কোন পথে চলছে দেশ?

79

আনিস আলমগীর
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর কন্যা। তিনি যে ডান-বাম না করে সোজাসুজি বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানটি স্থগিত করেছেন, তার জন্য তাকে সাধুবাদ জানাই। এমনিতে কয়দিন ধরে কানাঘুষা চলছিল, দেশে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগী ধরা পড়েছে, কিন্তু সরকার বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠানের জন্য তা গোপন করছে। এমন এক পরিস্থিতিতে দেশে নভেল করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত তিন রোগী শনাক্ত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্য জন্মশতবার্ষিকীর মূল অনুষ্ঠানটি স্থগিত করা এবং বছরজুড়ে যে পরিকল্পনা, তাকে পুনরায় সাজানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় যা সত্য তাই প্রকাশ পেয়েছে।
মৌলবাদী চক্র যে সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার এবং বারবার গুজব ছড়ানোর মধ্যে আছে, সেটিও আবার প্রমাণ হলো এই ঘটনায়।
আগামী ১৭ মার্চ ২০২০-এ জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে অনুষ্ঠিতব্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষের প্রধান অনুষ্ঠান স্থগিত করার ফলে বিদেশি মেহমান যারা অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য নিমন্ত্রিত হয়েছিলেন, তাদের নিমন্ত্রণও স্থগিত হয়ে গেছে। তারাও ১৭ মার্চের জন্য আর আসবেন না। বহুল বিতর্কিত অতিথি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিরও এই যাত্রায় আসা হচ্ছে না।
মোদির সফরটি নানা দিক থেকে ছিল অস্বস্তিকর। ভারতবিরোধী রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে সাধারণ একটি শ্রেণিও বঙ্গবন্ধুর মতো অসাম্প্রদায়িক মানুষের জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে মোদির মতো একজন সাম্প্রদায়িক নেতার উপস্থিতি মন থেকে মানতে পারছিল না। তার সফর নিয়ে রাজপথ উত্তপ্ত হওয়ার লক্ষণ সুস্পষ্ট ছিল। মোদিকে দাওয়াত দিয়ে সরকারও পড়েছিল বিপদে। শেষ পর্যন্ত করোনা দুই পক্ষের মুখ রক্ষা করেছে। মোদির ঢাকা আগমন হাঙ্গামার মধ্য দিয়ে কাটতো। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ‘সারা বিশ্বে ভারত বন্ধুহারা হচ্ছে’ বলে নিন্দিত মোদির জন্য এই সফরে আসাটা প্রেস্টিজ ইস্যু ছিল। বাংলাদেশ সরকারও বন্ধুরাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়ে ফেরত নেওয়ার নজির সৃষ্টির পক্ষে ছিল না।
বিশ্বে প্রায় ১০০টি দেশে করোনার বিস্তার ঘটেছে, এক লক্ষাধিক লোক আক্রান্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত তিন হাজারের বেশি লোক প্রাণ হারিয়েছে। যতটা না এই ভাইরাস মৃত্যু ঘটাচ্ছে, তার চেয়ে শত গুণ আতঙ্ক তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে বিশ্বব্যাপী। বাংলায় কলেরাকে বলা হয় ‘ওলাওঠা’। মাত্র ৭০-৮০ বছর আগেও বাংলাদেশে ওলাওঠা মহামারি আকারে দেখা দিলে এর চেয়েও বেশি লোক আক্রান্ত হতো এবং মৃত্যুর সংখ্যাও এরচেয়ে বেশি হতো। এখন আর তা হয় না। প্রকৃতির খেয়ালে এখন নতুন ভাইরাস এসেছে, তার অবসান হবে। ধৈর্যের সঙ্গে মানুষকে তা মোকাবিলা করতে হবে। মানুষকে নিয়ে আল্লাহর লীলার কোনও শেষ নেই। সর্ব অবস্থায় তার ইচ্ছার প্রতি আত্মসমর্পণ করতে হবে। এখানে মানুষ অসহায়, এটাই স্রষ্টার নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব। চীন শক্তিশালী রাষ্ট্র। করোনা একটি ক্ষুদ্র ভাইরাস। তার ধাক্কায় এখন চীন বিধ্বস্ত। নিউইয়র্কে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। আমেরিকা তো চীনের চেয়ে আরও শক্তিশালী রাষ্ট্র। কিন্তু সবাই অসহায় এখন। বাংলাদেশের অর্থবিত্ত সবই সীমাবদ্ধ। এর মধ্যে আমরাও আক্রান্ত হয়েছি। নিয়ম-কানুন মেনে চলার চেষ্টা করতে হবে। শৃঙ্খলা আইনের চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। আল্লাহ নিয়মানুবর্তিতা পছন্দ করেন। কথা বলছিলাম মুজিববর্ষ উদযাপন নিয়ে। মুজিব জন্মশতবর্ষের প্রধান অনুষ্ঠান করোনার কারণে স্থগিত হলেও ১৭ মার্চ ধানমন্ডির ৩২ নম্বর এবং টুঙ্গিপাড়ায় যে দুইটি অনুষ্ঠান হওয়ার কথা তা ক্ষুদ্র পরিসরে পালন করা হবে। করোনার কারণে শুরুতে ছন্দপতন হলেও আশা করছি বাকি সব অনুষ্ঠান যথাসময়ে হবে। ইতোমধ্যে মুজিববর্ষ পালনের বাড়াবাড়ি নিয়ে সরকারপ্রধান অনেকবার সতর্ক করেছেন। আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে অনুমতি ছাড়া যত্রতত্র বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল, ভাস্কর্য স্থাপন না করার নির্দেশনা। একেতো মৌলবাদীরা এসব নিয়ে অপপ্রচারে লিপ্ত আছে, তার ওপর এসব ম্যুরাল ও ভাস্কর্যের বেশিরভাগই নিম্নমানের, শৈল্পিকতার ছোঁয়া নেই। কর্মফল ভালো হলে অমরত্ব এমনিতে আসে। বঙ্গবন্ধুর অমরত্ব কালজয়ী। এটা কেড়ে নেবে কালেরও সাধ্য নেই। ধরাপৃষ্ঠে যতদিন বাঙালি জাতি বেঁচে থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধুর অমরত্বের অবসান হবে না। তার অমরত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য মিশরের ফারাওদের মতো কোনও পিরামিড তৈরিরও প্রয়োজন নেই। বঙ্গবন্ধু সাধারণ মানুষের নেতা এবং তার উত্থানও হয়েছিল তাদের থেকে। সাধারণ মানুষকে ছেড়ে তিনি কোনও কিছুই চিন্তা করেননি। তার যুদ্ধের পরিকল্পনাও ছিল সাধারণ মানুষকে নিয়ে। তাই তিনি ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন, ‘তোমাদের যার যা কিছু আছে, তা-ই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু—আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি তোমরা বন্ধ করে দেবে।’ ১৯৭১ সালে মানুষও তাই করেছে। আসলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ। গৃহস্থের ঘরের বউ থেকে গৃহকর্তা পর্যন্ত সবাই ছিল যোদ্ধা। দীর্ঘ ১১ বছর আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে টানা ক্ষমতায়। এর আগেও পাঁচ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল তার নেতৃত্বে। এখন আওয়ামী লীগ দাবি করছে তাদের সময়ে উন্নয়ন হচ্ছে। কথাটা অবশ্য অহেতুক নয়। কিছু উন্নয়ন তো দৃশ্যমান, কিন্তু বহু ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলাও বিদ্যমান। দুই দশক পার করেও পূর্বাচলকে শহর বানাতে না পারা, আর বসবাস অযোগ্য ঢাকাকে উড়াল রেল, পাতাল রেল, ফ্লাইওভার দিয়ে আরও বাস অযোগ্য করে তোলা, ধুলাবালির শহরের মধ্যে বিশ্বের এক নম্বর বানানোকে আমি উন্নয়ন বলতে পারছি না। ধোঁয়া-ধূলি, হর্নের আওয়াজ, মাইকের আওয়াজ, যানজটে এই শহরের মানুষের নয় শুধু, শহরটিরও নাভিশ্বাস দেখা দিয়েছে। পরিকল্পনামন্ত্রী আবদুল মান্নান বলেছেন, উন্নয়ন আর বিশৃঙ্খলা নাকি সমানে চলছে। ইতিহাসে পড়েছি, বিশৃঙ্খলার মধ্যেও রোম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা ও প্রসারিত হয়েছিল। ইতিহাসে যতই দৃষ্টান্ত থাকুক, আর পরিকল্পনামন্ত্রী যতই বলুক, নিরবচ্ছিন্ন ভালো অবস্থা ছাড়া আর্থিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। সুতরাং আর্থিক যে বিশৃঙ্খলা এখন দেশে চলছে, তার থেকে পরিত্রাণ পেতে হবে। না হয় যেকোনও সময় যেকোনোভাবে দেশের বিপদ আসতে পারে। দেশকে সঠিক পথে আনতে হলে যোগ্য ও সৎ লোকদের যথাস্থানে বসাতে হবে। শক্তিশালী মন্ত্রিসভারও প্রয়োজন। এর কোনও বিকল্প নেই। এক প্রধানমন্ত্রী কত সামাল দেবেন! কয়টি অনিয়ম দেখবেন! বিমানবন্দরে যদি করোনা ভাইরাস শনাক্তকরণের কার্যক্রম চালুই আছে, তবে ইতালি থেকে আসা দুইজন রোগী ভাইরাস নিয়ে প্রবেশ করলো কী করে! আর করোনার আক্রমণ জোরেশোরে শুরু হয়েছে জানুয়ারির মধ্যভাগ থেকে। তাহলে তিনজন রোগী শনাক্ত হওয়ার খবরের সঙ্গে সঙ্গে বাজার থেকে মাস্ক, স্যানিটাইজার উধাও হয়ে যাবে কেন! কেন নভেল করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সরকারের নেওয়া উদ্যোগের প্রশংসা করলেও প্রতিরোধ প্র্রস্তুতিতে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে বলে হাইকোর্ট মন্তব্য করেন! একই সঙ্গে মাস্ক, সেনিটাইজার নিয়ে ব্যবসায়ীরা যাতে সিন্ডিকেট, কালোবাজারি করতে না পারে সেজন্য প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কথা বলতে হয় উচ্চ আদালতকে। আবার এই আদালতেই দুর্নীতিবাজ জিকে শামীমের জামিন হয়ে যায়, রাষ্ট্র নাকি তা জানেও না—এটাতো সবল সরকারের লক্ষণ নয়।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

 

LEAVE A REPLY