জমি সুরক্ষায় মাটি দূষণমুক্ত করুন

0
88

সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদমাধ্যমে কিছু কৃষিপণ্যে ক্ষতিকারক ভারী ধাতু যেমন লেড, ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়ামের উপস্থিতির খবর আমরা দেখেছি। মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক এসব ধাতুর উপস্থিতি বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মাটিতে, বিশেষ করে শিল্প-কারখানা সংলগ্ন কৃষিজমিতে লক্ষ্য করা গেছে। যার কারণে এসব কৃষিজমিতে উৎপাদিত ফসলে ভারী ধাতুর উপস্থিতির আশঙ্কা করা যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যাডমিয়াম রাসায়নিক সার থেকে এবং লেড ও ক্রোমিয়াম শিল্প-কারখানার নির্গত বর্জ্য থেকে মাটিতে আসে, যা মাটিকে অতিমাত্রায় দূষণ করে। ফলে ওইসব জমিতে উৎপাদিত ফসলে ভারী ধাতুর উপস্থিতি থাকার যথেষ্ট আশঙ্কা আছে। এসব ব্যবহার মানবদেহে বহুবিধ জটিল রোগের কারণ হতে পারে। তা ছাড়া অতিমাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার পানিকে দূষিত করার ফলে সেচের মাধ্যমে জমিতে এসব ক্ষতিকারক ভারী ধাতুর উৎপত্তি ঘটতে পারে।
আমাদের দেশের কৃষকদের জমিতে ভারী ধাতুর উপস্থিতি সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকায় জমিতে ক্ষতিকর ভারী ধাতুর পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ভারী ধাতুর কারণে কৃষিজমি দূষিত হয়। ফলে উৎপাদিত খাদ্যের নিরাপত্তা ঝুঁকির সম্মুখীন হয়।’
বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে কৃষিপণ্য রপ্তানি। গত ২০১৮ সালেই কৃষিপণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ প্রায় ৬০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছে। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের কৃষিজাত পণ্যের বাজার ক্রমান্বয়ে সম্প্রসারিত হচ্ছে। এর মূল কারণ বাংলাদেশে উৎপাদিত কৃষিপণ্য তুলনামূলক নিরাপদ। যার অন্যতম কারণ, প্রতি বছর অতিবৃষ্টির কারণে এ দেশের অধিকাংশ কৃষিজমি বন্যায় প্লাবিত হয়। ফলে নতুন পলিমাটি জমে কৃষিজমির মৌলিক ও ভৌতিক পরিবর্তন এবং জমির উর্বরতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। এতে রোগ-বালাইয়ের প্রাদুর্ভাবও কম থাকে। ফলে দেশের জনগণের গড় আয়ু উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কিন্তু ক্ষতিকর এসব ভারী ধাতুর উপস্থিতি সংক্রান্ত প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদের কারণে কৃষিপণ্য রপ্তানি প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বর্তমানে বিশ্বের ১২০টিরও বেশি দেশে বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রপ্তানি হচ্ছে। এসব পণ্যের মধ্যে আছে দুগ্ধজাত পণ্য, ডিম, মধু, ফুল, ভোজ্যতেল, বিভিন্ন ধরনের সবজি, মসলা জাতীয় ফসল ও খাদ্যশস্য, ফল, বাদাম, চা, তামাক, জ্যাম, জেলি, সস, স্যুপ, নুডলস ইত্যাদি।
টেকসইযোগ্য কৃষি ব্যবস্থাপনার একটি মূল কৌশল হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশে উৎপাদিত কৃষিপণ্য রপ্তানি করে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন; সেই সঙ্গে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের যথোপযুক্ত মূল্য অভ্যন্তরীণ বাজারে নিশ্চিত করা। তা ছাড়া উন্নত প্রযুক্তি ও প্রণোদনার মাধ্যমে চাষিদের উচ্চমূল্যের ফসল চাষাবাদে আকৃষ্ট করে কৃষিভিত্তিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত রাখা।
অতএব অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাহিদা পূরণে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে মাটির গুণাগুণ ও পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখতে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। সময় এসেছে ভারী ধাতুর উপস্থিতির মাত্রা কমিয়ে এনে কৃষিজমির মাটিকে দূষণমুক্ত রাখা এবং এসব ভারী ধাতুর সম্ভাব্য উৎস খুঁজে বের করে জনগণকে সচেতন করা। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি জনগণ এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিশেষভাবে নজর রাখতে হবে।
তাই ভ্রান্ত প্রচারে আতঙ্কিত হয়ে ফসলকে দোষারোপ না করে অতি সত্বর সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণপূর্বক ভারী ধাতুর প্রভাব থেকে কৃষিজমির স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় এজেন্ডা ‘নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন’ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংশ্নিষ্ট সব মন্ত্রণালয়সহ জনগণ ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে সমন্বিত ও নিবিড়ভাবে বাস্তবসম্মত কর্মসূচির উদ্যোগ নিতে হবে

LEAVE A REPLY