মানুষ ও ভাইরাসের লড়াই, গত ছয় মাসে কার জয় হল?

73

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : বিশ্বজুড়ে প্রলয় সৃষ্টি করেছে নভেল করোনাভাইরাস। এরই মধ্যে মহামারির ছয় মাস পার হয়ে গেল। প্রথমে চীনের উহান শহর থেকে উৎপত্তি হলেও পরে এটা বিশ্বের প্রায় সব দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রাণহানী ঘটেছে চার লাখেরও বেশি মানুষের। আক্রান্ত হয়েছে ৭১ লাখেরও বেশি। মানুষ ও ভাইরাসের এই দীর্ঘ ছয় মাসের লড়াই শেষে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, একে পরাস্ত করার কতটা কাছাকাছি পৌঁছেছি আমরা? আদৌ কি ভাইরাসকে পরাস্ত করা সম্ভব হবে? চিকিৎসকেরা বলছেন, রোগটি বোঝার ক্ষেত্রে তাদের অনেকটা অগ্রগতি হয়েছে। তবে খুব তাড়াতাড়ি একে নিরাময় করে ফেলার আশা করা যাচ্ছে না। শিগগিরই ভ্যাকসিনও হয়তো মিলছে না।
করোনাভাইরাসের ছয় মাস পূর্তি উপলক্ষে ব্রিটিশ গণমাধ্যম সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়, গত বছরের ডিসেম্বরে চীন থেকে ভাইরাসটির ছড়ানো শুরুর পর থেকে গত ছয় মাসে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই তা আক্রমণ করেছে। এই ভাইরাস সংক্রমণ ও মহামারির অভিজ্ঞতাটি মানুষের জন্য অত্যন্ত মারাত্মক হয়েছে। এখন পর্যন্ত, ৭০ লাখের বেশি মানুষ সংক্রমিত হয়েছে এবং চার লাখের বেশি মারা গেছে, যা অনিবার্যভাবে আগত কয়েক বছর ধরে বাড়তে থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে। করোনাভাইরাসজনিত মহামারিতে আমাদের বিশ্ব বদলে গেছে। সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, লকডাউন জারি করা হয়েছে, বয়স্কদের কেয়ার হোমগুলোতে অসুস্থতা ছড়িয়েছে এবং দেশের অর্থনীতি ব্যাপক ধাক্কা খেয়েছে।

গার্ডিয়ান বলছে, ভাইরাসের প্রথম অর্ধ বার্ষিকীর লড়াইয়ে অগ্রগতির অর্ধেক পর্যন্ত পৌঁছেছে মানুষ। এ সময়ের মধ্যে মহামারির ব্যবস্থাপনায় আমাদের দক্ষতা সম্পর্কে প্রচুর উদ্বেগ আর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। গত ছয় মাসে আমরা কভিড-১৯ সম্পর্কে কতটুকু জানলাম? এ থেকে উদ্ভূত চ্যালেঞ্জগুলোর প্রতি আমরা কত দ্রুত এবং কতটা ভালো প্রতিক্রিয়া জানিয়েছি? আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে পরবর্তী ছয় মাসে আমাদের সবচেয়ে জরুরি কোনো প্রশ্নের উত্তর খোঁজা দরকার? আধুনিক সময়ে মানুষের জন্য সবচেয়ে খারাপ সংকট হিসেবে আবির্ভূত করোনাভাইরাস থেকে উত্তরণের পথ গবেষক বা চিকিৎসকেরা দিতে পারবেন কি? গবেষকেরা স্পষ্টতই মেনে নিয়েছেন যে আমরা কভিড-১৯ এর আগমন সম্পর্কে অত্যন্ত বাজে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম। লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের উদীয়মান সংক্রামক রোগের অধ্যাপক মার্টিন হিববার্ড বলেন, ‘আমরা যে ধরনের মহামারির আশঙ্কা করেছিলাম এবং যাকে প্রতিরোধের পরিকল্পনা নিয়েছিলাম, তার থেকেও আরও খারাপ হয়ে উঠেছে রোগটি।’
মার্টিন হিববার্ড বলেন, ‘এর মৃত্যুহার ১ শতাংশ এবং এটি উচ্চমাত্রার সংক্রামক। এই ভাইরাসের এমন বৈশিষ্ট্য, যা কোনো নতুন নতুন রোগের জন্য অসম্ভব বলে মনে করা হয়েছিল এবং আমাদের এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে তা কখনো ভাবিনি। এই জাতীয় বৈশিষ্ট্য সবচেয়ে খারাপ সম্ভাব্য বাস্তব পরিস্থিতি উপস্থাপনের প্রতিনিধিত্ব করে। আমরা যা ভেবেছিলাম, তার সীমা ছাড়িয়ে গেছে।’
একই কথা বলেছেন ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের বিশ্ব স্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক ডেভিড ন্যাবারো। তিনি বলেন, ‘আমরা যখন প্রথম রোগটির মুখোমুখি হলাম, তখন নেহাত শ্বাসনালির রোগ, যা বুকের ওপরের অংশে আক্রান্ত করে বলে ধরে নিয়েছিলাম। এখন এটা পরিষ্কার যে এটি সাইনাসে আক্রান্ত করে এবং রক্তনালিতে প্রভাব ফেলে রক্ত জমাট বেঁধে ফেলতে পারে। রোগটি চরম ক্লান্তি, কিডনির ক্ষতি এবং হার্ট অ্যাটাকের জন্যও দায়ী হতে পারে। এটি তরুণদেরও আক্রান্ত করে। একে খাটো করে দেখা ঠিক নয়।’
এডিনবরা ইউনিভার্সিটির সংক্রামক রোগ ও মহামারি বিষয়ক অধ্যাপক মার্ক উলহাউস যোগ করেছেন, ‘অদূর ভবিষ্যতে রোগটি অদৃশ্য হয়ে যাবে এমন নয়। কোভিড-১৯ এর সঙ্গে ছয় মাস ধরে বসবাস করার পরে আমরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি শিখেছি তা হলো, আমাদের এটি সঙ্গে করে আরও দীর্ঘকাল বেঁচে থাকতে হবে। মূলত আমরা আজীবনের সঙ্গীর সঙ্গে ছয় মাস কাটালাম।’
মার্ক উলহাউস বলেছেন, ‘চলমান পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু ভীতিকর লকডাউন পদক্ষেপ আর টেকসই হবে না। আসন্ন মাসগুলোতে আমরা যে সমস্যার মুখে পড়তে যাচ্ছি, তা হচ্ছে আসন্ন লকডাউনের সীমাবদ্ধতা না রেখে এবং এর সঙ্গে যুক্ত অর্থনৈতিক ও মানসিক ক্ষতির চাপ না দিয়ে রোগ থেকে মুক্তির পথ খুঁজে বের করা। গত ছয় মাসের এ শিক্ষা হয়েছে যে এটা সহজ হবে না।’
উলহাউস বলেন, ‘কোভিড-১৯ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈশিষ্ট্য জানা গেছে যে এটি বয়স্কদের রোগ। ৭৫ এর বেশি বয়সী মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা ১৫ বছরের তরুণের চেয়ে ১০ হাজার গুণ বেশি। এটা গুরুত্বপূর্ণ জানার বিষয়। এর অর্থ, আমাদের বয়স্কদের সুরক্ষার জন্য বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। অধিকাংশ বয়স্করা যেহেতু বাড়িতে থাকছেন, তাই আমাদের পরিবারের বায়োসিকিউরিটির ধারণা উদ্ভাবনে কাজ করতে হবে।’
গার্ডিয়ান লিখেছে, করোনাভাইরাস রুখতে লকডাউন থেকে শুরু করে বর্তমান ধারণাগুলো কার্যকর করা সম্ভব হয়েছে কারণ কয়েক মাস ধরে ভাইরাস পরীক্ষার প্রযুক্তির যথার্থতা এবং মাত্রা উভয় ক্ষেত্রেই উন্নত হয়েছে। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক অ্যানি জনসন বলেন, ভাইরাস শনাক্তের প্রযুক্তি উন্নত হওয়ার ফলে কোভিড-১৯ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর খোঁজা অন্যান্য সুবিধা ও সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। নতুন ভাইরাস ও অ্যান্টিবডি পরীক্ষা উন্নত হওয়ার পাশাপাশি তথ্যভিত্তিক কোভিড-১৯ এর উপস্থিতি বোঝার বিষয়টি সহজ হয়েছে।
অ্যানি বলেন, ‘কোভিড-১৯ রোগীর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ চেষ্টা করার ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা দেখা হচ্ছে লক্ষণহীন রোগী বেড়ে যাওয়া। শুরুতে এ ধরনের ব্যক্তি থেকে রোগ ছড়াতে পারে, তা বোঝার উপায় ছিল না। গত কয়েক মাসে সে শিক্ষা হয়েছে। আগামী কয়েক মাসে অগ্রাধিকার পাবে বিস্তারিত মহামারি সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা। করোনা পজিটিভ রোগীর বিস্তারিত তথ্য জানা থাকলে রোগটি নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক পার্থক্য গড়া যায়। আমরা মূলত ভাইরাস শনাক্তের দুনিয়ায় ঢুকতে যাচ্ছি।’
এরপর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ভাইরাস সংক্রমিত ব্যক্তি কোনো ধরনের ইমিউনিটি বা প্রতিরোধী ক্ষমতা অর্জন করেছে কি না তা বের করা। অধ্যাপক মার্টিন হিববার্ড বলেন, ‘একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, সংক্রমিত ব্যক্তি যে ইমিউনিটি অর্জন করে, তা তাকে ভবিষ্যৎ কোভিড-১৯ সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেয়। ধারণা করা হচ্ছে, এ সুরক্ষা ছয় মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত হতে পারে। তবে ঠিক কত দিন এ সুরক্ষা বজায় থাকে তা খুঁজে বের করা গুরুত্বপূর্ণ।’
হিববার্ড বলেছেন, সংক্রমণ থেকে সেরে ওঠা ব্যক্তির শরীরে যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, তা যতক্ষণ সুরক্ষা দেবে, তত রোগের বিস্তার কম হবে। এ কারণে বিজ্ঞানীরা অ্যান্টিবডি নমুনা দিতে বলছেন। কয়েক মাস পরে অ্যান্টিবডির অস্তিত্ব থাকে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখাটাই এখন গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন।
গত এপ্রিল মাসে কভিড-১৯ এর রোগী বাড়তে শুরু করলে সম্মুখ যোদ্ধা হিসেবে চিকিৎসাকর্মীরা রোগীদের বাঁচানোর লড়াইয়ে নেমে পড়েন। লিভারপুর স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিনের চিকিৎসক টম উইংফিল্ড বলেন, শুরুতে রোগীর শ্বাসকষ্ট দেখে বিস্মিত হয়ে যান চিকিৎসকেরা। ধীরে ধীরে চিকিৎসকেরা তাঁদের চিকিৎসার উন্নতি করেছেন। এখন অন্তত কাদের আইসিইউ লাগবে বা কাদের বাড়িতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া যাবে, তা ঠিক করতে পারেন না তাঁরা। এর মধ্যে কিছু সম্ভাব্য ও প্রতিশ্রুতিশীল কৌশল বের করেছেন তাঁরা। তবে, কোভিড রোগীদের ক্ষেত্রে এখনো অনেক বিষয় অজানা।
বর্তমান করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, চিকিৎসকেরা নিয়মিত তথ্য জোগাড় করছেন। রক্ত পরীক্ষা, অক্সিজেন স্তর, শ্বাস–প্রশ্বাসের হার প্রভৃতি নানা তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে, এ থেকে কার ক্ষেত্রে করোনাভাইরাস সবচেয়ে বাজে প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে বা কাকে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে নিতে হবে, সে ধারণা পাওয়া যাবে। তথ্য হাতে থাকলে আগামী ছয় মাসে মারাত্মক এ ভাইরাসটি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে আরও অনেক অজানা বিষয় আমরা জানতে পারব।
সূত্র- গার্ডিয়ান।

Previous articleখুলছে মৃত্যুপুরী নিউইয়র্ক, ফিরছে কর্মচাঞ্চল্য
Next articleস্ত্রীকে রাস্তায় ফেলে গেলেন স্বামী, পাশে দাড়ালেন মাশরাফি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here