মহামন্দা মোকাবিলায় সরকার প্রস্তুত : প্রধানমন্ত্রী

0
11


কল্যাণ ডেস্ক : বৈশ্বিক অর্থনীতি মহামন্দা মোকাবিলায় সরকার প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, করোনা মহামারির কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি মহামন্দার দ্বারপ্রান্তে। জাতি একটি ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এটা শুধু বাংলাদেশ নয়, সারাবিশ্বব্যাপী এই সমস্যা। তবে দেশের সব ধরনের মানুষ যাতে উপকৃত হয় এ জন্য আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। এ জন্য ১৯টি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে এ মন্তব্য করেন তিনি। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অধিবেশনে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের যাবতীয় ব্যবস্থাও সংসদে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি করোনাভাইরাসে মৃত্যুবরণকারী সবার আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করে বলেন, ‘এই প্রাণঘাতী বৈশ্বিক মহামারির হাত থেকে দেশবাসী ও বিশ্ববাসী যেন মুক্তি পান। চিকিৎসাধীনরা যেন সুস্থ হয়ে ওঠেন।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২০ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতি ৪ দশমিক ৯ শতাংশ সংকুচিত হবে বলে প্রাক্কলন দিয়েছে। করোনার প্রভাবে বিশ্বব্যাপী ১৯ কোটি ৫০ লাখ কর্মীর চাকরি হ্রাস, বৈশ্বিক এফডিআই প্রবাহ ৫ থেকে ১৫ শতাংশ হ্রাস এবং বৈশ্বিক রেমিট্যান্স ২০ শতাংশ হ্রাস পাবে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ঘোষণা দিয়েছে। ঠিক এই পরিস্থিতিতে আমরা বাংলাদেশে একটি বাজেট প্রণয়ন করেছি। এই বাজেট প্রণয়ন অত্যন্ত কঠিন ও দুরুহ কাজ ছিল। এই বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে জড়িতদের ধন্যবাদ জানাই।’
সাধারণ ছুটির মধ্যে তারা অক্লান্তপরিশ্রম করে বাজেট প্রণয়ন করায় সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান সরকারের আমলে এটি দ্বিতীয় বাজেট। আওয়ামী লীগ সরকার এ পর্যন্ত ২০টি বাজেট দিয়েছে। বাজেটে আমরা স্বাস্থ্য, কৃষি এবং সামাজিক নিরাপত্তা এগুলোতে জোর দিয়েছি।’
অতীতের মতো এই বাজেটও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলা করে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও জীবন জীবিকা রক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে বাজেট দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে সংসদ নেতা বলেন, ‘অনেকে বলছেন বাজেট একটু বেশি, আমরা খুব বেশি আশাবাদী, হ্যানো ত্যানো। সব সময় আমাদের একটা লক্ষ্য থাকতে হবে। কোভিড-১৯ এর জন্য সবকিছু স্থবির। আমরা আশাকরি, সব সময় আমরা আশাবাদী যে, না এই অবস্থা থাকবে না। এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটবে। যদি হঠাৎ উত্তরণ ঘটে আগামীতে আমরা কি করব সেটা চিন্তা করেই এই পদক্ষেপ নিয়েছি। ’
‘এরইমধ্যে আমরা প্রায় ১ লাখ ৩ হাজার ১১৭ কোটি টাকার ১৯টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছি। এই ১৯টি প্যাকেজ সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত যখন হবে তখন ১২ কোটি ৫৫ লাখ মানুষ সুবিধা পাবে। এ ছাড়া প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ কর্মসুরক্ষা ও নতুন কর্মসৃজন হবে।’
বাজেট প্রস্তাবনা যে সকল বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে চলতি অর্থ বছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ২ অর্জন করব বলে নির্ধারিণ করেছিলাম। তবে প্রথম ৮ মাসে আমরা ৭ দশমিক ৮ শতাংশ অর্জন করেছিলাম। করোনার কারণে সবকিছু বন্ধ হয়ে যাওয়াতে সেটা কমে যায় এবং সংশোধন করতে বাধ্য হই। যেটা ৫ দশমিক ২ শতাংশ ধার্য্য করেছি। আমরা আশা করি ২০২১ সালে বিশ্ব এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি কোভিড-১৯ এর প্রভাব থেকে ধীরে ধীরে বের হয়ে আসবে।’
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের অর্থনীতি পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসবে ধরে নিয়ে আগামী ২০২০-২০২১ অর্থ বছরের বাজেটে প্রবৃদ্ধির হার প্রাক্কলন করা হয়েছে ৮ দশমিক ২ শতাংশ। একই সময় নিম্ন মূল্য স্থিতি ধরে রাখার পাশাপাশি সামষ্টিক অর্থনীতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘অনেকে বলছেন বাজেট একটু বেশি, আমরা খুব বেশি আশাবাদী হ্যানো, ত্যানো। সব সময় আমাদের একটা লক্ষ্য থাকতে হবে। কোভিড-১৯ এর জন্য সবকিছু স্থবির। আমরা আশাকরি সবসময় আমরা আশাবাদী যে না এই অবস্থা থাকবে না। এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটবে। যদি হঠাৎ উত্তরণ ঘটে আগামীতে আমরা কি করব সেটা চিন্তা করেই এই পদক্ষেপ নিয়েছি।’
সংসদ নেতা বলেন, ‘যদি না করতে পারি, যদি কোভিড-১৯ শেষ না হয়, হয়তো বা পারব না বাস্তবায়ন করতে। কিন্তু আমাদের প্রস্তুতি থাকা দরকার বলে আমরা মনে করি। সেজন্যই আমরা উচ্চাভিলাষী বাজেটই দিয়েছি। দেব এই জন্য যে আমাদের তো একটা আকাঙ্ক্ষা আছে, বাংলাদেশের মানুষকে নিয়ে। তাদের জীবনমান উন্নত করব।’
প্রস্তাবিত বাজেটে প্রবৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রাক্কলনের যে অনুমানসমূহ বিবেচনা করা হয়েছে তা তুলে ধরে বলেন, (ক) করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের ফলে আমাদের অর্থনীতির উৎপাদন ব্যাহত হলেও অর্থনৈতিক অবকাঠামোর কোনো ক্ষতি হয়নি। যা প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা যুদ্ধের সময় সাধারণত হয়ে থাকে। (খ) সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির ফলে কর্মসৃজন ও ব্যক্তি আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়বে এবং প্রণোদনা প্যাকেজসমূহ সুষ্ঠু বাস্তবায়ন হলে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা মহামারীর পূর্ব অবস্থায় চলে আসবে। (গ) অক্টোবর বা নভেম্বর মাসের মধ্যে করোনা ভাইরাস প্রতিষেধক টিকা বাজারে চলে আসলে ইউরোপ আমেরিকায় জীবন যাত্রা দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যাবে আমাদের রফতানি আয় কোভিড-১৯ পূর্ববর্তি অবস্থায় আবার ফিরে যাবে। (ঘ) বিশ্ব বাজারে জ্বালানী তেলের মূল্য খুব কমে গিয়েছিল কিন্তু ধীরে ধীরে সেটা আবার বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরা আশাবাদী এর ফলে বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রবাস আয়ের বর্তমান সংকটও কেটে যাবে।
করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকারের গৃহিত পদক্ষেপের বিষয়গুলো তুলে ধরে সংসদ নেতা বলেন, আমরা ৪টি কৌশলগত কর্মপন্থা ঠিক করেছি। তা হচ্ছে (ক) সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি করণ, কর্মসৃজনকে প্রাধান্য দেওয়া বিলাসী ব্যয় নিরুসাহিত করা এবং কম গুরুত্বপূর্ণ ব্যয় পিছিয়ে দেওয়া। (খ) আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ প্রণয়ন। (গ) সামাজিক সুরক্ষার আওতা বৃদ্ধিকরণ, (ঘ) বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধি করা।
সংসদ নেতা বলেন, ‘করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে অর্থনীতির প্রভাব কার্যকরীভাবে মোকাবিলা করার জন্য প্রায় ১ লাখ ৩ হাজার ১১৭ কোটি টাকার ১৯টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছি। প্রণোদনা প্যাকেজসমূহ বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। এরইমধ্যে ৫ কোটি ৭০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষভাবে সুবিধা পেয়েছে। ১৯ টি প্যাকেজ সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত যখন হবে তখন ১২ কোটি ৫৫ লাখ মানুষ সুবিধা পাবে। এছাড়া প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ কর্মসুরক্ষা ও নতুন কর্মসৃজন হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ সব কিছু বিবেচনায় নিয়ে অর্থমন্ত্রী ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের ১৭তম বাজেট, বর্তমান মেয়াদের দ্বিতীয় বাজেট। স্বাধীনতার পর পর ১৯৭২ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তিনি যে বাজেট দিয়েছেন তিনি ৩টা বাজেট দেওয়ার সুযোগ পেছিলেন। কাজেই সর্বসাকুল্লে ২০ বাজেট আওয়ামী লীগ সরকার এ দেশকে উপহার দিয়েছে। এই বাজেটে অর্থনীতি পুনঃগঠন এবং করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় জীবন ও জীবিকা রক্ষাকে প্রাধান্য দিয়েছি। তাছাড়া বর্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে প্রাধান্য দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য, কৃষি, কর্মসৃজন এবং সামাজিক সুরক্ষা এবং নিরাপত্তা এগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়েছি।’

LEAVE A REPLY