সমতট থেকে ঝড়ের বেগে সর্বোচ্চ শৃঙ্গে আরোহণ

0
13

বীরেন্দ্র নাথ অধিকারী
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ভারতবর্ষের মধ্যে বাংলার একাধিক বিপ্লবী ও জাতীয়তাবাদী নেতা সামনের কাতারে চলে আসেন। বাংলা থেকে পর্যায়ক্রমে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ উভয় দলের মূল নেতৃত্ব আসীন হন। তাদের মধ্যে রয়েছেন- নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, মাস্টারদা সূর্য সেন, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, শের-ই-বাংলা এ, কে, ফজলুল হক প্রমুখ। তবে ৪৭-এ দেশ বিভাগের পর নতুন মেরুকরণে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এক ঝাঁক র‌্যাডিক্যাল তরুণ নেতৃত্বের আবির্ভাব ঘটে। এদের মধ্যে গোপালগঞ্জের নিভৃত পল্লীতে জন্ম নেয়া ও বেড়ে ওঠা শেখ মুজিবুর রহমান ধাপে ধাপে সকলকে ছাড়িয়ে নেতৃত্বের শিখরে উঠে আসেন। মুসলিম লীগ ঘরানায় রাজনীতিতে হাতেখড়ি হলেও পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই তার মধ্যে বাঙালি জাতীয়তাবাদভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক আদর্শ এমনভাবে প্রোথিত হয় যে, বাঙালিদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক, ভাষা-সাংস্কৃতিক তথা সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে প্রধান মুখপাত্র হিসেবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। ক্রমান্বয়ে দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সবার নিকট শেখ মুজিব হয়ে ওঠেন প্রিয় ‘মুজিব ভাই’, ‘শেখ সাহেব’, ‘বঙ্গবন্ধু’ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের ‘জাতির পিতা’। এসব কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য তিনি ক্রমান্বয়ে মুসলিম লীগ ঘরানার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসেন এবং সমমনা বয়োজ্যেষ্ঠ, সমবয়সী ও বয়োকনিষ্ঠদের সহায়তায় প্রধান সংগঠক হিসেবে ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগ এবং ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ নামের দু’টি প্রগতিশীল সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলা এবং বাঙালিদের অধিকার আদায় ও রক্ষায় তিনি সর্বদা সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন সেই ভাষা আন্দোলনের সূচনালগ্ন থেকেই। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত কর্তৃক উত্থাপিত বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব পাকিস্তান গণপরিষদে বাতিল হয়ে যাবার পর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটান বঙ্গবন্ধু। ঐ বছর ২ মার্চ তিনি একটি সর্বদলীয় সম্মেলনের আয়োজন করতে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। এরপর কারাগারের ভিতরে ও বাইরে যখন যেখানে থেকেছেন সেখান থেকেই সমানতালে বাঙালিদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, নেতৃত্বে আসীন হয়েছেন স্বমহিমায় বঙ্গবন্ধু। সে সময়ে তার সমসমায়িক ছোট, বড় ও সমবয়সী এবং সমপর্যায় বা বড়মাপের বহু রাজনীতিবিদের পদচারণা থাকলেও বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি আর বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার দৃঢ় প্রত্যয়ে নেতৃত্বের সমতট থেকে ঝড়ের বেগে সর্বোচ্চ শৃঙ্গে আরোহন করেন বঙ্গবন্ধু এইভাবে-
জেলের ভিতরে ও বাইরে থাকা অবস্থায় ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সাল রাষ্ট্রভাষার আন্দোলনে নেতৃত্বদান, জেলে থাকা অবস্থায় ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠাকালে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়া, ১৯৫০ সালের জানুয়ারি মাসে দুর্ভিক্ষবিরোধী মিছিলের নেতৃত্বদান; ১৯৫৩ সালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়া, হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দী যুক্তফ্রন্ট গঠনের মাধ্যমে ১৯৫৪ সালের ১০ মার্চ অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিশেষ ভূমিকা পালন, উক্ত নির্বাচনে জয়লাভ ও মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়া, ২৯ মে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ব পাকিস্তানের যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে দেবার পর ৩০ মে করাচি থেকে ঢাকা ফেরার পর বিমানবন্দরে আটক হওয়া ও ২৩ ডিসেম্বর মুক্তিলাভ করা; ১৯৫৫ সালের ৫ জুন পাকিস্তান আইন পরিষদের সদস্য মনোনীত হওয়া, ১৭ জুন পল্টন ময়দানের সম্মেলনে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্ত্বশাসনসহ ২১ দফা দাবি উত্থাপন করা ও ২৫ অগাস্ট করাচিতে পাকিস্তানের গণপরিষদে ‘পূর্ব বাংলা’র নাম ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নয় ‘পূর্ব বাংলা’ বহাল রাখার দাবি উত্থাপন করা; ১৯৫৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি মুখ্যমন্ত্রীর নিকট খসড়া সংবিধানে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্ত্বশাসন অন্তর্ভূক্ত করার দাবি উত্থাপন, ১৪ জুলাই রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে সামরিক উপস্থিতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো, ৪ সেপ্টেম্বর দুর্ভিক্ষবিরোধী মিছিলে নেতৃত্ব দেবার সময় পুলিশের গুলিতে তিনজন নিহত হওয়া, ১৬ সেপ্টেম্বর কোয়ালিশন সরকারের শিল্প, বাণিজ্য, শ্রম, দুর্নীতিরোধ এবং গ্রামীণ সহায়তা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করা; ১৯৫৭ সালের ৩০ মে দলের জন্য সম্পূর্ণ সময় ব্যয় করার তাগিদে মন্ত্রীপরিষদ থেকে পদত্যাগ করা, ৭ অগাস্ট সরকারি সফরে চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন গমন; ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা ও সেনাবাহিনী প্রধান আইয়ুব খান দেশে সামরিক আইন জারি করে সকল ধরনের রাজনৈতিক কর্মকান্ড নিষিদ্ধ ঘোষণার পর ১১ অক্টোবর আটক হওয়া, জেলে থাকা অবস্থায় বেশ কয়েকেটি মিথ্যা অভিযোগের আসামী হওয়া, ১৪ মাস একটানা আটক থাকার পর মুক্তি পাওয়া, জেলের ফটক থেকে আবার গ্রেফতার হওয়া; উচ্চ আদালতে রিট পিটিশনের মাধ্যমে ১৯৬১ সালে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে প্রকাশ্য রাজনীতি শুরু করা, বাঙালি জাতীয়তাবাদভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তরুণ ছাত্রনেতাদের নিয়ে গোপনে ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলা ও কর্মকান্ড পরিচালনা করা; ১৯৬২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি জননিরাপত্তা আইনে আটক হওয়া, ২ জুনের চার বছরব্যাপী সামরিক শাসন অপসারণের পর একই মাসের ১৮ তারিখে কারামুক্ত হওয়া, ২৫ জুন অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের সমন্বয়ে আইয়ুব খান আরোপিত বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুর বিরুদ্ধে সংগ্রামে নেমে পড়া, ৫ জুন পল্টন ময়দানে আয়োজিত সম্মেলনে আইয়ুব খানের কঠোর সমালোচনা করা, ২৪ সেপ্টেম্বর লাহোর গিয়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে মিলে বিরোধী দলসমূহের একটি সাধারণ কাঠামো হিসেবে কাজ করার জন্য জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠন করা, জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে পুরো অক্টোবর মাসজুড়ে সোহরাওয়ার্দীর সাথে পূর্ব বাংলার বিভিন্ন স্থান সফর করা; ১৯৬৩ সালে সোহরাওয়ার্দী লন্ডনে চিকিৎসারত থাকা অবস্থায় তার সাথে আলোচনার উদ্দেশ্যে সেখানে গমন করা; সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর ১৯৬৪ সালের ২৫ জানুয়ারি নিজ বাসভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আওয়ামী লীগকে পুনঃসংহত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা, ১১ মার্চ সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠনের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধকল্পে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা, সেনাশাসক আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্র পরিকল্পনা, সামরিক শাসন ও এক-ইউনিট পদ্ধতির প্রধান বিরোধীতাকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা; আইয়ুব বিরোধী প্রার্থী ফাতিমা জিন্নাহকে সমর্থনদান করা ও নির্বাচনের দুই সপ্তাহ পূর্বে আটক হওয়া, রাষ্ট্রদ্রোহীতা ও আপত্তিকর প্রস্তাব পেশের অভিযুক্ত হিসেবে এক বছরের কারদন্ডে দন্ডিত হওয়া; ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলসমূহের একটি জাতীয় সম্মেলনে প্রাদেশিক পূর্ণ স্বায়ত্ত্বশাসনসহ ছয় দফা উত্থাপন করা, ১ মার্চ আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়া, ছয় দফার পক্ষে সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে উল্কার বেগে গোটা পূর্ব বাংলাব্যাপী অভিযান পরিচালনা করা, দেশব্যাপী ভ্রমণের সময় সিলেট, ময়মনসিংহ, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে একাধিকবার পুলিশের হাতে বন্দী হওয়া, তার মুক্তির দাবিতে ৭ জুন দেশব্যাপী ধর্মঘট পালিত হবার সময় পুলিশের গুলিবর্ষণে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে তিনজন নিহত হওয়া; সেনাবাহিনী কর্তৃক আটক হয়ে দুই বছর জেলে থাকার পর ১৯৬৮ সালের প্রথমদিকে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক দায়েরকৃত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামী হয়ে ঢাকা সেনানিবাসে অন্তরীণ থাকা, ১৯ জুন মামলার শুনানি শুরু হলে দেশব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় ওঠা, বিচারকার্য চলাকালীন ১৯৬৯ সালের ৫ জানুয়ারি ছয় দফার সবগুলো অন্তর্ভুক্তিসহ কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক এগার দফা দাবি উত্থাপন করা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের দেশব্যাপী ছাত্র আন্দোলন পরিচালনার মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে তা গণআন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করা, মাসব্যাপী প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ আন্দোলন, ১৪৪ ধারা ও কারফিউ ভঙ্গ, পুলিশের গুলিবর্ষণ এবং অনেক হতাহতের পর আন্দোলন চরম রূপ ধারণের মাধ্যমে গণঅভ্যুত্থানের ফলে পাকিস্তান সরকারের ছাড় দিতে বাধ্য হওয়া ও রাজনৈতিক নেতাদের সাথে গোলটেবিল বৈঠকের পর স্বৈরশাসক আইযুব খান কর্তৃক এই মামলা প্রত্যাহার করে নেয়া, বঙ্গবন্ধুসহ অভিযুক্ত সকলকে মুক্তি দেয়া, আইয়ুব খান পদত্যাগ করে ইয়াহিয়ার খানের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করা, ২৩ ফেব্রুয়ারি তারিখে পূর্ব বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সম্মানে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক আয়োজিত লাখ লাখ জনাতার বিশাল জনসভায় তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা, উক্ত জনসভায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের এগার দফা দাবির প্রতি বঙ্গবন্ধুর পূর্ণ সমর্থনদান করা, আইয়ুব খানের আহ্বানে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক তার ছয়-দফাসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের চাহিদাগুলো মেনে নেবার আহ্বান জানানো, তার আহ্বান প্রত্যাখ্যাত হলে সম্মেলন থেকে বের হয়ে আসা, ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত জনসভায় বঙ্গবন্ধু কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানকে ‘বাংলাদেশ’ নামে অভিহিত করে এভাবে ঘোষণা প্রদান করা- “একটা সময় ছিল যখন এই মাটি আর মানচিত্র থেকে বাংলা শব্দটি মুছে ফেলার সব ধরনের প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। বাংলা শব্দটির অস্তিত্ব শুধু বঙ্গোপসাগর ছাড়া আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যেত না। আমি পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আজ ঘোষণা করছি যে, এখন থেকে এই দেশকে পূর্ব পাকিস্তানের বদলে ‘বাংলাদেশ’ বলা হবে”। এই ঘোষণার ফলে সারাদেশে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়া, পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনীতিবিদ এবং সামরিক কর্তাবৃন্দ কর্তৃক বঙ্গবন্ধুকে একজন বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে মূল্যায়িত করতে শুরু করা, সংস্কৃতি ও জাতিগত আত্মপরিচয়ে বহিঃপ্রকাশের ফলে প্রাদেশিক স্বায়ত্বশাসনের বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ হওয়া, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালিদের আন্দোলন দ্বি-জাতি তত্ত্বকে অস্বীকার করা হিসেবে প্রতিভাত হওয়া, বাঙালিদের জাতিগত ও সংস্কৃতিগত আত্মপরিচয়ের মাধ্যমে তাদেরকে একটি আলাদা জাতিসত্তা প্রদান করা, বঙ্গবন্ধু কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানে অভূতপূর্ব জনমত গড়ে তোলার মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হওয়া, ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার পক্ষে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের রায় এবং তার নেতৃত্বে জাতীয় ও প্রাদেশিক উভয় পরিষদে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতালাভ, নির্বাচনের ফলাফলে পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে মেরুকরণ সৃষ্টি হওয়া, ছয় দফা বাস্তবায়নে বঙ্গবন্ধুর অনড় অবস্থান এবং এ ব্যাপারে ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শপথ গ্রহণ, জুলফিকার আলী ভুট্টো কর্তৃক বঙ্গবন্ধুর স্বায়ত্ত্বশাসন নীতির প্রবল বিরোধীতা করা, ভুট্টো কর্তৃক অ্যাসেমব্লি বয়কটের হুমকি এবং ইয়াহিয়া বঙ্গবন্ধুকে সরকার গঠনের জন্য আহ্বান জানালে তা না মানার ঘোষণা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে সংসদের অধিবেশন ডাকতে ইয়াহিয়া খানের গড়িমসি করা, বঙ্গবন্ধুর বুঝে ফেলা যে, তার দল সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানীরা তাকে সরকার গঠন করতে দেবে না, ৩ মার্চ ডাকা অ্যাসেমব্লি অধিবেশন ইয়াহিয়া খান কর্তৃক বাতিল ঘোষণা এবং বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ দোষারোপ করা, স্বাধীনতার জন্য বঙ্গবন্ধুর প্রস্তুতি ও ব্যবস্থা গ্রহণ, বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনের ডাক এবং তাতে গোটা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সমর্থনের মাধ্যমে কার্যত পূর্ব পাকিস্তানের বেসামরিক কর্তৃত্ব তার হাতে চলে আসা, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, জয় বাংলা”- এভাবে সমাপ্ত করা বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে স্বাধীনতার ডাক এবং এ জন্য জনগণকে সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণে উদ্বুদ্ধকরণ, রাজনৈতিক অচল অবস্থা নিরসনের নামে বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনার জন্য ১৫ মার্চ ইয়াহিয়ার ঢাকা আগমন, একটানা ১০ দিন আলোচনার নামে প্রহসন ও সামরিক প্রস্তুতিগ্রহণ শেষে রাতের আধাঁরে ২৫ মার্চ ইয়াহিয়ার ঢাকা ত্যাগ, পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করার পূর্বে ইয়াহিয়ার ‘পোড়া মাটি’র নীতি বাস্তবায়নে ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে গণহত্যার নির্দেশ, ২৫ মার্চ গভীর রাতে নিরস্ত্র জনতার উপর বর্বর পাকিস্তানী বাহিনীর হামলা ও গণহত্যা, জনতার প্রতিরোধ, ইয়াহিয়া কর্তৃক আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা ও বঙ্গবন্ধুসহ তার সহকর্মীদের গ্রেফতারের নির্দেশদান, পাকিস্তানিদের হাতে গ্রেফতার হবার পূর্বে ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক “এটাই হয়ত আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের মানুষকে আহ্বান জানাই, আপনারা যেখানেই থাকুন, আপনাদের সর্বস্ব দিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যান। বাংলাদেশের মাটি থেকে সর্বশেষ পাকিস্তানি সৈন্যটিকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের আগ পর্যন্ত আপনাদের যুদ্ধ অব্যাহত থাকুক”- এই ঘোষণার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করা, ২৬ মার্চ দিনের বেলায় বঙ্গবন্ধুর পক্ষে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ হান্নান কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ, ২৭ মার্চ পুনরায় বঙ্গবন্ধুর পক্ষে মেজর জিয়াউর রহমান কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করা, বঙ্গবন্ধুর নামানুসারে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলার নাম পরিবর্তন করে ‘মুজিবনগর’ নামকরণ করে সেখানে মুক্তিযুদ্ধকালীন স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী স্থাপন করা, ১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধুকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি এবং তার অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও তাজউদ্দিন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে ‘মুজিবনগর সরকার’ গঠন করা, ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরেই মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ, বঙ্গবন্ধুর নামে ও পক্ষে তার সহকর্মীদের কর্তৃক মুক্তিযুদ্ধের সকল কর্মকান্ড পরিচালনা করা, রণাঙ্গনে সশস্ত্র যুদ্ধ এবং বিশ্বব্যাপী কূটনৈতিক যুদ্ধে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর জীবন রক্ষার্থে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা, পাকিস্তানের জেলে মৃত্যুর মুখোমুখি জেনেও বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুর অনড় অবস্থান, ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানীদের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়, ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুর মুক্তিলাভ এবং ১০ জানুয়ারি গোটা বিশ্বের নজর কেড়ে স্বমহিমায় স্বাধীন বাংলাদেশের শ্রষ্টা ও বাঙালি জাতির পিতা হিসেবে তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন।
এভাবেই বঙ্গবন্ধুর টর্নেডোগতির নেতৃত্বে বিশ্ব মানচিত্রে বাঙালি জাতীয়তাবাদভিত্তিক অসাম্প্রাদায়িক বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে, যা বিশ্ব ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা।
ঘাতকের বুলেটে নিস্তব্ধ নিঃশ্বাস এবং নশ্বর দেহ গত হয়ে গেলেও তোমার মৃত্যু নেই পিতা, মৃত্যুঞ্জয়ী তুমি চিরজাগরুক বাঙালির প্রেরণার উৎস, তুমি বাঙালি জাতির রাজনৈতিক মহান শিক্ষক অনদানিকাল, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি মহাবীর চিরউন্নত তব শীর। তোমায় লাল সালাম, শ্রদ্ধার্ঘ্য পাদপদ্মে।

লেখক : মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র অংশগ্রহণকারী, পেশায় তথ্য প্রযুক্তিবিদ। তিনি অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট ও ব্লগার এবং পত্রপত্রিকায় প্রগতিশীল, মুক্তচিন্তা এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখালেখি করেন। পেশাগত জীবনে তিনি আইসিডিডিআর,বি, অ্যাকটেল, ওরাকল, ক্যাসপারস্কি এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় তথ্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এক্সেল টেকনোলজিস্ লি.-এর নির্বাহী পরিচালক এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি শিল্প দক্ষতা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।

LEAVE A REPLY