সুখবরের প্রত্যাশায়

0
3

বিভুরঞ্জন সরকার
কোভিড-১৯ বা করোনাভাইরাসের প্রকোপে বিশ্বব্যাপী যে ব্যাপক ওলটপালট চলছে, তার কবে অবসান ঘটবে সেটা এখনও কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। দুচার মাসের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে যে আশা করা হয়েছিল, তা পূরণ হয়নি। বহু বহু বছর পৃথিবীর মানুষ এত গভীর সংকটের মুখোমুখি হয়নি। প্রতিদিনই পৃথিবীজুড়ে করোনার সংক্রমণের খবর পাওয়া যাচ্ছে। করোনায় প্রাণহানিও ঘটছে প্রতিদিনই। কোনো দেশ থেকে একটু ভালো খবর পাওয়া গেলে পরক্ষণেই অন্য কয়েক দেশ থেকে পাওয়া যাচ্ছে খারাপ খবর। মাসের পর মাস ভয়, আতঙ্ক এবং অশ্চিয়তার মধ্যে বসবাস করে মানুষ হাঁপিয়ে উঠেছে। কয়েক মাস জনজীবন কিছুটা অচল থাকলেও এখন মানুষকে আর ঘরবন্দি করে রাখা যাচ্ছে না। জীবিকার জন্য মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সচল হওয়ার চেষ্টা করছে।

বড় অর্থনীতির এগিয়ে থাকা দেশগুলো যেমন করোনা মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে, তেমনি ছোট অর্থনীতির পিছিয়ে পড়া দেশগুলোও আর সামাল দিতে পারছে না। করোনাভাইরাস থেকে দ্রুত রেহাই পাওয়ার কোনো লক্ষণ বা সম্ভাবনা এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। করোনার প্রতিষেধক কার্যকর ও নিরাপদ টিকা বা ভ্যাকসিন আবিষ্কারের চেষ্টা চলছে। রাশিয়া টিকা আবিষ্কারের সাফল্য দাবি করলেও তা নিয়ে সংশয় দূর হচ্ছে না। তবে এ বছরের শেষ নাগাদ অথবা আগামী বছরের শুরুতে টিকা বা ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে বলে অনেকেই আশা করছেন। করোনা প্রতিষেধক টিকা নিয়ে রাজনীতিও আছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অক্টোবরের মধ্যে টিকা নিয়ে সুখবর দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিজের ভাগ্য ফেরানোর জন্য ট্রাম্প এখন করোনাভাইরাসের কার্যকর টিকার দিকে মনোযেগী হয়েছেন। টিকা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনীতি সে দেশের মানুষ ভালো ভাবে নিচ্ছে বলে মনে হয় না।

করোনাভাইরাস নিয়ে শুরুতে ট্রাম্প উদাসীনতা দেখিয়েছেন। এই ভাইরাস কতটা ধ্বংসাত্মক হতে পারে, সেটা তার উপলব্ধিতে ছিল না। তার খামখেয়ালিপনার জন্যই আমেরিকায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বলে অভিযোগ তোলা হচ্ছে ট্রাম্পের বিরোধী পক্ষ থেকে। ৩ নভেম্বর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। সব জনমত জরিপেই ট্রাম্প তার প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্রেট দলের প্রার্থী জো বাইডেনের চেয়ে পিছিয়ে আছেন। জয়ের জন্য ট্রাম্প এখন একটি ‘ট্রাম্পকার্ড’ খুঁজছেন। করোনা প্রতিষেধক টিকা আবিষ্কারের সাফল্যের খবরকেই ট্রাম্পের সেই ট্রাম্পকার্ড হিসেবে ভাবা হচ্ছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে অভিজ্ঞ সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ এবং হোয়াইট হাউসের করোনা মহামারি টাস্কফোর্সের অন্যতম সদস্য অ্যান্থনি ফাউসি তাড়াহুড়া করে কোনো টিকা আনার বিরোধিতা করেছেন। তার ধারণা, জরুরি ভিত্তিতেও যদি কোনো টিকার অনুমোদন দেওয়া হয়, তাও সেটা কোনোভাবেই চলতি বছরের শেষ বা আগামী বছরের শুরুর আগে পাওয়া সম্ভব হবে না। মার্কিন ওষুধ প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তাও একই কথা বলেছেন। টিকা অনুমোদনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পিটার মার্কস বলেছেন, পর্যাপ্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার আগে যদি কোনো টিকার অনুমোদনের জন্য হোয়াইট হাউস থেকে চাপ দেওয়া হয়, তাহলে তিনি পদত্যাগ করবেন।

কাজেই টিকার সাফল্য দেখিয়ে ভোটজয়ের যে স্বপ্ন ট্রাম্প দেখছেন, তা পূরণ হবে বলে মনে হচ্ছে না। করোনায় এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত এবং মৃত্যুর ঘটনা মার্কিনযুক্তরাষ্ট্রেই ঘটেছে। দুনিয়াব্যাপী খবরদারী করে অভ্যস্ত দেশটি যে করোনার ঘায়ে এমন নাজেহাল হবে সেটা প্রত্যাশিত ছিল না। এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে করোনায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৬৬ লাখ। মৃত্যুবরণ করেছেন প্রায় দুই লাখ। প্রতিদিনই নতুন নতুন সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।

করোনা নিয়ে সুখবর নেই আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও। ভারতে সংক্রমণ এবং মৃত্যুর ঘটনা প্রতিদিনই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ভারতে প্রায় ৬৭ লাখ মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। মৃতের সংখ্যা প্রায় ৭৮ হাজার। এই সংখ্যা শেষপর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা কেউ বলতে পারে না।

দুই.
করোনায় বেহাল অবস্থা বাংলাদেশেরও। রোগী শনাক্তের সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ চীনকে ছাড়িয়েছে তিনমাস আগেই। এখন মৃত্যুর সংখ্যাতেও চীনকে ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। গত বছর ডিসেম্বর মাসে চীনের উহানে প্রথম করোনাভাইরাস সংক্রমণ শনাক্ত হয়। প্রায় দুই মাসের মধ্যেই চীন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। কিন্তু তারপর মহামারি আকারে এই সংক্রমণ বিশ্বের প্রায় সব দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্বে করোনা আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় দুই কোটি ৮৮ লাখ আর মৃতের সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ ২১ হাজার। বাংলাদেশে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা তিন লাখ ৩৬ হাজারের বেশি। মারা গেছেন চার হাজার ৮শ জনের মতো। তবে বেসরকারিভাবে এই সংখ্যা আরো বেশি বলে ধারণা করা হয়। করোনা মোকাবিলায় শুরুর দিকে যে এলোমেলো অবস্থা ছিল, তা এখন অনেকটাই সামাল দেওয়া গেছে বলে মনে করা হয়। তবে করোনাকালে আমাদের স্বাস্থ্যখাতের বেহাল অবস্থা অত্যন্ত নগ্নভাবে প্রকাশ পেয়েছে। স্বাস্থ্যখাতে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্রও আর গোপন নেই।

মার্চ মাসে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর যে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছিল, এখন তার অনেক কিছুই শিথিল করা হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া আর সবকিছু খুলে দেওয়া হয়েছে। সব ধরনের যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। মানুষ বেঁচে থাকার আকুলতা থেকেই মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে ঘরের বের হয়ে পড়ছে। তবে আমাদের দেশে মানুষের অসচেতনতা, স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে অনেকের উদাসীনতা এবং অত্যন্ত ঘন বসতি হওয়া সত্ত্বেও করোনা সংক্রমণ এবং মৃত্যু হার আশঙ্কাজনক নয় বলেই অনেকে মনে করেন। সরকারও এক্ষেত্রে সাফল্য দাবি করে আসছে। তবে এ নিয়ে শেষ কথা বলার সময় এখনও আসেনি।

করোনার কারণে দেশের অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ পড়ছে। অসংখ্য মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ছে। মানুষের আয় কমেছে। কিন্তু ব্যয় বেড়েছে। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। করোনার মধ্যেই আম্পান এবং বন্যায় অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে অভাবী মানুষের সংখ্যা বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অনেক প্রবাসী শ্রমিক দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছে। তারা সবাই আবার বিদেশ যেতে পারবে কিনা সেটাও অনিশ্চিত।

কোনো জায়গা থেকেই তেমন ভালো খবর পাওয়া যায় না। নানা ঘটনা-দুর্ঘটনায় প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে। নারায়ণগঞ্জে মসজিদে বিস্ফোরণে ৩১ জনের প্রাণ গেছে। আরও ৫ জন আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে আছেন। ট্রলার ডুবিতে মানুষ মরছে। কক্সবাজারে বেপরোয়া পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারালেন এক সাবেক সেনাকর্মকর্তা। ঘোড়াঘাটে নিজের শয়নকক্ষে আক্রান্ত হলেন উপজেলা পর্যায়ের এক সর্বোচ্চ কর্মকর্তা ওয়াহিদা খানম। তিনি প্রাণে বেঁচে গেছেন। কিন্তু সামনে এসেছে নারী কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি।

অর্থনৈতিক দুর্দশার হাত ধরে দেশে সামাজিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে বলে কেউ কেউ মনে করছেন। এখন বাহ্যত সবকিছুর ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ আছে বলে মনে হলেও ভেতরে ভেতরে ভাঙনের শব্দও শোনা যাচ্ছে বলেও কারো কারো মনে হচ্ছে। তবে মানুষ দিন গুনছে সুখবরের প্রত্যাশায়। করোনাকালের অবসান ঘটুক, জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে আসুক, দুর্নীতি-অনিয়মের অবসান হোক – এসবই এখন মানুষ দেখতে চায়, শুনতে চায়। সরকারি দলের মধ্যে যারা মানুষের গ্রাস কেড়ে খাওয়ার মুখ হা করে আছেন, তাদের মুখ বন্ধ করার কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব পরিহার করা হবে -এটাও মানুষের অন্যায্য প্রত্যাশা নয়।

দুঃসংবাদ বা খারাপ খবর শুনতে শুনতে মানুষের জীবন বিষাদময় হয়ে উঠেছে, এখন সরকার সচেষ্ট হোক মানুষকে ভালো খবর বা সুসংবাদ উপহার দিতে। জনপ্রত্যাশার বারবার যদি অপমৃত্যু ঘটে তাহলে সেটা সরকারের জন্যই কাল হয়ে দেখা দিতে পারে।
লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক

LEAVE A REPLY