রোহিঙ্গা গ্রাম ‘নিশ্চিহ্ন’ : মিয়ানমার শুনবে ধর্মের কাহিনি?

0
12

বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত একটি গ্রাম মানচিত্র থেকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দিয়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ‘ম্যাপিং ইউনিট’- যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বরাতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এ তথ্য ও চিত্রে আমরা হতাশ হলেও বিস্মিত নই। বস্তুত রাজ্যটিতে দশকের পর দশক ধরে চলে আসা রোহিঙ্গাবিরোধী যে তৎপরতা আমরা দেখে আসছি, তা থেকে এটা আর নতুন কী? এ ধরনের পরিস্থিতিতেই তো দফায় দফায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী দলবেঁধে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় গ্রহণ করেছে। আগেও বিভিন্ন সময়ে তো বটেই, ২০১৭ সালের আগস্টে সর্বশেষ শরণার্থী ঢলের পর থেকেই খুন, ধর্ষণ ও নির্যাতনে রোম শিউরানো বর্ণনা পাচ্ছিল বিশ্ববাসী। আমাদের মনে আছে, ২০১৮ সালের জুলাই মাসেও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তরফে উপগ্রহভিত্তিক চিত্রে দেখা গেছে, কীভাবে রোহিঙ্গা বসতির পর বসতি পুড়িয়ে ছারখার করা হয়েছে। এখন সেগুলোতেই তারা নিজেদের অবস্থান আরও দৃঢ় করেছে। তারা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী, বাংলাদেশ ও বিশ্ব সম্প্রদায়কে ভুলিয়ে দিতে চাইছে যে, সেখানে একসময় বসতি ছিল। সেই বসতিতে তারা নির্বিচার হামলা ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। কিন্তু পাপ যে শেষ পর্যন্ত চাপা থাকে না, এসব চিত্র তার প্রমাণ। মনে রাখতে হবে, চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনি। এও ভুলে যাওয়া চলবে না যে, খোদ মিয়ানমারের সাংবাদিকদের কেউ কেউ হত্যা ও নির্যাতনের সরেজমিন চিত্র প্রকাশ করে এখন কারাগারে নিপতিত। জাতিসংঘ, ওআইসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পক্ষে রাখাইনের নির্যাতন ও নৃশংসতাকে আখ্যা দেওয়া হয়েছে ‘গণহত্যা’ হিসেবে। বলা হয়েছে, জাতিগত নিধনের ‘পাঠ্যপুস্তকে দেওয়ার মতো উদাহরণ’। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমরা এসব চিত্র ও বর্ণনার মাত্রা উপলব্ধি করতে পারি সহজেই। কারণ, আমাদেরও একাত্তরে এভাবে কিংবা আরও গুরুতর মাত্রা ও পরিসরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংসতার শিকার হতে হয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও সংবাদমাধ্যম কি কেবল রোহিঙ্গাদের ওপর পরিচালিত গণহত্যার বর্ণনা ও চিত্র প্রকাশ করেই দায় সারবে? এ ধরনের প্রতিবেদন স্পর্শকাতরতা তৈরি করে, সন্দেহ নেই। রোহিঙ্গাদের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনেও নিশ্চয়ই ভূমিকা রাখে। কিন্তু আমরা চাই, এসব তথ্য ও চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি রোহিঙ্গারা যাতে নিজেদের মাতৃভূমিতে নিরাপত্তা নিয়ে ফিরে যেতে পারে, সে জন্য কার্যকর কিছু করুক আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। মনে রাখতে হবে, এ চিত্র এমন সময় উঠে এসেছে যখন আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত একটি অন্তবর্তীকালীন আদেশ দিয়েছেন। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ সেই আদেশের প্রতি কতটা শ্রদ্ধা রাখে, সর্বশেষ চিত্রে উঠে আসা ‘কান কিয়া’ গ্রামের পরিণতি তার প্রমাণ। জানা যাচ্ছে, এমন আরও অনেক রোহিঙ্গা গ্রামের অস্তিত্ব তারা মুছে দিতে চাইছে। এ আশঙ্কাও আমরা করি যে, আরও কিছু এমন চিত্র রয়ে গেছে নজরদারির আড়ালে। এ ধরনের আরও চিত্র বেশি প্রকাশ হওয়া মন্দের ভালো। কিন্তু সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। যা করার অবিলম্বে করতে হবে। গ্রাম নিশ্চিহ্ন করার চিত্র উঠে আসার সঙ্গে রোহিঙ্গা ইস্যুতে সীমান্তের এপাশের পরিস্থিতিও তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশ সরকার এরই মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, অস্থায়ী শিবিরগুলোতে থাকা রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর করা হবে। এরই মধ্যে নিপীড়িত এই জনগোষ্ঠীর একটি প্রতিনিধি দল ভাসানচর পরিদর্শন করেও এসেছে। এখন যখন সীমান্তের ওপাশে তাদের মূল আবাসই নিশ্চিহ্ন করা হচ্ছে, তখন সীমান্তের এপাশে অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ মেয়াদের জন্য ভাসানচরে স্থানান্তর কী ফল বয়ে আনতে পারে, আমরা আবারও ভেবে দেখতে বলি। আমরা জানি, মিয়ানমার বারবার রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের ভাঙা রেকর্ড বাজিয়ে চলছে; কিন্তু কার্যক্ষেত্রে করছে বিপরীত। সে ক্ষেত্রে কেবল আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কিংবা আন্তর্জাতিক মহলে মিয়ানমারের ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রগুলোর মাধ্যমে চাপে কতখানি কাজ হচ্ছে, ভেবে দেখা দরকার। ভাবতে হবে যেমন বাংলাদেশকে, তেমনই বিশ্ববাসীকে।

LEAVE A REPLY