ভিআইপি লাইভস- ম্যাটার!

0
7

চিররঞ্জন সরকার
কালো কিংবা ফর্সা নয়, আমাদের দেশে সবচেয়ে মূল্যবান হচ্ছে ভিআইপিদের জীবন। করোনাকালে সেটা আবারও প্রকটভাবে প্রকাশিত হয়েছে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত সাধারণ মানুষ তেমনভাবে চিকিৎসাসেবা না পেলেও ভিআইপিদের চিকিৎসা পেতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। তাদের জন্য দ্রুততার সঙ্গে সিএমএইচ, এয়ার অ্যাম্বুলেন্স, হেলিকপ্টার, আইসিইউ, ভেন্টিলেটরসহ সব সুবিধা নিশ্চিত করা হচ্ছে। কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষগুলো চিকিৎসা না পেয়ে রাস্তাতেই মারা যাচ্ছে, তাদের কোনো খবর কেউ নিচ্ছে না। গত তিন মাসে করোনাভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে সিংহভাগ মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসা পায়নি। অনেকে বেঁচে থাকা অবস্থায় নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে পারেনি তারা করোনাভাইরাস আক্রান্ত কি না। কারণ এখানে এখন কেবল ভিআইপিরাই ‘মানুষের মর্যাদা’ পাচ্ছে। তাদের জীবনই মূল্যবান হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।
বাংলাদেশে ‘ভিআইপি’ শব্দটি বহুল ব্যবহৃত। ভিআইপি একটি বিশেষ শ্রেণির মানুষ। যারা অর্থে-বিত্তে-ক্ষমতা ও মর্যাদায় বিশেষ শ্রেণিভুক্ত। আমাদের দেশে ভিআইপিদের আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। ‘জানো, তুমি কার সঙ্গে কথা বলছ?’ ‘তুমি আমাকে চেন?’ ‘তুমি জানো, আমি কে?’ অথবা ‘আমারে চিনস?’ বাংলাদেশে এগুলো খুবই পরিচিত বাক্য। কাউকে লাইনে দাঁড়াতে বললে, কাউকে ট্রাফিক আইন মানতে বললে, কারও অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে, কারও জবরদখল সরাতে বললে এ রকম কথা শোনা যায়। কারা এ রকম বলেন? যারা ক্ষমতার ভারে আক্রান্ত। এটা হতে পারেন ক্ষমতাবান ভিআইপি কেউ, হতে পারেন ক্ষমতার ছোঁয়া লাগা তাদের ভাই, ভাতিজা, বন্ধু বা বন্ধুর ভাই কিংবা চেলা-শাগরেদ। পুলিশ, র‌্যাব, আইন, নীতি, শৃঙ্খলা- সবই তাদের ক্ষমতার অধীন। সর্বজনের টাকা তাদের টাকা।
আমাদের দেশে এটাও একটা ব্যাধি। একে বলে ভিআইপি রোগ। এক মহাজন লিখেছিলেন, ‘ভিআইপি কারা? যারা ইচ্ছা করলে আইন ভঙ্গ করতে পারেন। মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়ে যেখানে-সেখানে যখন-তখন ঢুকে যেতে পারেন। উল্টো রাস্তায় ভোম্বা সাইজের গাড়ি নিয়ে নিয়মনীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলে যেতে পারেন। ভিআইপি কারা? আইন যাদের ধরতে পারে না। যাদের কলমের খোঁচায় বা মুখের বাণীতে নদী হয় জমি, পাহাড় হয় সমতল, বিষাক্ত খাদ্য হয় উপকারী, খুনি হয় সাধু। ভিআইপি কারা? যারা যেখানেই যান না কেন সেখানে প্রশাসন, পুলিশ, র‌্যাব অন্য সব কাজ ফেলে তাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, আরাম-আয়েশ নিয়ে ব্যস্ত থাকে।’
আমাদের দেশে তো ভিআইপির সংখ্যা নেহাত কম নয়। হাতের কড়ায় এই শ্রেণিকে গুনে শেষ করা যাবে না। মন্ত্রীরা তো আছেনই, আছেন আমলা, সেক্রেটারি, সিনিয়র সেক্রেটারি, পুলিশ অফিসার, বিভিন্ন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আছেন সেনাবাহিনী, তারপর আছেন রাজনৈতিক নেতা, উপনেতা, ছাত্রনেতা এবং তাদের ছেলেমেয়েরা, এমন কী তাদের আত্মীয়স্বজন-বন্ধুবান্ধবরাও!
কবি জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন, “সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি”। আমরা জীবনানন্দকে ধার করে বলতে পারি, দেশের সব মানুষ মানুষ নয়, কেউ কেউ কেউ মানুষ। আরেক ধাপ এগিয়ে বলতে পারি, দেশের সব নাগরিক নাগরিক নয়, কেউ কেউ ভিআইপি। আর তারাই নাগরিক, তারাই মানুষ তারাই দেবতা। তারাই দেশ চালান। নীতি নির্ধারণ করেন। শিল্প-সংস্কৃতি নির্ধারণ করেন। এমনকি অন্যের মরা-বাঁচাও। তাদের জন্য নিরাপত্তা, বাড়ি-গাড়ি, প্লট, প্রণোদনা, চিকিৎসা, শিক্ষা, পর্যটন, বিনোদন, সম্মান, মর্যাদা-সব কিছু। তারা আছেন বলে অন্য সবাই আছে। তারা বাঁচেন বলেই অন্য সবাই বাঁচে। এই রাষ্ট্র তাদের জন্য।
দেশে ভিআইপি আছে, তাদের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধাও আছে। কিছু সুযোগ-সুবিধা ভিআইপি-দাবিদাররা বাগিয়ে নেন, জোর করে আদায় করেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রও এই ভিআইপিদের নানা লোভনীয় অফার দেন। কিন্তু রাষ্ট্র কেন জানি এ ব্যাপারে ঢাক ঢাক গুড় গুড় নীতি অবলম্বন করে। যদিও এর কোনো মানে নেই। রাষ্ট্র পরিষ্কারভাবে বলে দিলেই পারে, এইসব মানুষ হচ্ছে ভিআইপি। তাদের জন্য এই এই সুযোগ-সুবিধা পার্মানেন্ট করা হলো। ভিআইপি পদবি তো এই দেশে নতুন আসেনি। যুগ যুগ ধরে চলছে। খেলার মাঠে ভিআইপি, রেলের টিকিটে ভিআইপি, বিমানের টিকিটে ভিআইপি। সার্কিট হাউজগুলোতে ভিআইপিদের জন্য আলাদা কক্ষ আছে। বিমানবন্দরেও ভিআইপি লাউঞ্জ বলে আলাদা একটা ব্যাপার আছে। সংখ্যায় অল্প হলেও সবখানেই ভিআইপি আছেন। আমরা জানি, একটা সময় দক্ষিণ আফ্রিকা বর্ণবাদে জর্জরিত ছিল। সেখানে রাস্তার একপাশে লেখা থাকত- ফর হোয়াইট বা ‘শ্বেতাঙ্গদের জন্য’ আরেকপাশে লেখা থাকত ফর ব্ল্যাক বা ‘কালোদের জন্য’। রাষ্ট্রকে শ্বেতাঙ্গরা দুইভাবে ভাগ করে ফেলেছিল সেদিন। ইতিহাসের সেই কালো অধ্যায়ের সমাপ্তি হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে সেই ইতিহাস ভিন্ন ভাবে, ভিন্ন চেহারায় কিন্তু ঠিকই ফিরে ফিরে আসছে। শাসকরা ভিআইপি ও নন-ভিআইপি দুই ক্যাটাগরিতে দেশকে বিভাজিত করে ফেলেছেন।
বাংলাদেশে ভিআইপি না হলে ‘সম্মান’ বা ‘মর্যাদা’ পাওয়া যায় না। কেউ রাস্তা ছেড়ে দেয় না। বাড়তি খাতির করে না। তাইতো মহামারীতেও পরিবর্তন হয়নি বাংলাদেশের ‘ভিআইপি সংস্কৃতি’। বরং এখন তা যেন আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। টেস্ট, টেস্টের ফল পাওয়া, হাসপাতালে ভর্তি, সিট পাওয়া, অক্সিজেন সুবিধা পাওয়া, আইসিইউ পাওয়া সবকিছু নির্ভর করছে ভিআইপি হওয়া বা ভিআইপিদের রেফারেন্সের ওপর। বাংলাদেশের সমাজে ভিআইপি বা ক্ষমতাবান না হলে সাধারণ মানুষের পক্ষে যেকোনো সেবা পাওয়াই দুষ্কর। দেশের ভঙ্গুর চিকিৎসা ব্যবস্থাতে এমনিতেই বৈষম্য ছিল। কিন্তু এবার সেটি আরো প্রকট হয়েছে।
রাষ্ট্র আসলে কিছু মানুষকে আলাদা করার জন্য ভিআইপি এবং ভিভিআইপি হিসেবে চিহ্নিত করে। রাষ্ট্র যেহেতু চিরকালই অভিজাত শ্রেণির হাতে ছিল, সে কারণেই এটা অতীতের ধারাবাহিকতায় চলে আসছে। ক্ষমতাবানরা নিজেদের সাধারণ মানুষের চেয়ে আলাদা ভাবতে পছন্দ করেন। আর তারা সবখানেই নিজেদের জন্য বিশেষ সুযোগ বা আলাদা ব্যবস্থা রাখেন।
যদিও ভিআইপি জিনিসটি ঠিক সংবিধানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই মৌলিক অধিকারটি দিয়ে ২৮(১) অনুচ্ছেদ বলে, ‘কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র কোনো রকমের বৈষম্য প্রদর্শন করতে পারবে না।’
তবে, সংবিধানের ২৮(৪) অনুচ্ছেদে ‘পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী’ বা নাগরিকদের যে কোনো ‘অনগ্রসর’ অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ সুবিধার কথা বলা আছে। এখন প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কেন তাহলে ভিআইপি নাম দিয়ে মন্ত্রী, এমপি, ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা, শিল্পপতি, কোটিপতিসহ এই তথাকথিত ভিআইপিদের জন্য সবসময়, সবখানে বিশেষ সুবিধা প্রদানে তৎপর হয়ে ওঠে? তারা কি তবে ‘পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী’ বা সমাজের ‘অনগ্রসর অংশ’? যদি তাই হয়, তবে রাষ্ট্রকে সে কথা স্পষ্ট করে বলা দরকার।
জীবনের মৌলিক চাহিদা তো সবারই একই রকম। সেখানে ভিআইপিদের স্বার্থের পক্ষে রাষ্ট্র এমন প্রাণপাত করে কেন? সংবিধানের ১৫(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দ্বায়িত্ব হলো, তার প্রতিটি নাগরিকের জন্য অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকার কি কোনো বৈষম্য সৃষ্টি করতে পারে?
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ছাড়া কেউ ভিআইপি মর্যাদা পাবেন কিনা, সেটাও নির্মোহভাবে ভেবে দেখার সময় এসেছে। রাষ্ট্রের শীর্ষ দুই ব্যক্তিত্বের বাইরে যদি ভিআইপি কাউকে বলতেই হয় তবে সেটা হতে পারেন বিরোধী দলীয় প্রধান, সংসদের স্পিকার এবং প্রধান বিচারপতি। বিচার বিভাগের সদস্যরা বিবেচিত হতে পারেন সন্মানীয় হিসেবে। রাষ্ট্র ও সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাকিরা পরিগণিত হতে পারেন প্রজাতন্ত্রের ‘কর্মচারী’ অথবা নাগরিকদের ‘প্রতিনিধি’ হিসেবে। গণপ্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এর বাইরে কোনো ভিআইপি থাকতে পারে? না তাই থাকা উচিত?
করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় তথাকথিত ভিআইপিদের কয়েকটি বিশেষ হাসপাতালে বিশেষ সুযোগ দেয়া হচ্ছে, অথচ সাধারণ মানুষ ঠিকমতো টেস্টের সুযোগই পাচ্ছেন না। টেস্ট করাতে পারলেও রেজাল্ট পাচ্ছেন না। হাসপাতালে ভর্তি হওয়াটা তো এখন সবচেয়ে কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এই বিভাজন? রাষ্ট্রীয়ভাবে মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে বড়লোকদের জন্য বাড়তি সুযোগ-সুবিধা প্রদানের এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা আর কতদিন চলবে? গরিবের জীবন কি জীবন নয়? ভিআইপিরাই কেবল দেশের মানুষ?
ঈঙজঙঘঅ করোনা করোনা কাল করোনা টেস্ট করোনা সংক্রমণ করোনাভাইরাস চিকিৎসা ধনী-গরীব বৈষম্য নভেল করোনাভাইরাস নাগরিক সেবা প্রশাসন বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা বাংলাদেশের সংবিধান ভিআইপি ভিআইপি কালচার রাষ্ট্র সরকার
কলামিস্ট।

LEAVE A REPLY