সোশাল মিডিয়া, আমরা ও আমাদের সন্তানরা

0
5

সাইফুল হোসেন
গত চার মাসের কাছাকাছি সময় ধরে আমরা স্বেচ্ছা কোয়ারেন্টিনে আছি। পয়লা জুন ২০২০ থেকে অনেকেই বাইরে বের হচ্ছেন সরকার স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে অফিস ও চলাচলে শিথিলতা দেওয়ার কারণে। তবু অনেকেই বাসায়ই আছেন, বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হচ্ছেন না। সরকার প্রধান বলেছেন যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখুনি খোলা হবে না এবং সচেতন মহল মনে করেন পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সেটা ঠিকও হবে না। তবে সীমিত পরিসরটা আমাদের দেশে আসলে সীমিত থাকেনা কারণ এত জনসংখ্যার ঘনত্ব যে দেশে সেখানে এটা মান্য করে চলা প্রায় অসম্ভব।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেহেতু খুলছে না এবং কেউ কারো বাসায় যাওয়া একপ্রকার বন্ধ সেজন্য স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া ছেলেমেয়েরা এখন ঘরবন্দি। এমন দুঃসময় তারা জীবনে পার করেনি। বাচ্চাদের জন্য একঘরে বসে থাকা প্রায়-অসম্ভব। গ্রামে প্রতি বাড়ির সামনে খোলা জায়গা আছে, সেখানে অন্তত মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ আছে। কিন্তু শহরে ঘরবন্দি মানে একটা রুমের মধ্যে একপ্রকার বন্দি জীবন, নেই সূর্যের আলো, নেই মুক্ত বাতাসের প্রবাহ।

কেমন আছে আমাদের ছেলেমেয়েরা
যে ছেলেমেয়েরা সকাল বেলা নাস্তা করে হুড়মুড় করে দৌড় দিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাঁদের এখন কার্যত কোন রুটিন নেই। সারাদিন তারা একটা ঘরের মধ্যে আবদ্ধ থেকে দুটি জাগরিত চোখকে সারাক্ষণ নিবদ্ধ রাখে মোবাইল স্ক্রিনে বা ল্যাপটপের পর্দায় বা টিভির পর্দায়। বই পড়া থেকে তারা মূলত দূরেই বলা যায়।
টেলিভিশন এখন কাউকে বেশিক্ষণ আটকে রাখতে পারেনা। নতুন নতুন বিষয় আছে ফেইসবুকে, ইউটিউবে, নেটফ্লিক্সে, টুইটারে, ইন্সটাগ্রামে ও অন্যান্য সোশাল মাধ্যমে। ওগুলো ছোট ছেলেমেয়েসহ সব বয়সের মানুষকে টানে। করোনাভাইরাসের এই সময়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা, ওদের মানুষিক ও শারীরিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, পড়াশোনা হচ্ছেনা বললেই চলে। সব চেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ঘুমে। ওদের ঘুমের শিডিউল পরিবর্তন হয়ে গেছে। আমার দুই মেয়ে প্রায় সারারাত জেগে থাকে, দিনে ঘুমায়। বড়দেরও একই সমস্যা হচ্ছে। করোনার আতংক, করোনাময় জীবনযাপন আমাদের পৃথিবী থেকে, অনেক ধরনের ভাল কাজকর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। সবাই বাসায় থাকছেন হয়তোবা কিন্তু কেউ কার সাথে খুব গল্পগুজব করে সময় কাটাচ্ছেন, তেমনটাও নয়। আমাদের সময়ের বেশির ভাগ দখল করে নিচ্ছে সোশাল মিডিয়া। কার্যত এই সোশাল মিডিয়া আমাদেরকে আন-সোশাল করে দিচ্ছে।
এর মধ্যে যে মাধ্যমটি ছোট বড় সবাইকে বেশি দিকভ্রান্ত করছে সেটি হল ফেইসবুক। এই প্রমাণ পাওয়া গেল সাম্প্রতিক এক জরিপে যেটা যৌথভাবে চালিয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘উই আর সোশাল’ আর কানাডাভিত্তিক ডিজিটাল সেবা প্রতিষ্ঠান হুটস্যুইট।

জরিপ কী বলছে?
বৈশ্বিক এই জরিপে উঠে এসেছে যে পৃথিবীর যেসব শহরে ফেইসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি তার মধ্যে ঢাকা হচ্ছে দ্বিতীয়। এখানে সক্রিয় ফেইসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২২ মিলিয়ন বা ২ কোটি ২০ লাখ। সবচেয়ে বেশিসংখ্যক সক্রিয় ফেইসবুক ব্যবহারকারী আছেন ব্যাংকক শহরে, ৩ কোটি। তৃতীয় স্থানে আছে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা। এই হিসেব এ বছরের এপ্রিল মাসের।
এ বছর জানুয়ারি মাসেও ঢাকার অবস্থান ছিল তৃতীয়। তখনও প্রথমে ছিল ব্যাংকক, সেখানে ফেইসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৪০ লাখ। দ্বিতীয় স্থানে ছিল মেক্সিকো সিটি, ১ কোটি ৯০ লাখ। আর তৃতীয় স্থানে ছিল ঢাকা, ১ কোটি ৬০ লাখ ফেসবুক ব্যবহারকারী নিয়ে।
দেশের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ফেইসবুক ব্যবহারকারী আছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মোট ২১ কোটি ৪০ লাখ। দ্বিতীয় স্থানে ভারত, ১৯ কোটি ১০ লাখ। এই জরিপ অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি ঘটছে চীনে, সেখানে ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ কোটির বেশি- প্রবৃদ্ধির হার ২১ ভাগ । দ্বিতীয় স্থানে ভারত, সেখানে সাড়ে ৫ কোটি সোশাল মিডিয়া ব্যবহারকারী, প্রবৃদ্ধির হার ৪০ শতাংশ। আট নম্বরে আছে বাংলাদেশ। একই জরিপে দেখা যাচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ায় জনসংখ্যার ইন্টারনেট ব্যবহারের ৭৮ শতাংশই মোবাইল সংযোগ নির্ভর।
পৃথিবীতে প্রায় ২৭০ কোটির বেশি লোক সক্রিয়ভাবে সোশাল মিডিয়া ব্যবহার করে। পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি লোক এখন একটি শক্তিশালী মোবাইল ফোন সাথে নিয়ে চলে। এই জরিপটিতে যে চিত্র উঠে এসেছে তা সব বয়সের মানুষের, শুধু অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের নয়।

ছোট ও বড়রা কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে
প্রথম আলোর সাম্প্রতিক তারুণ্য জরিপে উঠে এসেছে যে প্রতি ১০ জনে ৯ জন তরুণ-তরুণীর কাছেই ফেইসবুকের জুড়ি নেই।
ছেলেমেয়েরা মোবাইলে বা কম্পিউটারে পড়াশোনা করছে নাকি অন্যকিছু করছে তা আপনার বোঝার উপায় নেই। আপনিও যখন কোন ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসে আসক্ত হয়ে পড়ছেন তখন বুঝতে পারছেন না সময় কোন ফাঁক দিয়ে চলে যাচ্ছে। একটা আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে- আমরা কোন কাজ করে ক্লান্ত হয়ে গেলে মোবাইলের মাধ্যমে ফেইসবুকে ঢুকছি একটু ভাল বোধ করার জন্য, মানসিক শিথিলতার জন্য। হয়তো কোন একটা পোস্টের লাইক বা শেয়ার হয়েছে কিনা দেখতে আপনি ঢুকলেন- তারপর যে কোথায় গেলেন, কোন রাজ্যে হারিয়ে গেলেন তার ঠিক নেই, আপনার বোধশক্তি যেন হারিয়ে গেছে। কেউ এক মিনিটের জন্য ফেইসবুকে ঢুকে এক ঘণ্টা পরে হুঁশ ফিরে পাচ্ছেন। তবে কি এটা মাদকের চেয়ে আকর্ষণীয়? এটা মাদকের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিকর যে ব্যবহার করছেন তার জন্য?

সময় হন্তারক
সময় হন্তারক হিসেবে ফেইসবুক ও ইউটিউব সবচেয়ে বড় ভুমিকা পালন করছে। এগুলো যে ভাল কাজ করছে না বা ভালোভাবে এগুলোর ব্যবহার করা যায়না তেমনটি নয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সবার উৎপাদনশীল সময় নষ্ট হচ্ছে। যারা মদ্যপান করেন তারা বোতল শেষ হয়ে গেলে বুঝতে পারেন। কারণ মদ্যপায়ীর শরীর জানান দেয়। কিন্তু ফেইসবুক কাউকে কিছু জানান দেয়না, ব্যবহারকারীর মূল্যবান সময়কে এমনভাবে নষ্ট করে দেয় যে তিনি বুঝতেও পারেন না।
তাছাড়া স্ক্রিনাসক্ত মানুষের শরীর ও মনের উপর অযথা চাপ তৈরি হচ্ছে, পারিবারিক পারষ্পারিক সম্পর্ককেও ভেঙে দিতে অবদান রাখছে সোশাল মিডিয়া।

মেজাজ খারাপ হয়
অনেকক্ষণ ধরে স্ক্রিনে থাকার কারণে সবার মেজাজ খুব খারাপ হয়ে থাকে এবং কথা বলতে ভাল লাগে না। চোখ টনটন করতে থাকে, ঘাড় ব্যাথা করতে থাকে, হাত অবশ হয়ে যায় মাঝে মাঝে। ফলে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি কিন্তু কম নয়। ২০১৪ সালে অস্ট্রিয়ার একদল গবেষক কয়েক হাজার নারী পুরুষের উপর গবেষণা চালান। এদের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে না, অন্য অংশ বিশেষভাবে এর প্রতি আসক্ত। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ব্যবহার করেন না তাদের চেয়ে যারা ফেইসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়মিত ব্যবহার করেন তাদের মেজাজ বেশি খিটখিটে এবং অস্থির মনের।

ঘুম কমে যায়
স্ক্রিন আসক্তি ঘুমে খুব মারাত্মক প্রভাব ফেলে। বিজ্ঞজনরা বলছেন ঘুমানোর অন্তত দুই ঘন্টা আগেই মোবাইল দূরে রাখা উচিত কিন্তু ছেলেমেয়েরা এবং কোন কোন ক্ষেত্রে বড়রাও মোবাইল নিয়েই ঘুমাতে যাচ্ছেন। ফলে ভাল ঘুম হচ্ছে না, ঘুমাতে অনেক দেরি হচ্ছে। শহরে রাত বারোটা এখন কোন ব্যাপারই নয়। সোশাল মিডিয়া ব্যবহারকারীরা গড়ে প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে সময় কাটাচ্ছে এসব প্ল্যাটফর্মে। পুরা পৃথিবীতে এখন ইনসমনিয়া রোগের প্রাদুর্ভাব হয়েছে। করোনাভাইরাসের এই সময়ে তার প্রকোপ আরো অনেক বেড়েছে।

মন্দ আসক্তি
সোশাল মিডিয়া ব্যবহারে অধিকাংশ মানুষই সচেতন নয়। কী পোস্ট দিতে হবে, কী দেওয়া উচিত নয়- এই কান্ডজ্ঞান খুব কম মানুষের আছে। নিজেদের ব্যক্তিগত বিষয় আমরা হরহামেশা বিজ্ঞাপনের মত পোস্ট দিচ্ছি যা আমাদের সামাজিকভাবে হেয় করছে। আবার এমন সব পোস্ট দিচ্ছি যেটা সামাজিক অন্যায়কে উস্কে দিচ্ছে। তাছাড়া বিভিন্ন অসামাজিক ও ক্ষতিকর অনেক পোস্টতো আছেই যেসব না চাইলেই সবার নজরে আসে। ছোট ছেলেমেয়েরা এমনকি বড়রাও খারাপটাই বেশি গ্রহণ করছে কারণ খারাপ দিকটা গ্রহণ করা বা ঋণাত্মক দিকে ঝুঁকে পড়া মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি।
সামগ্রিক এই বাস্তবতায় আমরা কী করছি তা আমাদের ছেলেমেয়রা দেখছে। আমি টিভির সামনে বসে থেকে ছোট ছেলে বা মেয়েকে বলছি পড়তে যেতে। ওর ভাল লাগছে না। আমার উচিত টিভি, ওকে সম্মত করিয়ে বন্ধ করে আমার কাজ করা, তাহলে সেও পড়তে বসবে। আমার ছেলেমেয়ে যদি দেখে আমি বিকাল ৫টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত মোবাইল নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছি, ইউটিউবে গান শুনছি, বাচ্চাকে পড়তে উৎসাহিত করছি না- তাহলে আমার বাচ্চা মনে করবে বাবা-মা যা করছে তাই ভাল কাজ অর্থাৎ কয়েকঘণ্টা ধরে স্ক্রিনে থাকা বেঠিক কিছু নয়।
আমরা যদি প্রকৃত বাবা মা হয়ে উঠি তাহলে হয়তো সন্তানেরাও ভাল সন্তান হয়ে উঠবে বলে আশা করা যায়। বাচ্চারা যখন বড় হয় তখন বাবা-মা ছাড়াও বন্ধুবান্ধব, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রভাব থাকে এবং সেই প্রভাবও খুব শক্ত তবুও বাবা-মায়েরা যদি আপ্রাণ চেষ্টা করেন, সর্বোত্তম স্যাক্রিফাইস করেন তাহলে সন্তানদের ভাল করার, ভাল হবার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

LEAVE A REPLY