হুমকিতে বিশ্ব গণতন্ত্র

42

আমিরুল আলম খান : ফরাসি বিপ্লব মানব সভ্যতা কেউ পহারা দেয় রাষ্ট্রে জনগণের অংশগ্রহণের ক্ষমতাও স্বাধীনতা। জনগণ শুধু সরকার নির্বাচিতই করেনা, পার্লামেন্টের বাইরেও তার মতামত বাঁধাহীন ভাবে প্রকাশ করতে পারে। সেটি জনগণ কওে সংবাদ মাধ্যমে। সেকালে সেটা সম্ভব ছিল কেবল মাত্র সংবাদ পত্রের মাধ্যমে। তাই সংবাদপত্রকে ফরাসি বিপ্লবীরা রাষ্ট্রেও চতুর্থ অঙ্গ বলে অভিহিত করেন। রাষ্ট্রেও অন্য তিনটি অঙ্গ হল, আইন সভা বা পার্লামেন্ট, নির্বাহী বিভাগ বা সরকার এবং বিচার বিভাগ।
কোন রাষ্ট্রেও চার অঙ্গই ষোলো আনা সঠিকভাবে চলে না। কোন না কোন বিচ্যুতি ঘটেই। কিন্তু চারটি অঙ্গ সক্রিয় থাকলে সমাধান সহজ হয়।
রাষ্ট্রেও এই চার অঙ্গেও আন্তঃসম্পর্ক একইসাথে বন্ধুত্বপূর্ণ এবং দ্বান্দ্বিক। এই সম্পর্ক ষোলো আনা বন্ধুত্বপূর্ণ হলে রাষ্ট্র নিজেই অকার্যকর হয়ে পড়ে। আবার দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক একেবাওে বৈরি হয়ে পড়লেও রাষ্ট্র অকার্যকর হয়ে যায়। সোজা কথায়, যতক্ষণএই গুরুত্বপূর্ণ চার অঙ্গ একই সঙ্গে একে অপরের সহযোগী এবং প্রতিযোগী কেবল তখনই তা সবচেয়ে বেশী কার্যকর প্রমাণিত হয়।
কিন্তু মানুষের মন সরলরেখায় চলে না। গণতন্ত্রে শাসক যেহেতু আইনি ক্ষমতার অধিকারী হয়, তাই সবকিছুই তার ইচ্ছাধীন করতে সে মরিয়া হয়ে ওঠে। আর তখনই রাষ্ট্রপথ ভ্রষ্ট হয়।
কিন্তু রাষ্ট্র নিজেতো একটি ধারণা মাত্র। তার মূর্ত রুপ হল আইন সভা, সরকার, আদালত ও মিডিয়া। এগুলো যেমন চাক্ষুষ করা যায়, তেমনি সর্বক্ষণ তার উপস্থিতিটের পাওয়া যায়।
এই চার অঙ্গ বিশিষ্ট রাষ্ট্রকে কী আমরা এক সুডৌল, সর্বাঙ্গ সুন্দর বৃত্ত কল্পনা করতে পারি? তেমন যদি হত তবে নিঃসন্দেহে তা গতিহীন, স্থাণুবৎ হয়ে পড়ত। সেখানে মানবিক গুণাবলির বিকাশও বিচ্যুতি অসম্ভব হয়ে উঠত। আর মানুষ যদি নিষ্কলুষ জীব হত, স্বাধীন ইচ্ছার কোন প্রকাশ যদি তার না থাকত তা হলে তো রাষ্ট্র গঠনেরই প্রয়োজন হত না। যেমন ফেরেস্তাদেও কোন রাষ্ট্র নির্মাণ করতে হয়ে না। কেননা, ফেরেস্তারা ঈশ্বরের ইচ্ছা ধীন। যে স্বাধীন নয়, কেবল সেই বিচ্যুতি হীন।
বুঝা গেল, মানুষের ভুল হয়। সে ভুল শোধরাতে তার নানা আইনকানুন, রীতিনীতি দরকার হয়। মানুষ যেহেতু ভুল করে, তাই তাকে সংশোধনেরও প্রয়োজন পড়ে। সে ভুলচুক ধওে দেয় মিডিয়া। বিচাওে সোপর্দ হলে আদালত তা মীমাংসা করে। আদালত, দরকার হলে, নতুন আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে নির্দেশ দিতে পারে।
কাঠামোগত বিষয়টি এমন মসৃণ পথে চলে দৈবাৎ। প্রায়ই ক্ষমতার প্রকাশ ঘটে সরকারের তরফে। তাতে আইনি সুরক্ষা দিতে এগিয়ে আসে আইন সভা। আইন সভায় উচ্চকণ্ঠ বিরোধীশিবির সক্রিয় থাকলে কখনও সখনও তারুখে দিতে পারে। কিন্তু জনগণ রাজপথে সক্রিয় থাকলেই কেবল তা কার্যকর ভাবে রুখে দিতে পারে। অর্থাৎ, রাজপথেও আইনসভায় সক্রিয় বিরোধিতা শাসক গোষ্ঠীকে বেপরোয়া হওয়া থেকে মুক্ত রাখতে পারে।
এমন ঘটে, তার প্রধান কারণ, মানুষ, দেবতা বা ফেরেস্তা নয়, আবার শয়তান বা দানব নয়। সে ষড়রিপুর বশীভূত। তার অন্তওে একই সাথে দেবতা ও দানবের অধিষ্ঠান।
যদি রাষ্ট্রেও চার অঙ্গ সমান সজাগ ও সক্রিয় থাকে তবে তো সোনায় সোহাগা। কিন্তু নানান স্বার্থ প্রতিটি অঙ্গকে পথ ভুলিয়ে নিয়ে যায়।
অন্ধ আনুগত্য কিংবা নির্বিচার বিরোধিতা দুটোই সমান ক্ষতি কর। কিন্তু দেখা যায়, এক্ষেত্রেই বিচ্যুতি সর্বাধিক। গণতন্ত্রে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা শাসকদেও এই ভুল পথে নিয়ে যায়। আবার, প্রবল পরাক্রম শালীবিরোধী শিবির ও রাষ্ট্র পরিচালনায় ভাল উদ্যোগকে নস্যাৎ কওে দেয়। পৃথিবীতে এমন দৃষ্টান্ত ভুরি ভুরি।
এমন অবস্থায় মিডিয়ার জোরালো ও বিজ্ঞ ভূমিকা সহায়ক হতে পারে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মিডিয়া নিজেই পথ ভ্রষ্ট হয়। ফলে, এ দুষ্ট চক্র থেকে মুক্তি মেলে না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ২০১৬ সালে অভাবনীয় কিছু ঘঁনা ঘটে। রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প সেদেশের শক্তিশালী মিডিয়ার প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়েন। ডাক সাইটে ওয়াশিংটন পোস্ট, নিউইয়র্ক টাইমস, সিএনএন তো বটেই, এমনকি চরম রিপাবলিকান সমর্থক এরিজোনা এনকোয়ার ও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লাগে। কেবল ফক্স গ্রুপ ট্রাম্পের পক্ষ নেয়। ভোটের দিন ও মার্কিন মিডিয়ায় ট্রাম্প বিরোধিতা তুঙ্গে ছিল। এমনকি, ফল ঘোষণায় সময় ও তাছিল লক্ষ্যুীয় ভাবে দৃষ্টি কটু। কিন্তু সকলের মুখে ছাঁই দিয়ে, সারা দুনিয়াকে অবাক কওে ট্রাম্প জিতে যান। তারপরও মিডিয়া ট্রাম্পের পিছু ছাড়েনি।
এদিকে ট্রাম্পের অভিশংসন নিয়ে কংগ্রেস ও সিনেটে যে নাটক হল তাতে গোটা দুনিয়া হতবাক। দল বেঁধে ডেমোক্র্যাটরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে কংগ্রেসে অভিশংসিত করল। আর সংখ্যা গরিষ্ঠ সিনেটে মাত্র একজন ছাড়া সব রিপাবলিকান ট্রাম্পের পক্ষে সে অভিশংসন খারিজ কওে দিল। দুনিয়া জানত, ট্রাম্পকে ক্ষমতা হারাতে হবে না। কেননা ১০০ সদস্যেও সিনেটে তার বিরুদ্ধে অন্তত ৬৬ ভোট দরকার ছিল। যেখানে ডেমোক্রাট ভোট মাত্র ৪৮। কিন্তু দেখা গেল ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ভোট পড়ল মাত্র ৪৭।
ট্রাম্প নির্বাচিত হবার পর সেদেশের এশাধিক আদালত ট্রাম্পের একেরপর এক জারি করা নির্দেশ আটকে দিতে শুরু করে। মিডিয়া এবং আদালত যেন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জারি রাখে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প টিকে গেলেন তীব্র দলবাজির বদৌলতে। কিন্তু হেওে গেল গণতন্ত্র। লক্ষ্যুীয়, মার্কিন গণতন্ত্রে রাষ্ট্রেও কোন অঙ্গই আর কার্যকর নেই।
ট্রাম্প কি তা হলে সঠিক পথের নায়ক? সম্ভবত ইতিহাস কখনোই তা বলবেনা। এই খ্যাপাটে প্রেসিডেন্ট সারা পৃথিবীর জন্যই সর্বদাই হুমকি। তবে তিনি নিজেকে যত সাহসী বলে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করুন না কেন, আসলে একজন কাপুরুষ। নিজের স্বার্থের বাইওেকিছু ভাবতে জানেন না। এ ধরণের মানুষ শুধু নিজের দেশের জন্য, গণতন্ত্রেও জন্যই হুমকি নয়, এঁরা সমগ্র মানব জাতির জন্যই জ্বলন্ত হুমকি।
কিন্তু এক বিংশ শতাব্দীর পৃথিবী বিচার বোধহীন রাষ্ট্র নায়কদেও দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সে তালিকা দীর্ঘ। গণ তান্ত্রিক দুনিয়ায় ট্রাম্পতো আছেনই। ভারতে মোদি, যুক্তরাজ্যে বরিস জনসন, ফ্রান্সে মাঁখো যেন সভ্য পৃথিবীতে বড়ই বে-মানান। কর্তৃত্ববাদী দেশগুলোর মধ্যে চীনে শি, রাশিয়ায় পুতিন, সৌদি যুবরাজ সোলায় মান, তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান মানুষের সার্বক্ষণিক উদবেগের কারণ।
ফরাসি বিপ্লবের সাম্য মুক্তির বাণী যেন সুদূর পরাহত।

LEAVE A REPLY