দুর্নীতি নামের পাগলা ঘোড়া থামাতেই হবে

143

বিমল সরকার
অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, একশ্রেণির লোক একেবারে উন্মাদ হয়ে পড়েছেন। টাকার দরকার তাদের; তা যে কোনো উপায়েই হোক। ছুটে চলা। হন্যে হয়ে ছুটে চলা। দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে টাকা ও খ্যাতির পেছনে ধাবিত হওয়া। টাকা চাই, টাকা- আরও টাকা; আরও অনেক টাকা।

বৈধ-অবৈধ ও বোধ-বিচার ব্যতিরেকে কীভাবে টাকা রোজগার করা যায়; টাকা রোজগার করতে হবে- এটাই যেন ওদের তপস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা সে যে কোনো উপায়েই হোক- ‘এনে দে মা লুটে-পুটে খাই’! মানুষের লোভ-লালসা, ভোগলিপ্সা তাহলে আর কোথায় গিয়ে থামবে? ইংরেজ আমল, পাকিস্তানি আমল, এমনকি আমাদের স্বাধীনতা লাভের প্রথম ২৫-৩০ বছরের সঙ্গেও যেন আজ আর কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

আপনার টাকা, আমার টাকা, আমাদের টাকা। হাজার নয়, লাখ নয়, কোটিও নয়। শতকোটি, শত শত কোটি; হাজার কোটি, হাজার হাজার কোটি টাকা। লুট হচ্ছে দেশে, পাচার হচ্ছে দেশ থেকে বাইরে। বড় নিঃশব্দে, নিঃসংকোচে, নির্ভয়ে। আমরা ক’জন সে খবর রাখি!

অর্থনীতি ও দেশের অর্থব্যবস্থা সম্পর্কে আমার বিশেষ কোনো ধারণা নেই, সাধারণ শিক্ষা ও বুদ্ধি যতটুকু আছে তা-ই খাটিয়ে কোনোরকমে আমার দিন চলে, চলে যায়, চালিয়ে নেয়ার চেষ্টা করি। কাজেই অর্থনীতির সংজ্ঞা ও মারপ্যাঁচ বোঝার আমার খুব একটা দরকার পড়ে না। কিন্তু ইচ্ছা করলেই কি এসব থেকে, এসব ব্যাপারে নির্লিপ্ত-উদাসীন থাকা যায়?

চোখ-কান বন্ধ করে থাকা- তা কতদিন? সংবেদনশীলতা বলেও তো একটি কথা আছে। আমরা তো এ দেশেরই সন্তান। এ দেশেরই মাটি-বাতাস-কাদা-জল আর ফল-ফুলের মাঝে আমাদের বেড়ে ওঠা এবং বেঁচে থাকা। দেশ ও জাতির সমস্যা-সম্ভাবনা, আয়-উন্নতি, গৌরব-লাঞ্ছনা-অপমান কম আর বেশি কোনোটি আমাদের স্পর্শ করে না।

২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দ্বিতীয়বারের মতো সরকার গঠিত হওয়ার ঠিক এক সপ্তাহ পর আমাদের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সাংবাদিকদের কাছে মন্তব্য করেছিলেন, আমাদের দেশে অসম্ভব বিত্তশালী কিছু রাক্ষস সৃষ্টি হয়েছে। একই সময় এক অনুষ্ঠানে প্রদত্ত বক্তৃতায় তিনি বলেন, ‘নির্বাচনী ইশতেহারে প্রদত্ত অঙ্গীকার অনুযায়ী সরকারের স্বচ্ছতার স্বার্থে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সম্পদের হিসাব সরকারের কাছে দিতে বলা হবে…’ (যুগান্তর, ১৪ জানুয়ারি ২০০৯)।

কিন্তু বাস্তবে টানা তিন মেয়াদে গত ১১ বছরে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। আসলে দলীয় সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় অনিয়ম-দুর্নীতি ও বড় অঙ্কের টাকা নয়ছয়ের প্রকৃত পরিস্থিতিটি জানাটাও অনেকটা কঠিন বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। জোরালো বাধা বা কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা না থাকায় যে যেখানে যেভাবে পারছেন বিপুল পরিমাণ টাকা ও অপরিমেয় সম্পদের পাহাড় গড়ে চলেছেন।

এ বিষয়ে সম্প্রতি দুটিমাত্র জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত তিন-চারটি খবরের শিরোনামগুলোর প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই :

এক. ‘পাঁচ হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ : পাহাড় সমান দুর্নীতি প্রশান্তের।’ ‘এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রশান্ত কুমার হালদারের দুর্নীতি রূপকথার গল্পকেও হার মানিয়েছে … (যুগান্তর, ২৮ জানুয়ারি ২০২০)।’ দুই. ‘ব্যাংক পরিচালকদের ঋণ সিন্ডিকেট : এ নৈরাজ্য বন্ধ করতে হবে।’

ব্যাংক পরিচালকদের ঋণ নেয়া বেআইনি। অথচ তারা সিন্ডিকেট করে ঋণ নিয়ে খালি করছেন ব্যাংক। আর বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ গ্রাহকরা। এ নৈরাজ্য বন্ধে কালের কণ্ঠের সঙ্গে কথা বলেছেন দেশের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার ও বিশ্লেষকরা। ‘পরিচালকদের ঋণ নেয়া বেআইনি’- ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। ‘অর্থনীতির জন্য খুবই ক্ষতিকর’- ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। ‘ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করতে হবে’- ড. আহসান এইচ মনসুর। ‘এ ধরনের ঋণের উদ্দেশ্যটা প্রশ্নবিদ্ধ’- ড. জাহিদ হোসেন (কালের কণ্ঠ, ২৮ জানুয়ারি, ২০২০)।

তিন : ‘ঋণ পৌনে দুই লাখ কোটি টাকা : ব্যাংকে পরিচালকদের আগ্রাসী থাবা’। ‘সমাজের ছদ্মবেশী প্রভাবশালী ব্যাংক ডাকাতদের বিচার না হলে পুরো ব্যাংকিং খাত ধসে পড়বে’।

‘নিজ ব্যাংক থেকে পরিচালকদের ঋণ বন্ধ করা উচিত’- ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। ‘পরিচালকদের বেশি ঋণে আমানতকারীরা হুমকিতে পড়বেন’- ইব্রাহিম খালেদ। ‘পরিচালকরা আইন মেনে বেআইনি কাজ করছেন’- ড. জাহিদ হোসেন (যুগান্তর, ২৯ জানুয়ারি, ২০২০)। চার : ‘হুন্ডির মাধ্যমে অর্থপাচার : পাচারের টাকায় বিলাসী জীবন’। ‘ঋণ নিয়ে শিল্প না গড়ে হুন্ডির মাধ্যমে পাচার করে বিদেশে ব্যবসা ও বাড়ি ক্রয় : চিকিৎসা ব্যয়ের নামে বছরে ৩৫ হাজার কোটি টাকা পাচার (কালের কণ্ঠ, ২৯ জানুয়ারি, ২০২০)।’

স্বাধীনতা লাভের পর আমরা ইতিমধ্যে ৪৮ বছর পার করেছি। দলীয় ও নির্দলীয় এবং সামরিক মিলে অন্তত ১৬টি সরকার এ পর্যন্ত দেশ শাসন করেছে ও করছে। ১৯৯১ সালে নতুন করে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু, তাও ৩০ বছর হয়ে গেল। চলছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন টানা তৃতীয় ধাপের শাসনের ১২ বছর। বাস্তবতার আলোকেই দীর্ঘসময় অম্ল-মধুর অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে প্রত্যেক সাধারণ মানুষের এবং তা সব ব্যাপারেই।

মনের খেয়ালে এখানে আমি কেবল টানা তিন দিনে দুটি মাত্র দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের দু-চারটি শিরোনাম উল্লেখ করলাম। এমন আরও কত শত-হাজার খবরের শিরোনাম সাধারণের অগোচরেই থেকে যায়। আর দেখলেই বা কী। অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও ভয়াবহ সব ঘটনা-বিষয়ও আজকাল সবার যেন গা-সওয়া হয়ে গেছে।

এ কথা অবশ্য ঠিক, অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকার একদম বসে নেই। যেভাবেই হোক সক্রিয় রয়েছে দুদক- দুর্নীতি দমন কমিশন। বসে নেই অন্য সংস্থা-সংগঠনগুলোও। কিন্তু আশানুরূপ কাজ হচ্ছে না।

যুগান্তরে প্রকাশিত আর একটিমাত্র খবরের কেবল শিরোনামটি উল্লেখ করে লেখাটি শেষ করতে চাই। ‘ব্যাংক ঋণের হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার : দুইশ জনকে দেশে ফেরাতে চায় দুদক’, (৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০)। আমরা বারবার আশাহত হতে চাই না। যে কোনো উপায়েই হোক, দিগ্বিদিক জ্ঞাশূন্য হয়ে দুর্বার গতিতে ছুটে চলা দুর্নীতি নামের পাগলা ঘোড়াটিকে থামাতেই হবে। মনে নানা সংশয়-সন্দেহ থাকা সত্ত্বেও আমরা দুদক ও সরকারের পরবর্তী কার্যক্রম-পদক্ষেপ দেখার অপেক্ষায় আছি।
বিমল সরকার : অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক

Previous articleকোচিং ও গাইড বাণিজ্য বন্ধে ব্যবস্থা নিন
Next articleকারিনার সঙ্গে ‘প্রেম করিতে শখ’ আমিরের

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here