অগ্রাধিকার প্রকল্প : গতি ফেরানোর বিকল্প নেই

0
12

করোনাভাইরাস পরিস্থিতির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলসহ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১০ প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজ গত ৯ মাসে ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে- সোমবার সমকালে প্রকাশিত শীর্ষ প্রতিবেদনের এ তথ্য অনুমিতই ছিল। আমরা জানি, এসব প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা, পরামর্শক, প্রকৌশলীদের অধিকাংশই বিদেশি নাগরিক। গত বছর ডিসেম্বরে বড়দিনের ছুটি কাটাতে নিজ দেশে গিয়ে করোনা বাস্তবতায় আর প্রকল্পস্থলে ফিরতে পারেননি। বস্তুত করোনা পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়েই এ ধরনের প্রকল্পের বাস্তবায়নের গতি শ্নথ হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা সংশ্নিষ্টদের মনে করিয়ে দিতে চাই, অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোতে গতি আনার বিকল্প নেই। ভুলে যাওয়া চলবে না, পদ্মা সেতু নির্মাণের মতো প্রকল্পগুলো নিছক বড় অবকাঠামো নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জনসাধারণের আবেগ ও রাষ্ট্রীয় গৌরবের বিষয়টিও। বিদেশি সহায়তা ছাড়াই নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু প্রকল্পের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া যখন শুরু হয়েছিল, তখন অনেকেই এর বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু সব সমালোচনার মুখে ছাই দিয়ে এখন দেশের বৃহত্তম এই সেতু প্রমত্তা পদ্মার বুকে সগৌরবে মাথা তুলে আমাদের অর্থনৈতিক ও কারিগরি সক্ষমতার গৌরব ঘোষণা করে চলছে। এরই মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এখন যদি করোনার কারণে আরও পিছিয়ে যায়, তা হবে হতাশাজনক। মেট্রোরেলের মতো প্রকল্পগুলোর নির্মাণকাজের কারণে রাজধানীর সংশ্নিষ্ট এলাকায় যে জনদুর্ভোগ ও যানজট চলমান, তাও দীর্ঘায়িত হতে দেওয়া যায় না। অস্বীকার করা যাবে না, এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে চলাচলের ক্ষেত্রে নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্য বহুলাংশে বাড়বে। কিন্তু এটাও স্বীকার করতে হবে, আগামীর স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য বর্তমান দুর্ভোগ অহেতুক দীর্ঘায়িত করার অর্থ থাকতে পারে না। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের এ বক্তব্যের সঙ্গে আমরা একমত যে, প্রকল্প কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রকল্প এলাকার মধ্যেই সংগনিরোধ অবস্থায় রেখে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া সম্ভব ছিল।

বিদেশি যেসব কর্মকর্তা নিজ দেশে গিয়ে আটকে গেছেন বা করোনা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে আসতে চাইছেন না, তাদের জন্যও বিকল্প ব্যবস্থা অসম্ভব ছিল না। করোনা পরিস্থিতিই আমাদের শিখিয়েছে, কত ধরনের উদ্ভাবনীমূলক ব্যবস্থা সম্ভব। শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা যেহেতু মূলত পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শমূলক কাজে জড়িত, তারা অনলাইনেই যুক্ত হতে পারেন বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায়। প্রাযুক্তিক উৎকর্ষতার এ সময়ে প্রকল্পের খুঁটিনাটিও তাদের দেখানো সম্ভব ওয়েব ক্যামেরার মাধ্যমে। আমরা বলতে চাইছি, সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা থাকলে কোনো কাজই গতি হারাতে পারে না। প্রসঙ্গক্রমে ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রকল্পে দেশীয় পরামর্শক ও কর্মকর্তা নিয়োগেও জোর দিতে বলি আমরা। অর্ধশতকের স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা আরও নানা ক্ষেত্রের মতো এসব ক্ষেত্রেও নিঃসন্দেহে সক্ষম হয়েছি। কারিগরিভাবে মেগা প্রকল্পে এখনও বিদেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন হতে পারে বৈকি; দেশীয় বিশেষজ্ঞ ও পরামর্শক নিয়োগে শর্ত দেওয়ার অবস্থানে এরই মধ্যে বাংলাদেশ পৌঁছেছে বলে আমরা বিশ্বাস করি। এ মুহূর্তে আমাদের চাওয়া, অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোতে গতি আসুক। করোনা পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, এখনও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কিন্তু এটা নিশ্চিত করে বলা যায়- বিদ্যমান ‘নতুন স্বাভাবিকতা’ মেনে নিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আমরা দেখছি, করোনা পরিস্থিতিতে সরকারি ব্যয়ে মিতব্যয়িতার কৌশল নেওয়া হলেও চলতি বছরের বাজেটে অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোর বরাদ্দ কমনো হয়নি; বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাড়ানো হয়েছে। তারপরও গতি শ্নথ হবে কেন? এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান সমকালকে বলেছেন, দ্বিগুণ গতিতে কাজ করে সময়মতো এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। আমরা তার বক্তব্যে আশাবাদী হতে চাই। বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোও এ ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে বলে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন, আমরা তার প্রমাণ দেখতে চাই কার্যক্ষেত্রে। সব পক্ষ আন্তরিক হলে কোনো কাজই কঠিন হতে পারে না।

LEAVE A REPLY