কুয়েতে আটক সংসদ সদস্য : দেশের ভাবমূর্তির প্রশ্ন

54

মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশ কুয়েতে বাংলাদেশি সংসদ সদস্য কাজী শহীদুল ইসলাম পাপুলের গ্রেপ্তার ঘটনা উদ্বেগজনক। নিকট অতীতে অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটেছে বলে আমাদের জানা নেই। মানব পাচারের অভিযোগে এমন সময়ে এ গ্রেপ্তারের ঘটনা আমরা দেখছি, যখন বিষয়টি নিয়ে বিশ্বব্যাপীই আলোচনা হচ্ছে। বিশেষ করে সম্প্রতি লিবিয়ায় ২৬ জন বাংলাদেশি হত্যার পর দেশেও মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসন সরব হয়েছে। এমনকি সমকালের সংশ্নিষ্ট প্রতিবেদনে এসেছে, ওই সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধেও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্তে নেমেছে। তবে কুয়েতে তার গ্রেপ্তারের বিষয়টি কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের সংবাদমাধ্যম থেকেই আমরা জানছি। এখনও কেন প্রশাসনের তরফ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হচ্ছে না? বাংলাদেশি সংসদ সদস্য হিসেবে পাপুল নিশ্চয়ই কূটনৈতিক পাসপোর্টধারী। তার গ্রেপ্তারের পর কুয়েতে বাংলাদেশের দূতাবাসও সঠিক তথ্য জানাতে ব্যর্থ। অথচ বিষয়টি কেবল কাজী শহীদুল ইসলাম পাপুলের ব্যক্তিগত বিষয়ই নয় বরং বাংলাদেশেরও ভাবমূর্তি বিষয়।
কুয়েতে বাংলাদেশি সংসদ সদস্য আটকের বিষয়ে দূতাবাস কিংবা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কিছু না জানানোর একটা কারণ হতে পারে, কুয়েত কর্তৃপক্ষই বাংলাদেশকে কিছু জানায়নি। আমরা জানি, কুয়েতের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুপ্রতিম সম্পর্ক। মুসলিম বিশ্ব কিংবা ওইআইসির সদস্য হিসেবে তো বটেই, দ্বিপক্ষীক নানা ক্ষেত্রেও দেশটির সঙ্গে আমাদের কাজের সম্পর্ক। উপসাগরীয় যুদ্ধের পর কুয়েত পুনর্গঠনে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের কয়েক লাখ জনশক্তি কুয়েতে নানা প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে। আমাদের শ্রমিকরাও সেখানকার উন্নয়নে অবদান রাখছে। আবার ওইসব জনশক্তির পাঠানো অর্থে বাংলাদেশও লাভবান হচ্ছে। এমনকি গ্রেপ্তার হওয়া সংসদ সদস্য নিজেও কুয়েতে একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। ফলে দু’দেশের সম্পর্কের দিক থেকে সরকার গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিয়ে কুয়েত প্রশাসনের কাছে জানতে চাইতেই পারে। দূতাবাসের মাধ্যমেও সরকার বিষয়টিতে কুয়েতের অবস্থান জানতে পারে।
ঊস্তুত বাংলাদেশের একজন সংসদ সদস্যের মানব পাচারসহ অন্যান্য অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে ফেব্রুয়ারি মাসে কুয়েতের সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। সেখানকার আল কাবাসের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশি একজন সংসদ সদস্য সাম্প্রতিক সময়ে কুয়েতে এক মার্কিন বাসিন্দার সঙ্গে আর্থিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলেন। কুয়েতে আয় করা বেশিরভাগ অর্থই তিনি আমেরিকা পাঠিয়ে দিয়েছেন। সেই আল কাবাসের রোববারের প্রতিবেদনেই আমরা বাংলাদেশি ওই সংসদ সদস্যের গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত হই। প্রতিবেদনে অর্থ পাচার ও মানব পাচারের সঙ্গে সংশ্নিষ্টতার অভিযোগ আনা হয়। আমরা জানি, মানব পাচার ও অর্থ পাচার দুই-ই গুরুতর অপরাধ। এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে যে-ই জড়িত থাকবে, তার শাস্তি হওয়া চাই। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশর নিজস্ব আইন রয়েছে, তার শাস্তিও দেশের আইনেই হবে। কিন্তু সংবাদমাধ্যমে কুয়েতে এমপি পাপুলের গ্রেপ্তার ও তাকে রিমান্ডে নেওয়ার যে খবর আমরা দেখছি, সেটি দুঃখজনক।
আমরা চাই, প্রশাসন বিষয়টি আমলে নিয়ে গ্রেপ্তারকৃত কাজী শহীদুল ইসলাম পাপুলকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা পালন করুক। দেশে এনে তারপর আইন অনুযায়ী শাস্তি হবে। আমাদের দেশের একজন সংসদ সদস্যের অন্য দেশে বিচার কিংবা শাস্তির বিষয়টি দেশের জন্যও অনভিপ্রেত। কূটনৈতিক পাসপোর্টধারী একজন সংসদ সদস্যের বিদেশে ফৌজদারি অপরাধে গ্রেপ্তার হওয়া দেশের ভাবমূর্তির জন্য নেতিবাচক। তাই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। তাছাড়া এমনিতেই তাকে ফেরত আনতে হবে। কারণ ওই সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক। তার বিরুদ্ধে মানব পাচারের মাধ্যমে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের যে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, সেটি অবশ্যই অনুসন্ধান করতে হবে।
আমরা জানি, রাজনীতিতে রোমাঞ্চকর উত্থান ঘটেছে সংসদ সদস্য কাজী শহীদুল ইসলাম পাপুলের। রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেকটাই অপরিচিত হিসেবে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে তাক লাগিয়ে ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটে দাঁড়িয়ে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের সমর্থনও তিনি আদায় করতে সক্ষম হন। তার স্ত্রীও সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য। আমরা চাই, তার পরিচয় যা-ই হোক, তার অপরাধ নির্মোহভাবে অনুসন্ধান করতে হবে। অপরাধ প্রমাণ হলে আইন অনুযায়ী শাস্তিও কার্যকর করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তির রাজনৈতিক প্রভাব যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। আমরা জানি, মানব পাচারের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশ এখনও খারাপ দৃষ্টান্ত হিসেবেই রয়েছে। সরকার এর বিরুদ্ধে কঠোর হলেও এ অপরাধ না কমানোর পেছনে প্রভাবশালীদের হাত রয়েছে বলে অনেকেরই অভিযোগ। এ ক্ষেত্রে আলোচ্য সংসদ সদস্য সৃষ্টি করলেন আরেকটি নিকৃষ্ট নজির।

Previous articleদেশে ফের সর্বোচ্চ শনাক্তের রেকর্ড
Next articleদুপুর ২টা থেকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে ঝিনাইদহে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here