সফল রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা বনাম অতীতের লুটতরাজ

0
19

নিজাম চৌধুরী
এটা একটি বিশাল কালজয়ী ইতিহাস রচনার মত কাজ। ছোটখাটো কোনো লেখনীর মাধ্যমে এর বর্ণনা সম্ভব নয়। বাঙালি জাতির মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় স্বাধীনতার শত্রুরা সপরিবারে হত্যা করেই শুধু ক্ষান্ত হয়নি, এ জঘন্য হত্যাকান্ডের বিচার যেন কোনোদিন হতে না পারে সে জন্য তারা জাতীয় সংসদে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের নামে কালো আইন পাশ করেছিল।
সেনা ছাউনি থেকে বেরিয়ে এসে রাতারাতি রাজনৈতিক নেতা বনে গিয়ে দীর্ঘ একুশ বছর যাবত বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে পর্যায়ক্রমে দখল করে রাখার উন্মত্ত খেলায় মেতে ওঠা জিয়া-খালেদা-এরশাদ গংরা এদেশের রাজনীতিকে শুধু ধ্বংসই করে নাই বরং পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশের সুনাম, অবকাঠামো ও অর্থনীতিকে এতই দুর্বল করে দিয়েছিল যে, সেটা আজকের এ পর্যায়ে আবারও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে সে সময় কেউ কখনো কল্পনাও করতে পারেনি। আর এ উন্নয়নের মূল রূপকার, স্বপ্নদ্রষ্টা ও বাস্তবায়নকারী হচ্ছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা।
স্বাধীনতা বিরোধীরা আমাদের জাতীয় চার নেতাকে জেলখানার অভ্যন্তরে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে খুন করেছে। জাতীয় চার নেতা বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বাংলাদেশকে পরিচালিত করতে পারতেন, তাই তারা চার নেতাকে জেলখানার অভ্যন্তরে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় খুন করে।
২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত তারা আওয়ামী লীগের একুশ হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করেছে, পঙ্গু করে দিয়েছে সারা দেশের লাখেরও বেশি নেতাকর্মীকে। সামরিক ছাউনি থেকে জন্ম নেওয়া এসকল রাজনৈতিক অপশক্তিগুলো নিজেদের শক্তি বৃদ্ধির জন্য এদেশের স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদেরকে, রাজাকার, আলবদরদেরকে শুধু রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করে নাই, তারা নিজেদের আখের গোছানোর সাথে সাথে ওদেরকেও অর্থনৈতিকভাবে মজবুত ভিত্তির উপরে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটতরাজ করে সৃষ্টি করছে একটি নব্য ধনিক শ্রেণি যাদের অধিকাংশই ছিল এদেশের স্বাধীনতার বিরোধী শক্তি ও যুদ্বাপরাধীদের পরিবার। সেনাবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও জওয়ানদেরকে জিয়ার আমলে ঘটে যাওয়া ১৯ বারের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সময়ে মিথ্যা অভিযোগে এনে নির্বিচারে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করেছে। পাকিস্তানিদের শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের আদলে, জিয়া একজন সেক্টর কমান্ডার হয়েও মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদেরকে, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের প্রতিটি মানুষকে বেঁছে বেঁছে হত্যা করেছে, আর বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদেরকে করেছে পুরস্কৃত। হত্যাকারীদেরকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোতে চাকুরি দিয়ে পুরস্কৃত ও প্রতিষ্ঠিত করার জিয়ার এ জঘন্য কাজটি এদেশের সকল সচেতন নাগরিকদেরকে সে সময় বিস্মিত ও হতবাক করেছিল। কিন্ত প্রতিবাদ করার কোনো সুযোগ ছিল না।
পাকিস্তানিরা যেভাবে ২৪টি বছর এ দেশের জনগণকে শোষণ-নির্যাতন করেছিল, অনুরূপভাবে জিয়া ও তার দোসরেরা মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে শেষ করে দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বাংলাদেশের সর্বপ্রাচীন ও সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল, যে দলটির নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ব সংগঠিত হয়েছিল সে দলটিকেও চিরতরে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে শেষ করে দেওয়ার নোংরা খেলায় মেতে ছিল।
‘৭৫ পরবর্তী সময়ে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের একজন কর্মী ছিলাম। জিয়ার সকল কুকর্মের চাক্ষুষ সাক্ষী হিসাবে আমি ও আমার মত হাজার হাজার আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রলীগের নেতাকর্মী এখনও জীবিত আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ওপর মধ্যযুগীয় বর্বতার আদলে নির্যাতন চালানো হতো।
১৯৮১ সালের ১৭ মে ছিল বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জন্য একটা ঐতিহাসিক দিন ও টার্নিং পয়েন্ট। বঙ্গবন্ধুর কন্যা, আজকের পৃথিবীর অন্যতম একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য কত যে জরুরি ছিল সেটা বিগত বছরগুলোর বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণের মাধ্যমে আজ সহজেই অনুমেয়। ৩৯ বছর পূর্বের সেই দিনটিতে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার এক ঐতিহাসিক পটভূমি তৈরি করেছিল। স্বাধীতাবিরোধী ও তাদের দোসরেরা বিগত ৩৯ বছর যাবত জননেত্রী শেখ হাসিনাকে ২১ বার হত্যা করার অপচেষ্টা করেছিল। আর এখনও সুযোগ পেলেই তারা আবারও সেই পুরোনো খেলায় যে মেতে উঠবে এ ব্যাপারে আমার বিন্দুমাত্রও সন্দেহ নাই।
আমরা বাঙালিরা প্রশংসা করতে জানি না। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতা অর্জিত হওয়া, অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পরও জননেত্রী শেখ হাসিনা বিগত ৩৯ বছর যাবত আমানবিক পরিশ্রম করে, প্রতিমুহূর্তে মৃত্যু অবজ্ঞা করে বাংলাদেশকে আজ পৃথিবীর বুকে একটি ইমার্জিং টাইগারের অর্থনীতির দেশ, আধুনিক ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে দিচ্ছেন সেটা কি এ দেশের জনগণ মূল্যায়ন করার ক্ষমতা রাখে? এ প্রশ্নের উত্তরের জন্য আমাদেরকে আরও অনেক দিন বেঁচে থাকতে হবে।
কোভিড-১৯ সারা পৃথিবীর জন্যই এক বিশাল সমস্যা। মহামারীর ভয়াবহ এই পরিস্থিতিতে যখন আমেরিকাসহ উন্নত বিশ্বের সকল দেশগুলো দিশেহারা, উন্নত দেশগুলোতে ভয়ানক মৃত্যুর মিছিল যেখানে থামছেই না, বাংলাদেশও তার বাইরে নয়। কিন্তু শেখ হাসিনা সীমিত সুযোগ ও সামর্থের মধ্যে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে মহামারী মোকাবেলা করে যাচ্ছেন।
৬ কোটি নাগরিকেকে নগদ অর্থ সহায়তা ও খাদ্য সামগ্রী বিতরণের আওতায় নিয়ে এসে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। তার অনুরোধে বেসরকারি খাতের ছোট থেকে বড় সকল ব্যবসায়ী, বেসরকারি ব্যাংকগুলো ও ধর্নাঢ্য ব্যক্তিরা সারাদেশে ব্যাপক ত্রাণ বিতরণ করে যাচ্ছেন। ব্যবসায়ীরা মানবতার এক উজ্জল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে দেশের ভাবমূর্তি বিশ্বব্যাপী অনেক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার ত্রাণ তহবিলে ব্যবসায়ী, সরকারি ও বেসরকারি খাতের কর্মজীবীসহ সকল স্তরের জনগণ উদার হস্তে অনুদান দিয়েছেন।
নেত্রীর একক নেতৃত্বে এতসব করার পরও একটা শ্রেণি সবসময় সোশ্যাল ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে ন্যাক্কারজনকভাবে নোংরা সমালোচনা করেই যাচ্ছে। আজ পর্যন্ত তারা শেখ হাসিনা সরকারের কোনো অর্জনকেই সাধুবাদ জানায় নাই। তার কারণ হলো একটাই, আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার বিরোধিতা করাই তাদের একমাত্র কাজ। আওয়ামী লীগ বিরোধী শক্তিগুলোকে এক প্ল্যাটফরমে ঐক্যবদ্ধ করে বাংলাদেশকে একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করাই তাদের মুল উদ্দেশ্য।
জিয়া-এরশাদের কথা আপাতত আলোচনায় নাই বা আনলাম, খালেদা জিয়া তো সোয়া দুই মেয়াদে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। সারা বাংলাদেশের উন্নয়নের কথা নাই বা বললাম, শুধু তার নির্বাচনী এলাকা ফেনী-১ সহ সারা ফেনী জেলাতে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নয়নের ছোঁয়া রেখে যেতে পারেন নাই। ফেনীতে একটি আধুনিক হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করে যেতে পারতেন। ওনারা তো সারাক্ষণ ব্যস্ত ছিলেন জামাতসহ মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিকে শক্তিশালী করে নিজেদের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার কাজে। জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়ার আমলে আওয়ামী লীগ বিরোধিতা, মহান মুক্তি সংগ্রামের বিরোধীতা, আর এ সকল গোষ্ঠীকে সকল স্তরে প্রতিষ্ঠিত করাই ছিল উনাদের মূল কাজ। দেশকে বার বার দুর্নীতিতে শীর্ষ তালিকায় নিতে কখনো কিন্তু পিছ পা হননি বেগম জিয়া, এ সকল ব্যাপারে পারদর্শিতার কারণে যদি বেগম জিয়াকে আপোষহীন নেত্রী বলতে হয় তা তো বলা যেতেই পারে।
১৯৭৫ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে সকল নোংরা খেলাগুলো জিয়া-বেগম জিয়া ও এরশাদ গংরা খেলেছেন সে সকল বিষয় নিয়ে অন্য সময়ে বিস্তারিত লেখার ইচ্ছা রইল।
আজকের বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, অবকাঠামো, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এক অনন্য উচ্চতায়। নিম্ন মধ্যবিত্ত আয়ের দেশে পরিণত হওযার পর এখন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার মহাযজ্ঞ চলমান। সর্বোপরি ২০৪১ সালে বাংলাদেশকে একটি উন্নত সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করার লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে অবিরাম পরিশ্রম করে যাচ্ছেন শেখ হাসিনা। যতদিন তিনি বেঁচে থাকবেন ততদিন তিনি এদেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্বির জন্য কাজ করে যাবেন এটাই পুরো জাতির প্রত্যাশা।
আমরা সবাই জানি ২১০০ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা জীবিত থাকবেন না। কিন্ত পরবর্তী প্রজন্মের কথা চিন্তা করে ২১০০ সালের জন্য ডেল্টা প্ল্যানের ঘোষণা ও তা বাস্তবায়নের সকল কার্যক্রমের পরিকল্পনা করে বিশ্বের বুকে একজন দূরদর্শী নেত্রী হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হয়েছেন। শেখ হাসিনার জন্য আজ আমরা জাতি হিসাবে গর্বিত।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বে অর্জিত হয়েছে। আজকের বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে একটি উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করার মহান দায়িত্ব তারই সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাই করে যাচ্ছেন, মাঝখানে যারা অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছিল তারা বাংলাদেশের উন্নয়ন সমৃদ্ধিতে কোনো আবদানই রাখেনি, বরং দেশের সম্পদ লুটতরাজ করে বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়ে সেগুলো এখন বিদেশে বসে বসে ভোগ করছে। আর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।
পরিশেষে, জাতি আজ মুজিব শতবর্ষ পালন করছে এবং অতীতের সকল গ্লানি ধুয়ে মুছে নুতন দিগন্তের দিকে যখন এগিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই কোভিড-১৯ মহামারী সাময়িকভাবে সারাবিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাকেও থমকে দিয়েছে। কিন্ত বাঙালি দমে যাবার জাতি নয়, পুর্বদিগন্তে আবারও নুতন সুর্য উদিত হবে আর বাঙালিরা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আবারও নতুন উদ্যমে একটি সুখী-সমৃদ্বশালী দেশ হিসাবে বাংলাদেশকে গড়ে তুলবে যেটা ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের আজীবনের লালিত স্বপ্ন।

রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক, চেয়ারম্যান, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক

LEAVE A REPLY