করোনায় পেশা বদল : শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ান

0
11

শিক্ষাসহ নানা ক্ষেত্রে করোনাভাইরাসের যেভাব আমরা দেখছি, তা অনস্বীকার্য। দীর্ঘদিন লকডাউন ও সাধারণ ছুটির পর প্রায় এক মাস হতে চলেছে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড-সংশ্নিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান খুলেছে। কিন্তু করোনার প্রভাব না কমায় স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। ৬ আগস্ট পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এ ছুটি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে যৌক্তিক। যদিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এ দীর্ঘ ছুটির কারণে উল্লেখযোগ্য শিক্ষকই পড়েছেন বিপাকে। বিশেষ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত নন এমন অন্তত ১৪ লাখ শিক্ষক ও তাদের পরিবারে নেমে এসেছে দুর্দিন। এর ফলে ‘পেশা বদলাচ্ছেন শিক্ষকরা’। শনিবারের সমকালের এ-সংক্রান্ত শীর্ষ প্রতিবেদনে আমরা দেখেছি, বাঁচার তাগিদে শিক্ষকরা কীভাবে অন্য পেশা গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই বন্ধ হয়নি, বন্ধ হয়ে গেছে বেশিরভাগ শিক্ষকের বেতন। অনেক শিক্ষকের আয়ের একমাত্র পথ রুদ্ধ হওয়ায় কেউ বেছে নিচ্ছেন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা, কেউ রাজমিস্ত্রি, আবার কেউ মৌসুমি ফলও বিক্রি করছেন। এমনকি পেটের দায়ে স্ত্রী-সন্তান-পরিজন বাঁচাতে কেউ-বা ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক চালাচ্ছেন। করোনাকাল তাদের জীবনে যেভাবে ঘোর অমানিশা হয়ে এসেছে তা সত্যিই দুঃখজনক।
আমরা জানি, করোনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় যথাসময়ে শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি আদায় হয়নি। এর ওপর নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষকের বেতন নির্ভর করে বলে তারা বেতন পাচ্ছেন না। এ সময় শিক্ষকদের বেতনের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ রয়েছে প্রাইভেট-টিউশনিও। সমকালে প্রতিবেদনে এসেছে, দেশে প্রায় ৬৫ হাজার কিন্ডারগার্টেনে সাত লাখ শিক্ষকের বেতনও বন্ধ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান চলে ভাড়া বাড়িতে। ব্যক্তিমালিকানাধীন এসব প্রতিষ্ঠান শতভাগই নির্ভরশীল শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির ওপরে। করোনা সংকটের প্রভাব অনেক অভিভাবকের ওপরও পড়েছে। ফলে তাদের কাছ থেকে বকেয়া বেতন পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। একই অবস্থা আমরা দেখছি সারাদেশের ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও। আবার মাধ্যমিক শিক্ষাও যেখানে বিপুল অধিকাংশই বেসরকারি খাতে পরিচালিত হয় সেখানে করোনার প্রভাব পড়েছে অধিকাংশের ওপরই। কেবল ১৪ লাখ শিক্ষকই সমস্যায় পড়েননি, একই সঙ্গে আট লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীও বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এমনিতেই নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা পান না। ফলে তাদের আয়ের সব পথ যখন বন্ধ, তখন তারা অপছন্দনীয় পেশা বেছে নিতেও কুণ্ঠাবোধ করছেন না।
তবে আমরা মনে করি, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয় কেবল শিক্ষার্থীদের মাসিক বেতনই হওয়া উচিত নয়। এমনকি বেসরকারি শিক্ষকদের বেতনও কেবল শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির ওপর নির্ভরশীল হওয়া কাম্য নয়। বরং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেরই বিকল্প আয় থাকতে হবে। এবং অনেক প্রতিষ্ঠানেরই যে বিকল্প আয় রয়েছে তাও অজানা নয়। ফলে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা বেতন বঞ্চিত হবেন এমনটি কেন হবে? আমরা জানি, এমন অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে যাদের স্থায়ী সম্পত্তিই আয়ের বড় পথ। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান বিশেষ ব্যক্তি বা সংস্থার অনুদানে পরিচালিত হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠান চাইলেই টিউশন ফির বিকল্প আয় থেকে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে পারে। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কেউ তা পরিশোধ না করলে বিষয়টি অবশ্যই দেখতে হবে। একই সঙ্গে সমকালে বিশেষ লেখায় অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী প্রাতিষ্ঠানিক যে ত্রাণের ব্যবস্থা করার কথা বলেছেন, আমরা মনে করি সেটি গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষকরা সংকটে থাকলেও আত্মমর্যাদার কারণে লাইনে দাঁড়িয়ে ত্রাণ নিতে পারবেন না। তাই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের বাড়িতে বাড়িতে ত্রাণ পৌঁছানোর ব্যবস্থা বিষয়টি অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত।
আমরা জানি, বিভিন্ন স্তরের বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য করোনাকালে বিশেষ অনুদানের ব্যবস্থা করেছে সরকার এবং গত বুধবার এই অর্থ ছাড় করা হয়েছে বলে একটি জাতীয় দৈনিকের আলোচ্য প্রতিবেদনে এসেছে। প্রশ্ন হলো, এ অর্থ ছাড়ে এত দেরি কেন? করোনার এ জরুরি মুহূর্তে বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে আরও আগেই শিক্ষকদের এ অনুদান পৌঁছানো প্রয়োজন ছিল। মনে রাখা দরকার, শিক্ষকদের এককালীন পাঁচ হাজার ও কর্মচারীদের দুই হাজার পাঁচশ’ টাকার এ অনুদানও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এ জন্য স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেই। শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য আয় যেমন বাড়াতে হবে, একইসঙ্গে আপৎকালে শিক্ষক-কর্মচারীদের অন্তত ছয় মাসের বেতন-ভাতা দেওয়ার মতো ফান্ড তৈরির ব্যবস্থা করা উচিত প্রতিষ্ঠান প্রধান ও পরিচালনাকারীদের। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও অর্থ ব্যবস্থাপনায় সঞ্চয়ের নীতি জরুরি। একই সঙ্গে এমপিওভুক্তির বিষয়টিও চলমান রাখাসহ সমস্যাগ্রস্ত শিক্ষকদের বেশি পরিমাণে অনুদানের ব্যাপারে প্রশাসন ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে আমরা প্রত্যাশা করি।

LEAVE A REPLY