করোনাভাইরাস থেকে ‘জীবন বাঁচাতে পারে’ ডেক্সামেথাসোন

51

কল্যাণ ডেস্ক : ডেক্সামেথাসোন নামের একটি সস্তা ও সহজলভ্য ওষুধ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে বলে বড় ধরনের একটি পরীক্ষায় তথ্য এসেছে।
যুক্তরাজ্যের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, কম মাত্রার স্টেরয়েড ডেক্সামেথাসোন মারাত্মক এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বড় অগ্রগতি।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ওষুধ ভেন্টিলেটর সাপোর্টে থাকা রোগীদের মৃত্যুর ঝুঁকি এক তৃতীয়াংশ কমায়। আর অক্সিজেন সাপোর্টে থাকা রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকি কমায় এক-পঞ্চমাংশ।
বিদ্যমান কোনো ওষুধ করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রেও কাজ করে কিনা দেখার জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই ট্রায়ালের অংশ হিসেবে ডেক্সামেথাসোন নিয়েও গবেষণা করা হয়।
গবেষকরা ধারণা করেছেন, ওষুধটি যদি যুক্তরাজ্যে করোনাভাইরাস মহামারীর শুরু থেকেই ব্যবহার করা হত, তবে ৫ হাজার মানুষের জীবন বাঁচানো যেত।
ডেক্সামেথাসোন দামে সস্তা, ফলে বিপুল সংখ্যক কোভিড-১৯ রোগীর চিকিৎসা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে থাকা দরিদ্র দেশগুলোর জন্য এটি বিশাল উপকারে আসবে।
‘জীবন রক্ষাকারী’ :
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ২০ জনের মধ্যে প্রায় ১৯ জনই হাসপাতালে না এসেই সাধারণত ভালো হয়ে যান। হাসপাতালে যারা ভর্তি হন তাদেরও বেশিরভাগই সুস্থ হয়ে যান। তবে কারও কারও অক্সিজেন বা ভেন্টিলেশন সাপোর্ট লাগে। এরাই হলো উচ্চ ঝুঁকিযুক্ত রোগী যাদের ডেক্সামেথাসোন সাহায্য করেতে পারবে।
গবেষকরা দেখেছেন, করোনাভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করার চেষ্টা করতে গিয়ে দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সীমার বাইরে চলে গেলে যে ক্ষতি হয় তার কিছুটা কমাতে ওষুধটি সাহায্য করে।
দেহের এই অতিপ্রতিক্রিয়াকে বলা হয় ‘সাইটোকাইন ঝড়’ যা হতে পারে প্রাণঘাতী।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দলের নেতৃত্বে এই পরীক্ষায় হাসপাতালের প্রায় ২ হাজার রোগীকে ডেক্সামেথাসোন দেওয়া হয়েছিল। তাদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল এই ওষুধ পায়নি এমন প্রায় ৪ হাজার রোগীর।

ভেন্টিলেটরে থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে এটি মৃত্যুর ঝুঁকি ৪০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৮ শতাংশ করেছে। আর অক্সিজেন সাপোর্টে থাকা রোগীর ক্ষেত্রে এটি মৃত্যুর ঝুঁকি ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করেছে।
গবেষণা দলটির প্রধান তদন্তকারী অধ্যাপক পিটার হরবি জানান, এটি এখন পর্যন্ত একমাত্র ওষুধ যা মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে পেরেছে। এটি একটি বিশাল অগ্রগতি।
প্রধান গবেষক অধ্যাপক মার্টিন ল্যান্ড্রে জানান, গবেষণায় দেখা গেছে, এই ওষুধ দিয়ে ভেন্টিলেটরে চিকিৎসা করা প্রতি আট রোগীর একজনকে বাচানো যাচ্ছে। আর অক্সিজেন সাপোর্টে থাকা প্রতি ২০-২৫ জনের মধ্যে একজনকে বাঁচানো যাচ্ছে।
সস্তা ওষুধ :
কোভিড-১৯ রোগীদের মৃত্যু ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে প্রমাণিত প্রথম ওষুধটি কোনও নতুন, ব্যয়বহুল ওষুধ নয়। একটি পুরানো, একেবারে সস্তা একটি স্টেরয়েড।
১০ দিনের চিকিৎসায় ডেক্সামেথাসোনের খরচ প্রায় ৫ পাউন্ড। একটি জীবন বাঁচাতে গড়ে খরচ হচ্ছে মাত্র ৩৫ পাউন্ড। আর এই স্টেরয়েডটি পুরো বিশ্বেই সহজলভ্য।
প্রফেসর ল্যান্ড্রে জানান, হাসপাতালের রোগীদের এখনই দেরি না করে ওষুধটি দেওয়া উচিত। তবে ওষুধের দোকানে গিয়ে এটি কিনে বাড়িতে নেওয়া মোটেও ঠিক হবে না।
ডেক্সামেথাসোন করোনাভাইরাসের হালকা লক্ষণযুক্ত রোগীদের সাহায্য করে না বলে মনে করছেন গবেষকরা। যাদের শ্বাস নিতে সমস্যা হয় না তাদের এ ওষুধ দরকার নেই।
বিশাল প্রভাব :

বিদ্যমান ওষুধগুলো নিয়ে এই ট্রায়াল মার্চ থেকে চলছে। ট্রায়াল থেকে এরই মধ্যে ম্যালেরিয়ার ওষুধ হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন বাদ দেওয়া হয়েছে কারণ এটি মৃত্যু এবং হৃদরোগের সমস্যা বাড়িয়ে তোলে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রেমডেসেভির নামে আরেকটি ওষুধ কোভিড-১৯ রোগীদের সেরে ওঠার সময় কিছুটা কমিয়েছে বলে ট্রায়ালে দেখা যাওয়ায় এটির ব্যবহার আগেই শুরু হয়েছে।
কোভিড-১৯ চিকিৎসায় ডেক্সামেথাসোনের কার্যকারিতা উদঘাটন উদযাপন করার মতো বিষয়; কারণ বিশ্বব্যাপী রোগীরা সঙ্গে সঙ্গে এর সুবিধা পাবে। এর প্রভাব হবে বিশাল।
ডেক্সামেথাসোন ১৯৬০ দশকের গোড়া থেকেই ব্যবহার করা হয় রিউম্যাটয়েড আর্থাইসিস ও হাঁপানির মতো রোগের চিকিৎসায়। কোভিড রোগীদের যাদের ভেন্টিলেটর প্রয়োজন তাদের অর্ধেকই মারা যায়। তাই মৃত্যুর ঝুঁকি এক-তৃতীয়াংশ কমানোটাও বিশাল প্রভাব ফেলবে।
আইসিইউতে থাকা রোগীদের এটি ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া হয়। আর কম মারাত্মক রোগীদের এটি ট্যাবলেট হিসেবে খাওয়ানো হয়।
এর আগে রোগীদের উপকারে আসে এমন প্রমাণিত ওষুধ ছিল কেবল রেমডেসিভির, যা আগে কেবল ইবোলার জন্য ব্যবহৃত হতো।
এটি করোনাভাইরাস থেকে সেরে ওঠার সময়কাল ১৫ দিন থেকে ১১ দিনে কমাতে পারে বলে দেখা গেছে। তবে এটি মৃত্যুর হার হ্রাস করেছে কিনা-এর সপক্ষে শক্তিশালী কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। রেমডেসিভির একটি নতুন ড্রাগ যার সরবরাহ সীমিত আর দাম অনেক বেশি।

Previous articleদেশে একদিনে সর্বোচ্চ শনাক্ত ও মৃত্যুর রেকর্ড
Next articleবেনাপোল-শার্শার ‘রেড জোনে’ লকডাউন কার্যকর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here