প্রয়োজন নেই। আমাদের জেলার নাম আমরা সহজেই উচ্চারণ করতে পারি; ইংরেজরা সব বাংলা শব্দ উচ্চারণ করতে পারে না। তারা যেভাবে উচ্চারণ করে, সেভাবেই তারা লিখেছে। নতুন বানানেও তারা আগের উচ্চারণই করবে।
বৈঠকে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান বলেছিলেন, আমাদের আজকের যশোর একসময় যশোহর ছিল। কিন্তু এত বড় নাম উচ্চারিত না হয়ে যশোরে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ হয়। আর ইংরেজরা ঢাকা উচ্চারণ করতে পারতো না। বলতো ডেকা, তেমনি যশোরকে যেসর। তাদের বর্ণমালা এবং উচ্চারণ সংক্রান্ত সমস্যা, আমাদের নয়।
তিনি বলেছিলেন, এ সময়ে যশোরের ইংরেজি বানান পরিবর্তন না করলেও চলতো। এতে যে আমাদের বিশাল কোনো লাভ হচ্ছে তাও না। যশোরবাসী সমন্বয় কমিটির উদ্যোগ ও আলোচকদের মতামতের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও সমর্থন জানাই।

LEAVE A REPLY